অপপ্রচারে সরকারের মাথাব্যথা

রোহিঙ্গা-মাদক-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

  • রোহিঙ্গারা কর্মসংস্থান ও মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা চায়
  • করোনায় মাদকবিরোধী প্রচার বাধাগ্রস্ত
  • বিদেশে বসে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে

মিয়ানমার সরকারের বলপ্রয়োগে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ চাচ্ছে। তারা মাসিক পাঁচ হাজার টাকা ভাতাও দাবি করছেন। এসব দাবি আদায়ে তারা সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিংয়ের চেষ্টা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, পেছন থেকে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাদের উল্লিখিত দাবি উত্থাপনে ইন্ধন জোগাচ্ছে। 

অপরদিকে মাদকদ্রব্যের ব্যাপক বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে অনেক সময় নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তার চেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও দেশে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন, সেবা প্রদান সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রচার চালানোর সরকারি উদ্যোগ করোনার কারণে ভেস্তে গেছে।

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণ করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিদেশে থেকে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে। চুক্তি করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ওই সব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশেগুলোর সরকারকে অপপ্রচারকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানাবে।  

গত বছর ২ জুন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা ষষ্ঠ সভায় উপস্থিত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পুলিশের আইজি, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিসহ সংস্থা প্রধানগণ এসব কথা বলেন। তারা উল্লিখিত বিষয়গুলোতে নানামুখী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ পেশ করেন। সভার কার্যবিবরনী ঘেঁটে এ সব তথ্য জানা গেছে।

আগামীকাল বৃহষ্পতিবার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সপ্তম সভা অুষ্ঠানের কথা রয়েছে।ইতোমধ্যে সব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিগত সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সর্বশেষ অগ্রগতি সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। 

সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। অথচ রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বেশ কিছু দাবি উন্থাপন করছে, যা বাস্তবায়ন করা মোটেই সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন এর পেছনে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোনো ইন্ধন রয়েছে কী না তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তাদের শরণার্থী ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনতে হবে। 

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দেশের অনেক স্থানে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে। ২০১৭ সালে আরও ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখানে আশ্রয় নিয়েছে। সরকার তাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও তারা বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থার ইন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মিছিল-মিটিং এবং বিক্ষোভ করছে। ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। 

সভায় উপস্থিত পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ বলেন, প্রায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আকষ্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি সন্দেহজনক এবং তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে মাদক ব্যবসা নিয়ে খুনাখুনি অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যা নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই কষ্ঠসাধ্য বিষয়। তারা মাঝেমধ্যে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে মিয়ানমার যাচ্ছে। তবে সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইনে তারা আহত কিংবা মিয়ানমারে আটকের খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, তারা ভাষাণচরে কর্মসংস্থান চাচ্ছে। বিশ্বের কোথাও শরণার্থীদের কর্মসংস্থানের কোনো তথ্য নেই। কক্সবাজার ক্যাম্পে অবস্থানকালে  তারা ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে কাজ করতেন। স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় কমমূল্যে শ্রম দিত। ফলে স্থানীয় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এখন তারা ভাষাণচরে স্বাস্থ্য সেবার অপ্রতুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ভাষাণচার থেকে তারা মূল ভূখণ্ডে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। 

পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, সাইবার ক্রাইমের প্রায় সত্তর ভাগ দেশের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। সাইবার পেট্রোলিং করে দেশে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে সংঘটিত অপপ্রচারকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করছে বলে পুলিশ মহাপরিদর্শক সভাকে অবহিত করেন। 

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মানি লন্ডারিংয়ের মামলাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাপ্ত বিজ্ঞাপনের টাকা সরাসরি বিদেশে প্রেরণ করা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। সভায় উপস্থিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি বলেন, বিদেশি ডোমেইনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হলে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হয় না। 

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তথা সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করা দরকার। বিদেশে অবস্থান করে যারা দেশের বিরুদ্ধে তৎপর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ওই সব দেশের বাংলাদেশ  দূতাবাসের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ওই দেশকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা যেতে পারে। ওই সব মাধ্যমগুলো দেশে বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। 

বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ফেসবুক ও ইউটিউব বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালিত হয়। ওই সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে  ডেটা সার্বভৌমত্বের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চুক্তি করতে হবে। ইতোমধ্যে আইসিটি বিভাগ থেকে ডেটা প্রটেকশন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বলেন, কওমি মাদ্রাসার উগ্রপন্থি শিক্ষকদের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে তালিকা করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া অব্যাহত রয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলোর আয়ের উৎস অনুসন্ধানে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএমপি কাজ করছে। 

তিনি আরও বলেন, দেশে নতুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা তথা চালুর আগে সরকারি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। কওমি মাদ্রাসার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না থাকায় তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। নতুন ভ্যারিয়েন্টের মাদক এলএসডি ও আইসের সঙ্গে জড়িত ১৫টি গ্রুপকে পুলিশ চিহ্নিত করেছে। দুইটিকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও করেছে। অনলাইনে মাদক বেচাকেনার ওপর পুলিশ সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। 

সভায় উপস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন জটিলতা পাসপোর্টের মেয়াদ ১০ বছর করতে হবে।

উল্লেখ্য, গত পাঁচ বছর ধরে এ বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু যে গতিতে এগুনো দরকার তা হয়নি। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০১৬ সালে প্রথম ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট চালুর কথা বলেন। এছাড়া দেশে বর্তমানে পাসপোর্ট  সংক্রান্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন নেই বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রপতির ৭২ সালে জারি করা আদেশ বলে পাসপোর্ট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।