Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ভাতিজির দুর্বলতায় চাচার পাল্লা ভারী

জানুয়ারি ১৫, ২০২২, ১০:২৫ পিএম


ভাতিজির দুর্বলতায় চাচার পাল্লা ভারী

বিএনপির ছায়ায় থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার (হাতী প্রতীক) শেষবেলায় এসে করেছেন পাল্লা ভারী। তৈমূর আলমের রাজনীতি শুরু আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার হাত ধরে। আইভী তৈমূরকে চাচা বলেই সম্বোধন করেন। কাজেই নাসিকের লড়াইটা এবার প্রকাশ্যে চাচা-ভাতিজির লড়াই। এই লড়াইয়ে ওসমান পরিবারের প্রভাব অতীতের মতো নাও পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। 

গত বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে ‘গোপন’ বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নাসিক নির্বাচনে দলীয় মেয়রপ্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর কবির নানক। এসময় দলের অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিমও ছিলেন। 

তৈমূরের ভাষ্য, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই গোপন এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বয়ং বৈঠকটি ওসমান পরিবারও ভালোভাবে নেয়নি বলে দাবি উঠে। ‘নৌকা ভাসলে ভাসবে সবাই’— এমন স্লোগানেও আর দলীয় প্রতীকে ভেতরে ভেতরে ঐক্যবদ্ধ নেই ওসমান পরিবার। এসেছে আইভীর সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের দলীয় দূরত্ব ও দীর্ঘ সময়ের নেতৃত্বে দুর্বলতা। 

মেয়র হিসেবে আইভী কতটা সফল? প্রচারণা শেষে এমন প্রশ্ন ঘুরছে নগরবাসীর মুখে মুখে। আইভীর সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তাছাড়া এবারের নির্বাচনে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রচারণা শেষ করেছেন। বিগত দুটি নির্বাচনে তার প্রচারণার অগ্রভাগে যাদের দেখা গেছে এবার তাদের কেউ ছিলেন না। 

অন্যদিকে নগরবাসীর কাছে ব্যক্তি আইভী ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও তার প্রতীক প্রশ্নবিদ্ধ। তাই বলাবলি আছে আইভীকে পছন্দ করলেও তাদের অনেকের ভোট নৌকায় পড়বে না। তাছাড়া নির্বাচনটিকে কেউ কেউ আইভী ও তৈমূরের লড়াই হিসেবে দেখছে না। তারা দেখছেন নৌকা ভার্সাস এন্টি নৌকা। তার মানে আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি আওয়ামী।

অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমূর আলম বিএনপি ঘরোনার প্রার্থী হলেও সে নিজেকে জনতার প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে অনেকটা সক্ষম হয়েছেন। কারণ তার দল তাকে দুটি বড় পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে দলের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। ফলে তিনি দাবি করেছেন সব দলের ভোট তিনি পাবেন। 

এছাড়া এস এম আকরামও তৈমূরের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। তিনি সরাসরি তৈমূর আলম খন্দকারের প্রচারণায় নেমেছেন। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আহ্বায়ক এস এম আকরামকে তৈমূরের প্রচারণায় দেখে উজ্জীবিত তৈমূর শিবির। অপরদিকে আকরামের বিষয়টিকে প্রচারণার শেষ সময়ে ভোটের মাঠে ‘চমক’ হিসেবে দেখছেন নগরবাসী। 

কারণ ২০১১ সালে এস এম আকরাম সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন। ওই সময় পুরো আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নেন তিনি। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আইভীর পক্ষে মাঠে নামেন সর্বশক্তি নিয়ে এবং আইভীকে বিজয়ী করে একদিনে মাথায় ৩১ ডিসেম্বর নাটকীয়ভাবে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এস এম আকরাম। 

এরপর দীর্ঘদিন রাজনীতির আড়ালে থাকলেও বিগত ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে নাগরিক ঐক্য থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচনে অংশ নেন এস এম আকরাম। সেই নির্বাচনে প্রায় ৫২ হাজার ভোট পান তিনি। বতর্মানে তিনি নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা। এছাড়াও তৈমূরের পক্ষে নেমেছেন বন্দরের বিভিন্ন ইউনিয়নের জাতীয় পাটি সমর্থিত চেয়ারম্যানরা। ফলে তৈমূরের ভোটের পাল্লা ভারী হচ্ছে। 

তৈমূর বিএনপির লোক হলেও তার মার্কা যেহেতু ধানের শীষ না, সেহেতু এন্টি আওয়ামী লীগের সকল ভোট তার হাতী মার্কার ঝুলিতে যাওয়াটা স্বভাবিক বলেই মনে করা হচ্ছে। এমনটা চাউর হচ্ছে নগরীতে। তবে আইভী শুক্রবারও জোর দিয়ে বলেছেন তার বিজয় নিশ্চিত। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি শঙ্কার কথাও বলেছেন। 

শুক্রবার তার বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, নৌকাকে পরাজিত করতে দলের ভেতর ও বাইরের সব পক্ষ মিলে গেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও প্রচারণায় এসে ঘোষণা দিয়েছেন আইভী লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করবে। 

তবে নগরবাসীর মতে, গত ১০ বছরে নগরবাসীর চাওয়া এবং প্রাপ্তির মধ্যে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। যা এবারের নির্বাচনি মাঠে আলোচিত হচ্ছে। প্রচারণার শেষ সময়ে ভোটাররা হিসাবের খাতা খুলে বসেছেন। এছাড়াও রয়েছে ব্যক্তি আইভী না নৌকার আইভী কোনটা বেশি জনপ্রিয়। এ নিয়েও আলোচনা আছে।

নাগরিকরা বলছেন, দায়িত্ব পালনের দুই মেয়াদে প্রতিশ্রুতির বড় বড় কাজগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে ২০১১ সালে তার নির্বাচনি ইশতেহারের উল্লেখ্যযোগ্য নারায়ণগঞ্জে একটি অত্যাধুনিক মেডিকেল কলেজ, পূর্ণাঙ্গ একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শীতলক্ষ্যা নদীকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা, পুরো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দরে আধুনিক পার্ক নির্মাণ যা ২০২১ সালেও আলোর মুখ দেখেনি। 

২০১৬ সালে আইভীর নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে কার্বনমুক্ত, পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা, নতুন বাস টার্মিনাল, ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণসহ সিটি সার্ভিস চালু, শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ এগুলোর কিছুরই বাস্তবায়ন হয়নি। 

এছাড়া দীর্ঘ ১০ বছরে চালু হয়নি সিটি সার্ভিস ও আধুনিক গণপরিবহন, শহরের নিত্যদিনের যানজট নিরসনে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। মাদক নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে ছিল না কোনো পদক্ষেপ। নগরীর সকল সড়কে স্থাপন হয়নি এলইডি লাইট। যদিও ২০১৬ সালের নির্বাচনে নিজের ইশতেহারে নগরের উন্নয়নে ২১টি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন আইভী। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ১৬টি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল পাঁচটি। 

নির্বাচনি প্রচারণার সময় আইভী দাবি করেছেন, ওই ইশতেহারের ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করেছেন তিনি। মাত্র ১০ ভাগ কাজ বাকি। তবে আইভীর প্রধান প্রতিপ্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের অনুসারীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলেন, বাস টার্মিনাল, ট্রাক টার্মিনাল, সিটি সার্ভিস, ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ এবং শীতলক্ষ্যা দূষণমুক্ত করতে তেমন কোনো ভূমিকাই রাখেননি আইভী।  ৯০ ভাগ ইশতেহার বাস্তবায়নের দাবিও ঠিক নয়। 

নগরবাসীর মতে, রাস্তা-ঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন আইভী। কিন্তু দৃশ্যমান দুটি মেগা প্রজেক্টের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। এর একটি নগরীর ১৬ নাম্বার ওয়ার্ডে শেখ রাসেল নগর পার্ক ও সিদ্ধিরগঞ্জ অংশে ডিএনডি খালকে লেকে রূপান্তরিত করে দুইপাড় বাধাই করে বিনোদন কেন্দ্রের উপযোগী করা। যদিও এই দুটি প্রকল্প নিয়ে রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের আপত্তি রয়েছে। 

এদিকে নগরীতে চলমান কিছু প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা অবশ্য নগরবাসীর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার ও মিলনায়তন নির্মাণ করতে গিয়ে এর সামনে থাকা ফুটপাত দখল করা হয়েছে মিলনায়তনের জন্য। এখন আর চুনকা পাঠাগার ও মিলনায়তনের সামনে সরকারি কোনো ফুটপাত চোখে পড়ে না। সুরম্য এই পাঠাগারে গাড়ি পার্কিংয়েরও কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এ কারণে এখানে আগতদের সঙ্গে নিজস্ব গাড়ি বা মোটরসাইকেল থাকলে বিপাকে পড়তে হয়। নগরের মণ্ডলপাড়া ব্রিজ এবং বাবুরাইল খাল খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। 

এতে করে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। বিশেষ করে নগরের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নির্মাণাধীন ব্রিজটির কারণে প্রতিনিয়ত যানজটে পড়ে নাকাল হচ্ছেন। মণ্ডলপাড়া ব্রিজের পাশের চা দোকানি আবদুর রহমান বলেন, ‘তিন বছর ধরে ব্রিজ নির্মাণকাজ চলছে। কিন্তু শেষ হচ্ছে না। এতে করে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। সেই সঙ্গে ধুলাবালিতে ব্যবসা করা দায়। ব্রিজের কাজ শেষ হলে এই এলাকার মানুষের ভোগান্তি কমতো।’ 

নগরের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হওয়ায় এই নগরীতে তেমন কোনো কাজ নেই বললেই চলে। তবে অতিরিক্ত করের বোঝা এই নগরীর বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সেই সঙ্গে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হওয়ার নজিরও রয়েছে। সবচেয়ে যে বিষয়টি নগরবাসীর মুখে মুখে তা হলো— মহামারি করোনার সময় সিটি কর্পোরেশনের কোনো ভূমিকাই ছিল না নগরবাসীর পক্ষে। এক ছটাক চাল নিয়েও সিটি কর্পোরেশন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। 

সিটি কর্পোরেশনের তহবিল থেকে সাহায্য তো পায়নি বরং এক নাগরিক উল্টো অপমানিত হয়েছে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ফোন করে। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পাঠানো খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে বাহবা নেয়ার চেষ্টা করেও সমালোচিত সিটি কর্পোরেশন। হাত-পা গুটিয়ে ঘরবন্দি ছিলেন মেয়র নিজেও।

অন্যদিকে ট্যাক্স বাড়ানোর ঘটনায় আইভীকে ঘায়েল করে প্রচারণা চালিয়েছেন তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি বলেন, মোট ২২ শতাংশ ট্যাক্সের মধ্যে জমি ও ইমারতের ওপর ৭ শতাংশ, সড়ক বাতির ওপর ৫ শতাংশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৭ শতাংশ এবং পানি সরবরাহের জন্য ৫ শতাংশ। করোনার মহামারিতে তিনি ট্যাক্স কমাননি। বরং বাড়িয়েছেন। নগরবাসী এর বড় প্রমাণ। তবে ডা. আইভী বরাবরই দাবি করেছেন তিনি ট্যাক্স বাড়াননি। এটা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা। স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী তৈমূর 

আলম খন্দকার বলেছেন,  মানুষের ওপর যত অত্যাচার হয় ভোটাররা তত ঐক্যবদ্ধ হয়। লক্ষাধিক ভোটে পাস করবো। মরে গেলেও মাঠ ছাড়বো না। প্রশাসনকে বলব, জনগণের সেবা করা আপনাদের দায়িত্ব। বহুবার রিকোয়েস্ট করেছি, এখন বিবেকের কাছে ছেড়ে দিলাম। আগামীকালের (আজকের) ভোট যাই হোক, আমরা মাঠে থাকবো। গ্রেপ্তার হলে হবো কিন্তু নির্বাচন চালিয়ে যাবো। 

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীর ডিজিটাল আইনের মামলা থেকে সাংবাদিকরাও রেহাই পায়নি। এখনো সেই মামলায় তারা জেল খাটছে। ছাত্রলীগের ছেলে সুজন তার মামলা মাথায় নিয়ে মারা গেছে। 

অভিযোগ তুলে বলেন, নানক সাহেব ১২ ও ১৩নং ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। তবে আমি কোনো ভোট কেন্দ্র নিয়ে শঙ্কিত নই। আমি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি পুলিশ প্রশাসনের নীরব আচারণকে। আমার পোলিং এজেন্টের কাগজ চলে গেছে, ইনশাআল্লাহ প্রতিটি কেন্দ্রেই আমার পোলিং এজেন্ট থাকবে।