Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

মেলায় হুড়োহুড়ি ভোটে ঠেলাঠেলি

জানুয়ারি ১১, ২০২২, ০৭:০০ পিএম


মেলায় হুড়োহুড়ি ভোটে ঠেলাঠেলি
  • দরজা খোলা রেখে বিধিনিষেধে সচেতন মানুষের ক্ষোভ 
  • খণ্ড খণ্ড মিছিলে ঠাসাঠাসি করে নারায়ণগঞ্জে প্রচারণা
  • মেলা বন্ধ হবে না; মাস্ক ছাড়া ঢুকতে দেব না : কর্তৃপক্ষ 
  • বিএনপির অভিযোগ— আন্দোলন বাড়লে বিধিনিষেধ বাড়ে
  • অর্ধেক যাত্রীতে চলবে ট্রেন আদালত চলবে ভার্চুয়ালি
  • শিক্ষকদের আন্দোলন স্থগিত সংসদে ঢুকবে না সাংবাদিক

জনসমাগমের মহোৎসব ভোটের মাঠ ও মেলা। এ দুই পথের দরজা খোলা রেখেই ১৩ জানুয়ারি থেকে বিধিনিষেধ আসছে। আগামী ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদিনই স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেন্দ্র থেকে নেতারা সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তৈমূর আলমের ভোটের প্রচারণায় যাচ্ছেন। ভিন্ন জেলা থেকেও আসছেন। কয়েকজনের মুখে মাস্ক থাকলেও নেই কারো শারীরিক দূরত্ব। পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে খণ্ড খণ্ড মিছিলে চলছে স্লোগানে স্লোগাণে প্রচারনা। দুই প্রার্থীই বিশাল নেতাকর্মীর বহর নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। 

একই দৃশ্য ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায়। ঠাসাঠাসি করে শারীরিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করেই মেলায় যাচ্ছে মানুষ। বিধিনিষেধের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেই ঘোষণা এসেছে খোলা থাকবে বাণিজ্যমেলা। গতকাল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বাণিজ্যমেলার কার্যক্রম চালাতে কোনো অসুবিধা নেই। মেলা বন্ধ করার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিধিমালার আলোকে যেভাবে করা দরকার সেভাবে হবে। তবে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে চিত্রও দেখা গেছে। 

সংক্রমণ বাড়ায় আগামী ১৬ জানুয়ারি থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত ভার্চুয়ালি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল আদালত চলাকালীন চেম্বার বিচারপতি ওবায়দুল হাসান আইনজীবীদের এমন তথ্য দেন।  স্থগিত করা হয়েছে শিক্ষক আন্দোলনের কর্মসূচিও। এছাড়া জনসমাগম এড়াতে সংসদ অধিবেশনে এবারো সাংবাদিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে না করা হয়েছে।  জনস্বার্থে অধিবেশনের সকল কার্যক্রম ‘সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন’-এর সরাসরি সমপ্রচারিত অধিবেশন থেকে কাভার করার জন্য  সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

এদিকে বিএনপির অভিযোগ আন্দোলন বাড়লে বিধিনিষেধ বাড়ে। কারণ সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ জেগে উঠেছে এবং ১৪৪ ধারা ভেঙে সভা-সমাবেশে যোগ দিতে শুরু করেছে মানুষ। এতেই আতঙ্কিত সরকার। তুলে ধরা হচ্ছে সরকারের ব্যর্থতাও। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যখন ৬০-৭০ ভাগ টিকা দেয়া সম্পন্ন করেছে, সেখানে বাংলাদেশে টিকা দেয়া হয়েছে মাত্র ৩০ ভাগ।  সোমবার রাতে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাস্ক না পরলে জরিমানাসহ গণপরিবহনে অর্ধেক আসনে যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা এসেছে। বলা হয়েছে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খেতে হলে ভ্যাকসিন সনদ দেখাতে হবে। 

এমন বিধিনিষেধের পর ট্রেনেও সতর্কতা এসেছে। ট্রেনের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে অর্ধেক যাত্রী নেয়া হবে। অর্থাৎ মোট আসন সংখ্যার অর্ধেক টিকিট বিক্রি করবে রেলওয়ে। টিকিটের ৫০ শতাংশের মধ্যে ২৫ শতাংশ অনলাইনে এবং বাকি ২৫ শতাংশ কাউন্টারে পাওয়া যাবে। গতকাল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (সিসিএম-পূর্ব ও পশ্চিম) মো. নাহিদ হাসান খানের সই করা একটি আদেশে এসব তথ্য জানানো হয়। 

নির্বাচনের মাঠ ও মেলা খোলা রেখে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, দরজা খোলা রেখে যেমন চোর থেকে সম্পদ রক্ষা করা যায় না, তেমনি মাঠ খোলা রেখে কখনোই করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুর উদ্দিন বলেন, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি মেলায় প্রবেশে মানুষের ঘষাঘষি। ঠেলাঠেলি করে চলছে দলবেঁধে মিছিল ও প্রচারণা। এতে করে যে উদ্দেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে কোনো ধরনের ফলাফল আসবে না। 

ব্যবসায়ী আনিসুল হক বলেন, গতবারও আমরা দুঃসময়ে পড়েছি। আমরা নিষেধাজ্ঞা মেনে দোকান করতে চাই। প্রয়োজনে রুটিং করে ২৪ ঘণ্টা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকুক। তাহলে সব ধরনের ভিড় এড়ানো যাবে। 

আইনজীবী রাশেদুল হক বলেন, আমরা সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ইতোমধ্যে আদালতকেন্দ্রিক আমাদের নির্দেশনা এসেছে। জনসমাগম হয় এমন কর্মসূচি ভোট কিংবা মেলাতে সরকারের দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক বলে মনে করছি। 

মেলা বন্ধ হবে না; মাস্ক ছাড়া ঢুকতে দেবো না : স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা কর্তৃপক্ষ। পূর্বাচলে চলমান এ মেলায় গতকাল থেকে কোনো দর্শনার্থী মাস্ক ছাড়া প্রবেশ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন মেলার পরিচালক ইপিবির সচিব মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী। 

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, সে অনুযায়ী মেলাতেও নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয়া হবে। ‘প্রাথমিকভাবে গতকাল থেকে আমরা মাস্ক ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেব না। ভেতরেও মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করতে বিশেষ নজর রাখবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।’ 

ইফতেখার চৌধুরী বলেন, ‘রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার ক্ষেত্রে যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে মেলার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। আমরা বৃহস্পতিবার থেকে বিষয়টি দেখব।’ তবে পরিস্থিতি যাই হোক, মেলা সংক্ষিপ্ত করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান ইফতেখার। এক বছর বিরতি দিয়ে পূর্বাচলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিবিসিএফইসি) গত ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ২৬তম আসর। ইতোমধ্যেই মেলার ১০ দিন অতিবাহিত হয়েছে, ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রত্যাশী মহাজোটের সদস্য সচিব মো. জসিম উদ্দিন জানান, সরকারিভাবে ১৩ জানুয়ারি থেকে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করায় ১২ জানুয়ারি থেকে আপাতত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে চলমান অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা হলো। 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দুই ডোজ করোনার টিকা দেয়া হয়েছে ৩০ ভাগ। করোনা শুরু হয়েছে প্রায় দুই বছর। যদি শুরুতেই সরকার উদ্যোগ নিতো তাহলে প্রায় শতভাগ করোনা টিকা দেয়া সম্ভব হতো। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই ৬০ ভাগের ওপরে টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত টিকা আর করোনাসামগ্রী নিয়ে সরকার কেলেঙ্কারি ছাড়া আর কিছু উপহার দিতে পারেনি। তারা যদি সঠিক ব্যবস্থা নিতো, যদি ৬০-৭০ ভাগ লোককে টিকা দিতে পারতো, তাহলে করোনা মহামারি বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো সুযোগই থাকতো না। 

শুধু বিএনপির সভা-সমাবেশ ঠেকাতেই গতকাল জারি করা বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে কিনা তা নিয়েই জনগণের প্রশ্ন রয়েছে। কারণ সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ জেগে উঠেছে এবং ১৪৪ ধারা ভেঙে সভা-সমাবেশে যোগ দিতে শুরু করেছে। এতেই আতঙ্কিত সরকার। যতই চক্রান্তের জাল ফেলা হোক না কেন, এই অবৈধ সরকারের পতন ঠেকানো যাবে না। 

মামলা দিয়ে, সাজা দিয়ে, বিধিনিষেধ নিয়ে, চক্রান্ত করে জনগণকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন আরেকটি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে যে লক্ষ লক্ষ বিএনপি নেতাকর্মীর নামে হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা দেয়া হয়েছিল, এখন সেই মামলাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সাজা দেয়া শুরু করেছে।