Amar Sangbad
ঢাকা শুক্রবার, ২০ মে, ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

সবার দৃষ্টি নাসিক নির্বাচনে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জানুয়ারি ১৫, ২০২২, ০৬:১৫ পিএম


সবার দৃষ্টি নাসিক নির্বাচনে

স্থানীয় সরকারের একটি দপ্তর হলেও দেশের সকল পর্যায়ের দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। ভোটের মাঠ আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়রপ্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের দখলে। 

নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছে। মোট সাতজন মেয়রপ্রার্থী ও ২৭টি ওয়ার্ডে ১৪৮ জন সাধারণ কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনে ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে জয়লাভ করার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী দুই প্রার্থীই। নানা শঙ্কার মধ্যে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চ্যালেঞ্জে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। 

ফেব্রুয়ারিতে বিদায় হতে চলা কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিইসি কে এম নুরুল হুদা কমিশনের অধীনে এই ভোট তাদের ‘ইমেজ’ বাঁচানোরও নির্বাচন।  শেষ ভালো হলে হয়তো বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারবে হুদা কমিশন— মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

ইতোমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা জানিয়েছেন, এই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। কারণ ভোটগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মাস্ক ছাড়া কোনো ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দিতে এবং এটা নিশ্চিত করতে যে, সবাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন। 

নাসিক নির্বাচনের প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই প্রধান দুই হেভিওয়েট প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী  ও তৈমূর আলম খন্দকারের মধ্যে চলা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছে। উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি একে অপরের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন বিস্ফোরক মন্তব্য। গত ২৮ ডিসেম্বর প্রতীক পাওয়ার পর প্রচারের শেষ দিন পর্যন্ত নৌকা প্রতীকের ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আর হাতি মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের কথার রসায়নে মেতে ছিল নারায়ণগঞ্জবাসী। 

আনুষ্ঠানিক প্রচারের দিনগুলোতে বড় ধরনের কোনো গোলযোগের খবর আসেনি। দুই প্রার্থীর রসায়নের মধ্যেই আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান। সবমিলিয়ে নাসিক নির্বাচন এখন সারা দেশের নজরে রয়েছে। 

নাসিক নির্বাচনের ভোট উৎসবে সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলো। আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয় নিশ্চিতে কাজ করেছেন কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা। নির্বাচনকে কৌশল হিসেবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। 

স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকারকে অব্যাহতির ঘটনাকে আইওয়াশ বলছে সংশ্লিষ্টরা। দলটির দ্বিতীয় সারির কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা হাতি প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছেন। কৌশল হিসেবে সিনিয়র নেতারা প্রচারণায় নামেননি। বিএনপি কৌশল করে তাকে দল থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, বহিষ্কার করেনি। দল থেকে অব্যাহতি দেয়ায় সাধারণ মানুষের একটি অংশের সিমপ্যাথি পাচ্ছেন তৈমূর। 

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের একটি অংশের সমর্থনে সুবিধা নিতে চাচ্ছেন তিনি। ভোটের মাঠে নেমে শামীম ওসমানের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন আইভী। শামীম ওসমানের অনুসারীরা তৈমূরের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যদিও শামীম ওসমান নৌকার পক্ষে আছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন। শহরটির পাঁচ লাখ ১৭ হাজারের বেশি ভোটার আজ মেয়র এবং ২৭টি ওয়ার্ডে ১৪৮ জন কাউন্সিলর বাছাইয়ে রায় দেবেন। 

প্রচারের শেষ দিনে সেলিনা হায়াৎ আইভী  ও তৈমূর দুজন আশাব্যক্ত করে  বলেছেন  লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন। যার কারণে ভোটে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দুই মেয়রপ্রার্থীর শক্ত অবস্থান ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার শক্তিপ্রদর্শনের লড়াইয়ে নির্বাচনে সহিংসতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও শঙ্কা প্রকাশ করছেন। 

২২ নম্বর ওয়ার্ডের এক ভোটার শঙ্কা জানিয়ে বলেন, ছয়জন কাউন্সিলর প্রার্থীর সবাই নির্বাচনে জেতার জন্য জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, কাউন্সিলর নির্বাচন ঘিরে গোলযোগের আশঙ্কা রয়েছে। একজন প্রার্থীর সমর্থকরা ইতোমধ্যে তাদের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছেন। ২৪নং ওয়ার্ডের এক ভোটার জানান, কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। একজনের সমর্থকরা আরেকজনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডা চালাচ্ছেন। 

নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধার্থে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো এবারই নারায়ণগঞ্জ সিটির সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ৯টি সংস্থার ৪২ পর্যবেক্ষককে অনুমতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। 

২৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি ভোটকেন্দ্রে ও কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছে। প্রতি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২৬ সদস্য। থাকবে পুলিশ ও র্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স। বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে। 

নাসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার জানান, আদালাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নেই, সবগুলো কেন্দ্রকেই বিশেষ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। পুলিশের ২৭টি ইউনিট স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে। এছাড়াও পুলিশের মোবাইল টিম থাকবে ৬৪টি, প্রতি টিমে সদস্য থাকবেন পাঁচজন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১৪ প্লাটুন সদস্য থাকবে। র্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে তিনটি, চেকপোস্ট থাকবে ছয়টি, টহল টিম থাকবে সাতটি ও স্ট্যাটিক টিম থাকবে দুটি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। ইলেকশন শান্তিপূর্ণভাবে হবে। তিনি বলেন, আমরা ভোটের সব সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়েছি। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করছেন। আরও ৩০ জন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবেন। পুলিশের ৭৫টি ও র্যাবের ৬৫টি টিম মাঠে থাকবে। বিজিবিও আমাদের সঙ্গে কাজ করবে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। নির্বাচনের জন্য যারা থ্রেট হতে পারেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আশা করি সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।

আজ ভোটের দিন নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ছাড়া কেউ চলাচল করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জায়েদুল আলম। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমাদের তরফ থেকে নির্বাচনি কোনো সহিংসতার আশঙ্কা নেই। নির্বাচনের দিন কোনো বহিরাগতকে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে দেবো না। ভোটের দিন সবাইকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে চলাচল করতে দেয়া হবে।

এসপি জায়েদুল আলম বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থী লিখিতভাবে অভিযোগ করেননি। মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যেসব অভিযোগ পেয়েছি সেগুলো নিয়ে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করে দেখছি। কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে বা কোনো বাধা দেয়া হচ্ছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশেই প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি আরও বলেন,  নির্বাচন শেষে আপনারা প্রমাণ পাবেন যে, ভোটগ্রহণ কতটা সুষ্ঠু হয়েছে। 

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও বির্তকমুক্ত রাখতে চায় সরকার। গতকাল এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হবে অত্যন্ত সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ, যা জাতীয় পর্যায়ে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করবে।

তিনি বলেন, সে লক্ষ্যে সরকার নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তাদের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে ২৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রের এক হাজার ৩৩৩ ভোটকক্ষে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। ভোটের মাঠে মেয়র পদে ছয়জন, সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৩৪ জন এবং সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৪৫ জনসহ মোট ১৮৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন। 

মেয়র পদে ছয়জন প্রার্থী হলেন— খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. মাছুম বিল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. জসীম উদ্দিন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মো. রাশেদ ফেরদৌস এবং বাংলদেশ আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী।

২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরুর পর নাসিকে এবার হচ্ছে তৃতীয় নির্বাচন। প্রথমবার ৯টি ওয়ার্ডে ইভিএমে, বাকিগুলোয় ব্যালট পেপারে ভোট হয়। ২০১৬ সালে সব কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে এবং এবার ভোট হবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে। প্রথমবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হয় এ সিটিতে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন চালুর পর এটি দ্বিতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে।