Amar Sangbad
ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ফিরে আসুক সেই হারানো দিন

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান

জানুয়ারি ১৭, ২০২২, ১২:৩০ পিএম


ফিরে আসুক সেই হারানো দিন

বই মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা পাশবিকতাকে দূর করে মনুষ্যত্বের শিক্ষায় উজ্জীবিত করে। যদি সে বইটি বলতে পারে হৃদয়ের কথা, তাহলে সে বই মানুষের ঘুমন্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয় সমস্ত গ্লানি। তাই যুগে যুগে মানুষ বইকে বন্ধু করে নিয়েছে। প্রিয়জনকে শ্রেষ্ঠ উপহার বই তুলে দিয়েছে। যদি এই বইটি গুণে-মানে অনন্য হয়ে থাকে, তাহলে যে আনন্দের সীমা নেই। কী আজব এই বই! ধরুন, কাউকে একটি হীরের আংটি উপহার দেওয়া হলো আর সেই আংটিটি হারিয়ে গেল, তখন ঐ ব্যক্তির আফসোস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। হীরের আংটি তার জন্য এমন কিছু রেখে যেতে পারেনি যে স্মৃতি নিয়ে সে সস্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বই হারিয়ে গেলেও তার শিক্ষা হারিয়ে যায় না। মানুষের জন্য রেখে যায়। তার দীপ্ত শিখা লোক থেকে লোকান্তরে ছড়িয়ে দেয়। যা একটি রুগ্ন সমাজকেও আশার আলো দেখাতে পারে। এ কারণে যে সমাজে শিক্ষা থাকে, জ্ঞানের আলো থাকে, তারা কখনো গরিব হয় না।

ক্রমশ আমাদের সমাজব্যবস্থা বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা যদি চিন্তা ও কর্মে পরিবর্তন আনতে পারি সমাজটাও ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে। পালাবদলের এই সুর মানুষের ভিতর থেকে জাগিয়ে তুলতে পারলে প্রকৃত সফলতা আসবে। মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষের অর্থবিত্তের চেয়ে মনুষ্যত্বের দাম অনেক। সভ্য সমাজের এটিই একটি আদর্শ মানদ-। এই কাঙ্খিত মান অর্জন করতে পারলে অর্থবিত্তের মিথ্যে দম্ভ ভাঙ্গতে শুরু করবে। বদলে যাবে সমাজ। যদি এর উল্টো হয়, শিক্ষিত মানুষের কদর কমে যায়, অক্ষরজ্ঞানসম্পন্নদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়, মূর্খ সমাজের নেতা হয়ে বসে দুর্ভাগ্য জাতির। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ রুদ্ধ হয়ে আসবে। একদিন জ্ঞানহীনদের দখলে সমাজের কর্তৃত্ব চলে যাবে। জ্ঞানের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু নেই। যে শক্তির উৎসই হচ্ছে বই। একটি উন্নত জাতি গঠনে বই-ই হতে পারে প্রধান সহায়ক। আজ বিশে^র কর্তৃত্ব তাদের হাতেই যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে। যাদের গবেষণা উন্নত।  

এক সময় উপহার হিসেবে বেছে নেওয়া হতো। মুসলমানদের বিয়ের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় বই একটি বড় উপহার ছিল। অন্যান্য উপহারের সাথেও শোভা পেত মূল্যবান বই। সেই ঐতিহ্য যেন আর নেই। এখন কেউ আর বিয়ের অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে বই নিয়ে যায় না। এর চেয়ে অন্যান্য উপহারকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফিরে আসুক, সেই হারানো দিন। বই হয়ে উঠুক আমাদের ভালোবাসার স্পন্দন। হাতে হাতে উপহার হিসেবে উঠে আসুক বই। এই পৃথিবী শুধু আমাদের বসবাসের জন্য নয়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটিকে বাসযোগ্য করে রেখে যেতে হবে।  

অবাক হতে হয় এসব দেখে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোও  উপহার হিসেবে বই দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো বহু আগে থেকেই বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে এ রেওয়াজ চালু করে বসেছে। এমনকি শোনা যায় , কোথাও কোথাও মিলাদ মাহফিলেও এই ধারা চালু হয়েছে। শিক্ষিতজনের বিবেক আজকে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্য বলতে, আজকাল অনেকেই বই পড়তে অভ্যস্ত নয়। খুব কম মানুষই নিয়মিত বই পড়ে। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নিয়মিত স্টাডি করলেও এর নিচের স্তরগুলোর চিত্র অনেকটাই হতাশাজনক। 

তরুণ প্রজন্ম ক্রমশই বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের খেয়ে ফেলছে। তাদের এই বই বিমুখতার রাস্তাটি যদি আরো সহজ করা হয়, তাহলে এর দায় কখনোই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এড়াতে পারে না। সদিচ্ছা থাকলেই শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে রোধ করা সম্ভব। 

লেখক : সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক 

আমার সংবাদ/আরএইচ