লড়াইটা এখন নিত্যপণ্যে

জীবনটা এখন নিত্যপণ্যের মধ্যেই আটকে আছে। খাবার না খেয়ে তো আর থাকা যায় না— তাই অন্যান্য খরচ কমিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইই চালিয়ে যাচ্ছি কোনোমতে। বেতনের টাকায় সংসার চালানো কঠিন। প্রতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যেই পকেট ফাঁকা। শুরু হয় ধারদেনা। নিকটাত্মীয়, পরিচিতজন ও বন্ধু-বান্ধব সবার কাছ থেকেই ধার করেছি। সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় এখন কেউ ধারও দিতে চান না। কথা বলেন তার জীবন যুদ্ধ নিয়ে। আমার সংবাদের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় এসব কথা বলেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ইনচার্জ বিপ্লব কুমার (ছদ্মনাম)।

তিনি বলেন, ২৫ হাজার টাকা বেতন পাই। আমার পরিবারে মোট সদস্য পাঁচজন। আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। মেয়ে বড় হয়ে গেছে, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। এখন আর তিন রুমের বাসা ছাড়া হয় না। অফিসের পাশে বাসাভাড়া বেশি তাই পুরান ঢাকায় ১৫ হাজার টাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়েছি। ছোট মেয়েটা একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। প্রাইভেট পড়াতে হয় নিয়মিত। এ ছাড়া ছেলেটাও এবার চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেছে। তার জন্যও শিক্ষক রাখতে হচ্ছে। তিন ছেলেমেয়ের প্রতিষ্ঠানের বেতন, গৃহশিক্ষকের বেতন, বই-খাতা-কলম ও যাতায়াত ভাড়া এবং নাশতা খরচ— সব মিলিয়ে ১০ হাজার টাকা লাগে। 

এছাড়া যাতায়াতে তিন হাজার, চিকিৎসায় তিন হাজার এবং পকেট খরচসহ অন্যান্য খরচ বাবদ আরো পাঁচ হাজার টাকা লাগে। ‘যেমন ধরেন, ভাই-বোন আত্মীয় স্বজন আছে। তাদের কিছু সহায়তা করতে হয় মাঝে মাঝে। একটা দাওয়াতে গেলে দুই হাজার খরচ হয়ে যায়।’ জামা কাপড়ের কথা তো বাদই দিলাম। এখন তো ঈদ ছাড়া জামাকাপড় কেনাই হয় না। ছেলেমেয়েদের স্কুল ড্রেস দিয়েই চালিয়ে যেতে বলেছি। কিছু তো করার নাই...আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। 

এবার আসি নিত্যপণ্যে— যেকোনো তরকারি কিনতে যাবেন ৬০-৭০ টাকা। মাছ ৩০০ টাকা কেজি। পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া দিয়ে কি আর সবসময় খাওয়া যায়! একটু কম দাম ছিল ব্রয়লার মুরগির তাও এখন ২০০ টাকার কাছাকাছি। কোরবানি ছাড়া এখন আর গরুর গোশত খাওয়া হয় না। গরুর গোশতের ঘ্রাণ পেলে ছোট ছেলেটা কান্নাকাটি করে। তাই মাঝে মধ্যে তেহারি এনে খাওয়াই বাচ্চাটাকে। মেয়েরা টিপ্পনি করে বলে ‘আহ’ আমরাও যদি কান্না করতে পারতাম তাহলে গরুর গোশত খেতে পারতাম’... আবারো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। টেনেটুনে চললেও মাসে ১৫ হাজার টাকা লাগে বাজার খরচ। 

এইবার বলেন, বেতনের সাথে খরচের কত ফারাক! কিভাবে চলি জানেন? বাবার সম্পত্তি আছে কিছু সেখান থেকে আনি। ভাইয়েরাও সমস্যায় তাই বেশি আনতে পারি না। কেউ কেউ ভিক্ষা করে সন্তান মানুষ করে। আমাদের সন্তান অশিক্ষিত থাকবে? তাই এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ টাকা লোন করে ফেলেছি। রাতে এখন আর ঘুম আসে না। জীবনটা অন্ধকার দেখি। 

সরকারি চাকরি তাই সবার প্রত্যাশাও বেশি— এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আত্মীয় স্বজন অনেক কিছু আশা করে, তাদের জন্য কিছুই করতে পারি না। তাই সবাই আমাকে বাঁকা চোখে দেখে। কি করব বলেন? সবার কাছে তো সব বলা যায় না। লোকে বলে সরকার আমাদের বেতন বাড়াইছে। আমার বেতন বাড়ছে ২০১৫ সালে। এই সাত বছরে সব কিছুর দাম দ্বিগুণ হয়েছে। যারা মাসে ৭০-৮০ হাজার টাকা বেতন পান তারাও যেই বাজারের বাজার করেন আমরাও সেই বাজারে বাজার করি— এটা কেউ বুঝতে চায় না। এক কথায় যদি বলি, এখন ডাল-ভাত জোটাতে গিয়ে বাকি সবই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন আর অসুস্থ হলে সহজে ডাক্তারের কাছে যাই না। 

এদিকে কয়েক দফা দাম বৃদ্ধির পরও স্থিতিশীলতা নেই বাজারে। আজ এটার দাম বেড়েছে তো কাল ওটার। বাজারে গেলে পকেট খালি তো হচ্ছেই, প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস না কিনেই ফিরতে হচ্ছে বাসায়। নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসাস্থল টিসিবির ট্রাকেও এখন হাহাকার। দিন দিন লম্বা হচ্ছে ক্রেতাদের লাইন। ট্রাকসেলের বিষয়ে ক্রেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। ঠিক সময়ে ট্রাক আসে না। এলেও সবাই পণ্য পান না। প্যাকেজের কারণে কিনতে সমস্যা হয় কারো কারো। আবার প্রায়ই দেয়া হয় নিম্নমানের পণ্য। আলু পেঁয়াজের কোনোটাতে সমস্যা থাকবেই। 

গৃহকর্মী জেসমিন। থাকেন রাজধানীর নারিন্দা এলাকায়। ম্যাচ ও বাসায় রান্নাবান্নার কাজ করেন। সকালের ছুটি নিয়েছেন টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনবেন বলে। সাড়ে ৯টায় ট্রাক আসার কথা। সকাল ৮টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে। হাতে পাঁচ লিটারের একটি সয়াবিন তেলের বোতল নিয়ে ফিরছেন। তখন বিকাল ৪টা বাজে। সারা দিন লাইনে দাঁড়িয়েও পাননি পণ্য। তার সিরিয়াল আসার আগেই আলু, পেঁয়াজ, চাল শেষ হয়ে গেছে। 

তাই শুধু এক বোতল সয়াবিন তেল নিয়েই ফিরছেন। ওদিকে সকালের ছুটি নিয়েছেন কিন্তু বিকেলের রান্নার জন্য যেতে হবে। সারা দিন পানি আর পাঁচ টাকা দামের এক প্যাকেট বিস্কুট ছাড়া কিছুই খাননি। বাড়তি দামে দোকান থেকে কেনার সামর্থ্য না থাকায় এসেছেন টিসিবির লাইনে। আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন জেসমিন। গত বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের চারপাশে ঘুরে ঘুরে গ্রিল ধরে উচ্চস্বরে সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন দিনমজুর রুবেল। 

চিৎকার করে বলছিলেন, ‘টিসিবির গাড়ি আসে না কেন? আমার সংবাদকে রুবেল বলেন, ‘টিসিবি থেকে মাল কিনব তাই আইজকা কামে যাই নাই। আইসা দেখি গাড়ি নাই। এখন আমি কি করুম?’ 

রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছিল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা কেজিতে। আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা কেজি। লাল লেয়ার ২৪০ আর সাদা লেয়ার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। ভরা মৌসুমেও চড়া সবজির বাজার। কয়েক দিন আগে যে শিম বাজারে ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা কেজি। বাড়তি রয়েছে লাউ, কপি, ব্রুকলি, টম্যাটোর দামও। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, জুরাইন ও কাপ্তানবাজার ঘুরে বিভিন্ন পণ্যের দামের আগের সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বাজারে এখনো প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। ফুলকপি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৩৫-৪০ টাকা, মুলা ৪০ টাকা কেজি, শিম প্রকারভেদে ৫০-৭০ টাকা কেজিতে। 

এছাড়া এই সময়ে ভালো শালগম ও ব্রুকলি পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম নাগালের বাইরে। শালগম ৫০ টাকা, আর ব্রুকলি ৫০-৬০ টাকা পিস। ৩৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে দেশি আলু। পাকা টমাটোর কেজি ৫০-৬০ টাকা, গাজর ৪০ টাকা, বরবটি ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। শাকজাতীয় খাদ্যের মধ্যে লালশাক, মুলাশাক ১৫ টাকা আঁটি, পালংশাক ৩০ টাকা, মেথিশাক ২০ টাকা, ডাটাশাক ২০ টাকা আঁটিতে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে গত সপ্তাহে হঠাৎ করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার খবর আসে সংবাদমাধ্যমগুলোয়। ব্যবসায়ীরা এককভাবে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। লিটারে আট টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব গত বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে বাতিল করার পর স্বস্তি ফিরেছে ক্রেতাদের মাঝে। যাত্রাবাড়ীতে সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা লিটার। 

কেনাকাটার সময় ক্রেতা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘শোনা যাচ্ছিল সয়াবিন তেলের দাম আবারো বাড়ানো হবে। এটি করা হলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটারের দাম পড়বে ১৬৮ টাকা। 

তিনি বলেন, ‘চারদিকে সব কিছুর দাম বাড়তি। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের যে ব্যবস্থা ছিল সেটিও দেখা যায় না। ফলে বিক্রেতা আজ এক কথা, কাল আরেক কথা বলে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন।’ অবশ্য পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। দেশি পেঁয়াজের দাম আগের সপ্তাহের ৫৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় নেমেছে। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৪৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা হয়েছে। দেশি রসুন বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়, আমদানি করা রসুন ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজিতে। মাছের বাজারে রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা কেজি। ইলিশ এক হাজার ২০০ টাকা কেজি, কাতল ৩০০-৩৫০ টাকা কেজি। টাকি মাছ ৩৫০ টাকা, তেলাপিয়া ১৫০ টাকা, পাঙ্গাশ ১৩০ টাকা, শোল মাছ বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকা কেজিতে।

একই বাজারের বিক্রেতা আব্দুর রহমান বলেন, ‘পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারে দাম বাড়বেই। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পাইকারি বাজারে দাম কমলে, অন্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় সে দাম আর কমানো হয় না। লেবার খরচ, পরিবহন খরচ, দোকান ভাড়া- সব হিসাব করলে ব্যবসায় এখন তেমন লাভ হয় না।’ 

এদিকে অস্থিরতা চলছে চালের বাজারে। ৫০ টাকার নিচে বাজারে কোনো চাল নেই। সরু চাল (নাজির-মিনিকেট) ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা। মাঝারি মানের চাল (পাইজাম-লতা) ৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা। স্বর্ণা ও চায়না ইরি জাতের মোটা চলের দাম ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা। খোলা আটার দাম আগের সপ্তাহের মতোই অপরিবর্তিত থাকলেও প্যাকেট আটার দাম ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা হয়েছে। খোলা ময়দার দাম ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা হয়েছে। প্যাকেট ময়দার দাম আগের সপ্তাহের মতো ৫০ টাকায় স্থির আছে। চালের দাম বাড়ার কারণ জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। 

গত মঙ্গলবার ‘সপ্তম ডি-৮ মিনিস্ট্রিয়াল মিটিং অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি’ নিয়ে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, আটার দাম বাড়ার কারণে মানুষ চালে ঝুঁকছে, এটি চালের দাম বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ। 

মন্ত্রী বলেন, ‘সবসময় গমের দাম কম থাকে। যখন আটার দাম কম থাকে, তখন মানুষ আটা খায়। এখন তার উল্টো হয়েছে, গমের দাম বেশি। এতে মানুষ আবার চালের দিকে ঝুঁকেছে। আগে বিদেশ থেকে আনা গমের দাম ২৫০-৩০০ ডলারের বেশি হয়নি। সেই গমের টন এখন সাড়ে ৪০০ ডলার। সারের দাম বেশি। ২৫০ টাকার সার এখন এক হাজার টাকা। কৃষি উৎপাদন ও কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে একটা অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আমি মনে করি, এটি কেটে যাবে। কিছু দাম বাড়লেও, তা বেশি দিন থাকবে না।’