হাইড্রোজেন গ্যাস বিস্ফোরণ ঠেকাতে অনীহা

 নিয়ম না মেনে অননুমোদিত উপায়ে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে গিয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে হকার শ্রেণির লোকজন। দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেলা কিংবা উৎসব উপলক্ষে বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরতে গিয়ে ঘটছে বিপজ্জনক বিস্ফোরণের ঘটনা। এতে শিশু থেকে বৃদ্ধরা পর্যন্ত মারাত্মকভাবে দগ্ধ হচ্ছে, ঘটছে অকাল মৃত্যুর ঘটনাও। 

২০১৯ সালে রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর স্কুলের রূপনগর শাখা এলাকার শিয়ালবাড়ী বস্তির পাশেও বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় সাত জনের মৃত্যুও হয়। ঘটনার পর তদন্ত শেষে বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ চেয়ে একাধিক সুপারিশও করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। একই সাথে হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহারকারী বেলুন বিক্রেতাদের পাকড়াও করতে পুলিশের তৎপরতাও চায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এই দপ্তরটি। 

মন্ত্রণালয় থেকে মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের চিঠি দেয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি আদৌ। পুলিশও এমন বেলুন বিক্রেতাদের একজনকেও আটক করেছে এমন নজির নেই। যে কারণে আবারো কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে মেলা উপলক্ষে বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরতে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এ ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ৪১ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেছিলেন, ‘রূপনগরের ঘটনা ঘটেছে হকার শ্রেণির লোকের মাধ্যমে। নিয়ম না মেনে নিজে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করতে গিয়ে এক পর্যায়ে কেমিক্যালের রিঅ্যাকশনে অতিরিক্ত হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি হয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। একইভাবে এখনো হকার শ্রেণির লোকেরাই এসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে।’ 

সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের কাজ দেখামাত্র বেলুন বিক্রেতাদের যেন ধরা হয়, সে বিষয়ে পুলিশকেও সতর্ক করা হবে।’ হাইড্রোজেন বেলুনের পরিবর্তে হ্যালোজেন বেলুন ব্যবহারের অনুমতি দেয়া যায় কি-না এবং হাইড্রোজেন বেলুন নিষিদ্ধ করা যায় কি-না, সে বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরবেন তিনি। এছাড়া তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন মা-বাবাদের সচেতনতা। তারা যেন হাইড্রোজেন বেলুন না দেন শিশুদের, কিন্তু বর্তমান সময়ে এসবের বাস্তবায়নহীনতায় রোধ করা যাচ্ছে না বিস্ফোরণ। 

তিনি বলেছিলেন, এ ধরনের কার্যক্রম রোধের জন্যে স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করার বিষয়ে আগেও চিঠি দেয়া হয়েছে, আবারো চিঠি দিচ্ছি। সতর্কতার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রচারণার জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখেছি। জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অথচ হাইড্রোজেন গ্যাসের এমন বিপজ্জনক বিস্ফোরণ রোধে জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কারোই তেমন কোনো ইচ্ছা না থাকায় এবং মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া চিঠির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করায় বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছেই। 

পরিদপ্তরের বর্তমান প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘রূপনগরের ঘটনার পর তদন্ত সাপেক্ষে সুপারিশ করে গেছেন পরিদপ্তরের সাবেক প্রধান পরিদর্শক সামশুল হক। সাধারণত কোনো একটি ঘটনা ঘটলে আমাদের যেকোনো একজন কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত করে দেখেন, কি কারণে আসলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটল। 

২০১৯ সালের ঘটনায় সুপারিশের বিষয়টি না জানলেও তিনি বলেন, যেহেতু হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়ে বেলুন রিফিল করায় বিস্ফোরণ হয়েছে এবং এর প্রেক্ষিতেই তারা সুপারিশ করেছিলেন যেন হ্যালোজেন গ্যাস দিয়ে বেলুন রিফিল করা হয়। যেকোনো রিপোর্ট হওয়ার পর সাধারণত আমরা আমাদের প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে অবহিত করি এবং সে বিভাগের মাধ্যমেই ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য, আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যও জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়। মন্ত্রণালয় তৎকালীন প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে সঠিক কাজটাই করেছে এবং আমাদের নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টকে জানিয়েও দিয়েছে যেন বেলুনে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরা নয় হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক কিংবা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এটা বাস্তবায়ন করছে না। এটা তাদের করা উচিত। আমাদের প্রশাসনিক দপ্তরের পক্ষ থেকে যতটুকু ব্যবস্থা নেয়ার দরকার তাতে কোনো কমতি নেই; এমনকি ঘাটতিও ছিল না। আমাদের বিভাগ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর আঙ্গিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসকদের তিনি আমার সংবাদের মাধ্যমে আবারো তা স্মরণ করিয়ে দিতে চান। যদিও তারাও হাজারো কাজ করে থাকেন, এর মধ্যে ডিসি পরিবর্তন হয়, এসপি পরিবর্তন হয়। 

২০১৯ সালেও যে ডিসি ছিল এখন সেই ডিসি নেই বা এ বিষয়টি তাদের আবার স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে বলে বলছেন তিনি। যেন আবার এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়। তিনি বলেছেন, দৈনিক আমার সংবাদে প্রকাশিত এ সংবাদ বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে আবারো আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকসহ পুলিশ সুপারদের জন্য এটা একটা বার্তা।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘ডিসি-এসপি-ওসিরা তো সব আইনি ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে পারে। কোনো আইনই তাদের নাগালের বাইরে নয়। জেলা প্রশাসক চাইলে মোবাইল কোর্ট ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। যেহেতু এটি জাতীয় ইস্যু এবং এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে, সেহেতু এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আবারো তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে।  তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আমার সংবাদের মাধমে তার এ বার্তায় দেশজুড়ে জনসচেতনতা বাড়াবে। জেলা প্রশাসক ছাড়াও পুলিশও বিষয়টি আমলে নেবে। 

এদিকে সর্বশেষ কুমিল্লায় বিস্ফোরণের ঘটনায় জানা গেছে, নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের মোঘরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রতি বছর পয়লা মাঘ শীতকালীন মেলা হয়। আজ শনিবার সেই মেলা হওয়ার কথা। মেলায় বিক্রির জন্য বিরলী গ্রামের আনোয়ার হোসেন বেলুনে গ্যাস ভরছিলেন। আর তা দেখার জন্য ভিড় করেছিল এলাকার শিশুরা। তাদের সাথে বয়স্কদেরও অনেকেই ছিলেন। হঠাৎ সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়ে উড়ে যায়। এতে পাশে ভিড় জমানো অন্তত ৪১ জন আহত হয়। আহতদের বেশির ভাগই শিশু।

দুর্ঘটনায় আহত আলাউদ্দিন বলেন, প্রায় ২০০ বছর ধরে মেলাটি হচ্ছে বলে শুনেছি। এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসে। আমি আনোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে বেলুন নিয়ে মেলায় বিক্রি করি। ওই দিন বিকেলে গিয়েছিলাম বেলুন আনতে। এরই মধ্যে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি রক্তে লাল হয়ে যায়। 

জানা গেছে, বিস্ফোরণে ‘অনেকের শরীরে হাজারের বেশি লোহার টুকরা’ প্রবেশ করেছে। এমনটা হওয়ার কারণ জানতে চাইলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মির্জা মুহাম্মদ তাইয়েবুল ইসলাম বলেন, ‘বিস্ফোরণে সিলিন্ডারের অনেকাংশ ‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ায়’ এই পরিণতি হয়েছে। শরীরে লোহার টুকরা বিদ্ধ হওয়া ছাড়াও পাঁচ-ছয়জন অগ্নিদগ্ধ হয়। আর বেশ কজনের হাত-পাও ভেঙে গেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আহতদের প্রথমে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলেও পরে অনেককে কুমিল্লা এবং পাঁচজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়।’ 

মির্জা মুহাম্মদ তাইয়েবুল বলেন, ‘বিস্ফোরণে সিলিন্ডারটির অনেকাংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। অনেকের শরীরে এক হাজারেরও বেশি স্পিল্টার প্রবেশ করেছে।’ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দেবদাস দেব বলেন, ‘আহত ৪১ জনের মধ্যে ৩৮ জনকে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কুমেকে ও সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।’ 

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি হয়েছে স্প্লিন্টার ইনজুরি। এ ছাড়া অনেকে ব্লাস্ট ইনজুরিতে আহত হয়েছে। অনেকের হাত-পা ভেঙে গেছে। অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ 

কুমেকের পরিচালক মহিউদ্দিন বলেন, ‘গুরুতর আহত ১৭ জনকে কুমেকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠিয়েছেন তারা। তা ছাড়া আরও দুইজনকে তাদের স্বজনরা নিজ দায়িত্বে ওই ইনস্টিটিউটে নিয়ে গেছেন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও কুমিল্লা সদর হাসপাতালে পাঁচজন ও নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও দুইজনকে ভর্তি করা হয়েছে। 

এদিকে সবার চিকিৎসা ভালোভাবে চলছে বলে জানিয়েছেন জেলার সিভিল সার্জন মীর মোবারক হোসাইন। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন কারণ জানতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। 

কমিটির সদস্যরা হলেন— উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল হক, নাঙ্গলকোট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুল ইসলাম ও উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা। তাদের আগামী কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। নাঙ্গলকোট থানার ওসি মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, তারা ঘটনা তদন্ত করছেন। এ ঘটনায় এখনো কেউ অভিযোগ করেনি। তবে তদন্তে সব বেরিয়ে আসবে। 

বিস্ফোরণে বেলুন বিক্রেতা আনোয়ার ও তার মেয়েসহ পরিবারেরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তার বোন ফারজানা আক্তার। তিনি বলেন, আমার ভাই বেশ কয়েক বছর ধরে মেলার জন্য পাইকারি বেলুন বেচে থাকে। খুচরাও বেচে। ভাই আর তার ছয় বছরের মেয়ে মরিয়ম আক্তারের অবস্থা আশঙ্কাজনক। 

এছাড়া পরিবারের বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলছে। যে কারণে সর্বশেষ রাজধানীর মিরপুরে ঘটনাটি বড় ঘটনা হিসেবে গণ্য হয় এবং ওই ঘটনার পর বিস্ফোরক পরিদপ্তর ছাড়াও বিভিন্ন মহল থেকে হাইড্রোজেন গ্যাসের এমন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবি উঠলেও তাতে এখনো বলার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক কামরুল হাসানকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।