আইন মানছে না সোনালী লাইফ

অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের

  • এক পরিবারের হাতে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার
  • সরকারি খাতে বিধিবদ্ধ ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ নেই
  • নিয়মিত সিইও নেই দেড় বছর যাবৎ
  • জনবল ঘাটতিতে সুযোগ পাচ্ছে : আইডিআরএ

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় বিমা খাতে দেশের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর চতুর্থ প্রজন্মের বিমা কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও ক্রমান্বয়ে সেই আগ্রহে ভাটা পড়তে থাকে।

সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইন, বিমা আইনসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন ভঙ্গের দায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তি ও জরিমানার কবলে পড়ার আশঙ্কা থেকেই এই ভাটা বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীরা।

জানা গেছে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) আসার আগেই কোম্পানি পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর কোনো সতর্কতা বা জবাবদিহিতার মুখে না পড়ায় পেয়েছে চূড়ান্ত অনুমোদন। এরই ধারাবাহিকতায় এখনো আইন লঙ্ঘন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি কোম্পানির পক্ষ থেকে একাধিকবার বিমা আইন ভঙ্গের অভিযোগ জানিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। 

এগুলোর মধ্যে রয়েছে— পরিচালকদের শেয়ার ধারণে অনিয়ম, সম্পদ বিনিয়োগের বিধান লঙ্ঘন এবং তিন মাসের অধিক নিয়মিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা না থাকা। বিমাকারীর মূলধন ও শেয়ার ধারণ বিধিমালা ২০১৬ অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্যরা একক অথবা যৌথভাবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বিমা কোম্পানির শতকরা ১০ (দশ) ভাগের অতিরিক্ত শেয়ার ধারণ করতে পারবে না। (এক্ষেত্রে আইন অনুসারে পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বামী বা স্ত্রী, পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন, পুত্রবধূ,  জামাতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল সবাই গণ্য হবেন)। 

 কিন্তু বিনিয়োগকারী সূত্র ও সোনালী লাইফের প্রসপেক্টাস থেকে দেখা যায়, উদ্যোক্তা হিসেবে রূপালী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান মোস্তাফা গোলাম কুদ্দুস, তার স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, দুই কন্যা ও দুই জামাতাসহ পরিবারের মোট শেয়ার ধারণের হার ২৪.৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ৫.৬৪ শতাংশ, স্ত্রী ফাজলুতুন্নেছা ১.৫২ শতাংশ, দুই কন্যা তাসনিয়া কামরুন আনিকা ২.৫৩ শতাংশ ও ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া ৫.৯৬ শতাংশ, দুই জামাতা রাশেদ বিন আমান ০.২৩ শতাংশ ও শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল ৩.৫৮ শতাংশ, পুত্র মোস্তফা কামরুস সোবহান ০.৬৩ শতাংশ এবং পুত্রবধূ সাফিয়া সোবহান চৌধুরীর ৪.৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। 

উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার তিন বছরের জন্য লকইন থাকায় আগামী তিন বছরের মধ্যে এই শেয়ার বিক্রয় বা হস্তান্তর করারও কোনো সুযোগ নেই। অপরদিকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পদ বিনিয়োগ নিয়মানুসারে সরকারি খাতে নির্ধারিত পরিমাণ বিনিয়োগ করেনি বলে জানা গেছে। বিমা আইনে জীবন বিমা কোম্পানির সম্পদ বিনিয়োগ বিধিতে মোট সম্পদের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শুধু সরকারি সিকিউরিটিজেই বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

কিন্তু সোনালী লাইফ মোট সম্পদ ১৯৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার বিপরীতে এই খাতে বিনিয়োগ করেছে মাত্র পাঁচ কোটি ৩০ লাখ টাকা, আর মোট বিনিয়োগ ৫৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অথচ শুধু সরকারি খাতেই ৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা ছিল।

পরিসংখ্যানগত এই তথ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত নিয়মিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ না করে প্রকাশ্যে বিমা আইন ভঙ্গ করছে। এ বিষয়ে জানা যায়, সোনালী লাইফে সর্বশেষ নিয়মিত সিইও ছিলেন অজিত চন্দ্র আইচ। তিনি ২০২০ সালের ২৬ জুন পদত্যাগ করলে ওইদিনই এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের জামাতা রাশেদ বিন আমানকে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। 

ভারপ্রাপ্ত হিসেবে ইতোমধ্যে তিনি এক বছর ছয় মাস অতিক্রম করেছেন। অথচ বিমা আইন অনুসারে তিন মাসের অধিক ভারপ্রাপ্ত সিইও রাখার বিধান নেই। তবে অত্যাবশ্যকীয় হলে তা সর্বোচ্চ আরও তিন মাস বৃদ্ধি করা যায়। অর্থাৎ আইন অনুসারে ছয় মাসের বেশি কোনোভাবেই ভারপ্রাপ্ত সিইও দিয়ে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ একজন যোগ্যতাসম্পন্ন সিইও নিয়োগ দিবেন। 

এরপরও যদি কোম্পানি নিয়মিত সিইও নিয়োগে ব্যর্থ হয় তবে সেখানে প্রশাসক বসাতে পারবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এক্ষেত্রে প্রশাসকের বেতন-ভাতা আইডিআরএ নির্ধারণ করে দিলেও কোম্পানিকেই তা প্রদান করতে হবে। কিন্তু রাশেদ বিন আমান নির্ধারিত তিন মাস পেরিয়ে অতিরিক্ত ১৩ মাস যাবত দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি বিমা খাতের সবার জানা থাকলেও এই আইন লঙ্ঘনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইডিআরএ কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তারা। 

এ বিষয়ে সোনালী লাইফের সিইও রাশেদ বিন আমানের সাথে যোগাযোগ করলে আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের কোনো পরিচালকেরই এককভাবে ১০ শতাংশ শেয়ার নেই। তাছাড়া আমরা সব আইন পরিপালন করেই অনুমোদন পেয়েছি।’ 

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতারের কাছে জানতে চাওয়া হয়। 

তিনি জানান, ‘মূলত বিমা সেক্টরে দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় আমরা কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তারপরও যেহেতু অভিযোগ পেয়েছি আমরা বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখবো। সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে’।