চাকরি না করেও পাচ্ছেন এক বছরের বেতন-ভাতা

৬০ বছর চাকরি করে অবসরে যাওয়াদের মতো আর্থিক সুবিধা পাবেন ৫৯ বছর চাকরি করে অবসরে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অর্থাৎ তারা এক বছর চাকরি না করেও এক বছরের বেতন-ভাতাদি পাবেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তারা এই সুবিধাদি পাচ্ছেন। 

ইতোমধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি না করেও এক বছরের বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এক বছরের অতিরিক্ত সুবিধাদি পাওয়ার তালিকায় আরও প্রায় ২২৭ জন কর্মকর্তা পাইপলাইনে তথা অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। তারা সবাই আদালতের রায়প্রাপ্ত এবং তাদের টাকা দিতেই হবে। 

অপরদিকে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে ভিত্তি ধরে আরো কয়েকশ কর্মকর্তা এই সুবিধা পাওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। অর্থাৎ যারা মামলা করেননি তারাও এখন সেই সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করছেন। ফলে বিপাকে পড়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত সচিব লুৎফুন নাহার বেগমকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কমিটিতে আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিনকে সদস্য করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য সচিব ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, বিষয়টির সঙ্গে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। ইতোমধ্যে মামলার পক্ষভূক্তদের অনেকেই টাকা তুলে নিয়ে গেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ২০১৩ সালে ৫৯ বছর চাকরি করে যারা অবসরে গেছেন তাদের বড় একটি অংশ ৬০ বছর চাকরির সুবিধা পাননি। তারা সবাই এখন বর্ধিত এক বছরের বেতন-ভাতাদি দাবি করে আবেদন করছেন। বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সচিব পর্যন্ত গিয়ে গড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য এ কমিটি করা হয়েছে। 

তিনি আরও জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিষয়টি অর্থ বিভাগকে জানানো হয়েছে। কী পরিমাণ অর্থ এ খাতে খরচ হতে পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।  ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৫৯ বছর নির্ধারণ করে সরকার। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বর্ধিত দুই বছর চাকরি শেষে ৫৯ বছরে অবসরে গেছেন সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০১৩ সালে  হঠাৎ করে সরকার মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের অবসরের সময়সীমা  এক বছর বাড়িয়ে  ৬০ বছর নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করে। 

সে ক্ষেত্রে ২০১৩ সালে অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণ করার আগে অর্থাৎ ২০১০ যারা ৫৯ বছর অবসর সুবিধা পেয়েছেন, তারাই কেবল এক বছরের বর্ধিত বেতন-ভাতা দাবি করছেন। ২০১০ সালে ৫৯ বছর অবসরের বয়সসীমা নির্ধারণের আগে যারা অবসরে গেছেন, তারা এই সুবিধা পাবেন না। তবে ২০১৩ সালে জারি করা গেজেটে বলা ছিল— জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে যাদের সত্যায়ন করবে কেবল তারাই ৬০ বছর চাকরির সুবিধা পাবেন।

মামলার বাদি খাদ্য বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন শিকদার আমার সংবাদকে বলেন, ‘কত সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এই সুবিধাদি পাবেন তা কেবল অর্থ বিভাগই জানেন। 

তিনি আরো বলেন, জামাল উদ্দিন শিকদারগং বনাম রাষ্ট্র হাইকোর্টের ২৩৫-২০১২ রিট মামলায় তাদের এক বছরের বেতন-ভাতাদি দেয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতের রায় বাস্তায়ন না করায় আবেদনকারীরা আদালত অবমাননা মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর মামলা নং ২১৬-২০১৩। আদালত অবমাননার জবাব না দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। সুপ্রিম কোর্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আপিল খারিজ করে দেন এবং রিট নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।  

অর্থাৎ জামাল উদ্দন শিকদারসহ আবেদনকারীদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে। সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে গড়িমশি করলে এরপর আবেদনকারীরা পুনরায় আদালত অবমাননার মামলা করেন। যার নম্বর মামলা নম্বর-২০৬২-২০১৬। অবশেষে বাধ্য হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের আর্থিক সুবিধা দেয়। 

তিনি বলেন, এটি কারো করুণার বিষয় নয়। বরং মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো পাওনা। আদালত রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন। ২০১০  সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেক বাড়িয়ে ৫৯ বছর নির্ধারণ করে সরকার। বিষয়টি নিয়ে অমুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রক্রিয়া তথা দ্বন্দ্ব তৈরি হলে ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাদের অবসরের সময়সীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। যা ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে বলে প্রকাশিত সরকারি গেজেটে নোটিফিকেশনে উল্লেখ করা হয়। 

অমুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়সীমা দুই বছর বাড়ানোর প্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ করার দাবি তোলেন। তাদের যুক্তি হলো— মুক্তিযোদ্ধারা জাতির গর্বিত সন্তান। তাদের জন্য ভিন্ন কিছু করা বা বাড়তি সুবিধা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। এটি তাদের প্রতি সম্মান দেখানো মাত্র। সে ক্ষেত্রে উভয়ের অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা আর অমুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির মেয়াদকাল এক হলে বিষয়টি অসুন্দর দেখায়। শেষ পর্যন্ত সরকার ২০১৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর করে গেজেট প্রকাশ করে।  

২০১৪ এবং ২০১৫ সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর নির্ধারণ করার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করা হলে উচ্চ আদালত থেকে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য মন্ত্রিসভায় উন্থাপনের নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালত থেকে বলা হয়— মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা কত হতো মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেবে। 

বিষয়টি প্রশাসনিক। বিষয়টি বারবার আদালতে না এনে প্রশাসনিকভাবে মীমাংসা করাই শ্রেয়। মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই চুড়ান্ত। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ফের মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উন্থাপন করা হয়। মন্ত্রিসভা বিষয়টি অনুমোদন করেননি।