এ মাসেই ভয়াবহ হচ্ছে সংক্রমণ

  • সংক্রমণ ঠেকাতে আজ থেকে ১১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু
  • এক সপ্তাহে কোভিড রোগী শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে আড়াই গুণ
  • প্রতিটি জেলাকে লাল, হলুদ ও সবুজ তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে
  • ঢাকা ও রাঙ্গামাটি রয়েছে করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে
  • তৃতীয় ঢেউয়ের জন্য ওমিক্রন দায়ী —মত বিশেষজ্ঞদের 
  • নির্দেশনায় স্বাস্থ্যবিধি, মাস্ক পরিধান ও টিকায় জোর দেয়া হচ্ছে
  • সিদ্ধান্ত হয়নি স্থানীয় নির্বাচন বাণিজ্যমেলা ও বইমেলার নিয়ে

ওমিক্রন দেশকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। গতকাল দুই হাজার ৯১৬ জনের নমুনায় করোনার উপস্থিতি মিলেছে। এক সপ্তাহ আগে একদিনে রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল (৬ জানুয়ারি) এক হাজার ১৪০ জনে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আড়াই গুণ বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি মাসেই ফের করোনার গণসংক্রমণ হতে পারে। তৈরি করতে পারে ভয়াবহ পরিস্থিতি। 

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য মতে, অস্বাভাবিক হারে সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন দায়ী সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া প্রায় ২০ শতাংশ ওমিক্রন আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আফ্রিকার এই ধরনটি সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্রতার সাথে ছড়িয়ে পড়বে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। 

গত সাত দিনে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা ও রাঙ্গামাটিকে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির জেলা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সীমান্তের ছয় জেলা মধ্যম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আজ বৃহস্পতিবার থেকে ১১ দফা নির্দেশনা কার্যকর করবে সরকার। যেখানে মাস্ক পরিধান, স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন, ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব ধরনের আচার অনুষ্ঠান এবং জনসমাগম এড়ানো ও গণপরিবহনে অর্ধেক আসনে যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। 

তবে চলমান স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ও আসন্ন বইমেলার বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। চিকিৎসকরা বলছেন, ফের গণসংক্রমণ ঠেকাতে সরকার এককভাবে সক্ষম নয়।     

এ ক্ষেত্রে সরকার-জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নয়তো চলতি মাসেই ভয়াবহতা ছড়াতে পারে। এদিকে গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন. আগামী পাঁচ-সাত দিনের মধ্যেই অনেক রোগী হয়ে যাবে হাসপাতালে। তখন আবার একটা কষ্টকর অবস্থা তৈরি হবে। হাসপাতালে প্রেসার পড়বে, চিকিৎসক-নার্সদের ওপর প্রেসার পড়বে। সিট পেতে সমস্যা হবে, মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে। 

তিনি বলেন, আরও ২০ হাজার শয্যা প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদি ৪০ হাজার রোগী হয়, তাহলে রাখা যাবে। কিন্তু যদি এক লাখ হয়, তাহলে কোথায় থাকবে? আক্রান্তের সংখ্যা যদি তিনগুণ-চারগুণ হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু বেকায়দায় পড়তে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গতকাল বুধবার দুই হাজার ৯১৬ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। একই সময়ে চার জনের মৃত্যু হয়। 

এর আগের দিন ১১ জানুয়ারি দুই হাজার ৪৫৮ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হলেও মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। তার আগের দিন ১০ জানুয়ারি দুই হাজার ২৩১ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। মারা যায় আরও তিন জন। ৯ জানুয়ারি এক হাজার ৪৯১ জনের নমুনায় ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এ সময় মৃত্যু হয় আরও তিন জনের। 

তার আগের দিন এক হাজার ১১৬ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। মারা যায় একজন। ৭ জানুয়ারি এক হাজার ১৪৬ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হলেও মৃত্যু হয়েছে একজনের এবং সপ্তাহের শেষ দিন গত ৬ জানুয়ারি এক হাজার ১৪০ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয় এবং সেদিন সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ৬ জানুয়ারি সাত জনের মৃত্যু হয় করোনায়। গত এক সপ্তাহে দেশের ১২ হাজার ৪৯৮ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। এ সময় মৃত্যু হয় ২১ জনের। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, সংক্রমণের মাত্রা বিবেচনায় সারা দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ— এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। লাল রঙকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, হলুদকে মধ্যম এবং সবুজ কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ও পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকির এলাকা ঢাকা ও রাঙ্গামাটি জেলায় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ১০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে। মাঝারি মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সীমান্তবর্তী ছয় জেলা। 

মধ্যম মাত্রার ঝুঁকিতে থাকা রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, যশোরে শনাক্তের হার এখন ৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। আর সংক্রমণের হার শূন্য থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে এমন ৫৪টি জেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে সবুজ রঙে। 

এই জেলাগুলো হলো— চট্টগ্রাম, বগুড়া, গাজীপুর, কক্সবাজার, কুষ্টিয়া, নীলফামারী, বরগুনা, শেরপুর, মেহেরপুর, ঠাকুরগাঁও, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, পিরোজপুর, বাগেরহাট, নারায়ণগঞ্জ, নওগাঁ, ঝালকাঠি, খুলনা, পটুয়াখালী, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, ফরিদপুর, বরিশাল, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী, সিলেট, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, খাগড়াছড়ি, ঝিনাইদহ, পাবনা, মাদারীপুর, মাগুরা, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, নেত্রকোনা, ভোলা, টাঙ্গাইল, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নড়াইল।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ডা. মো. মুশতাক হোসেন বলেন, ভয় নয় সচেতনতা ও সতর্কতা পারে করোনার আসন্ন ঢেউ রুখতে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতেই জারি করা হয়েছে আংশিক বিধিনিষেধ। মানুষ যেন সতর্ক হয়। সার্বিক বিধিনিষেধ যেন জারি করতে না হয়। এরপরও যদি মানুষ সচেতন ও সতর্ক না হয় তাহলে সরকারের একার পক্ষে বিধিনিষেধ কিংবা জারিকৃত নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। বাস্তবায়নেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। নয়তো সরকার রেস্টুরেন্টে টিকা কার্ড নিয়ে খেতে যাওয়ার কথা বলেছে কিন্তু রেস্টুরেন্ট মালিক যদি সেটি কার্যকর না করে সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সার্বিক ও কঠোর বিধিনিষেধ এড়িয়ে জীবন জিবিকা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের সাথে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিকে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন ভার্চুয়াল বুলেটিনে অংশ নিয়ে বলেন, সংক্রমণ হঠাৎ করে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে ধরে নিতে হবে নতুন যে ভ্যারিয়েন্ট তারই সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। অনেকেই টেস্ট করছেন না। সবাই যদি টেস্ট করতেন এবং সংক্রমিত যেসব সিম্পটোমিক যেসব রোগী আছেন তাদের সবাইকে টেস্ট করলে হয়তো সংখ্যাটা আরও অনেক বৃদ্ধি পেতো। 

তিনি বলেন, ঢাকা এবং রাঙ্গামাটি বর্তমানে কোভিডের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। এ ছাড়া, ৫৪টি এলাকাকে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কম থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে আছে সীমান্তবর্তী বেশ কয়েকটি জেলা। যশোর, রাজশাহী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, নাটোর ও রংপুর। এসব জেলায় সাবধানতার সাথে তাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।