নাব্য রক্ষায় নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

দখল ও দূষণে মরছে নদী

বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে গেছে ছোট-বড় প্রায় ৭০০ নদী। এর প্রকৃতি, চাষাবাদ, জনজীবন— সবকিছু নদীনির্ভর। এ কারণে বলা হয় ‘নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নদী বেঁচে থাকছে না। খননের অভাবে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

দখল ও দূষণের কারণে একের পর এক নদী মরে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ আদালত থেকে বারবার নির্দেশ দেয়ার পরও অতীতে নদীরক্ষায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। গত এক দশকে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। 

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে জানান, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন সব জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা করেছে। সারা দেশে ৬৫ হাজার ১২৭ জন অবৈধ নদী দখলদার রয়েছে। নদীগুলো দখলমুক্ত করতে ২০১০ সাল থেকে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। 

এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৮৭৪ জন দখলদারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখনো প্রায় ৪৫ হাজার অবৈধ দখলদার রয়েছে, যাদের উচ্ছেদ করা যায়নি।নদী দখলমুক্ত করা নিয়ে অতীতে এক ধরনের ‘চোর-পুলিশ খেলা’ দেখা গেছে। এক দিক দিয়ে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়, আরেক দিক দিয়ে ফের দখল শুরু হয়ে যায়। সাধারণত এই দখল-উচ্ছেদের খেলা বেশি হয় শহরাঞ্চলে বা এর আশপাশে থাকা নদীগুলোতে। 

২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ঢাকার চারপাশে থাকা চারটি নদীকে দখলমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ১২ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। যার মধ্যে ছিলো সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) রেকর্ড অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ, পাকা খুঁটি (পিলার) স্থাপন, নদীর সীমানার মধ্যে থাকা স্থাপনা উচ্ছেদসহ মাটি, বালু, ভাঙা ইট-সুরকি (গার্বেজ) অপসারণ, নদীগুলোকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা, নদীর উভয় তীরে হাঁটার পথ নির্মাণ ও গাছ লাগানো, নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় খননকাজ করা ইত্যাদি। 

গত এক যুগে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়েছে অতি সামান্য। প্রতিমন্ত্রীর প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার পার্শ্ববর্তী চারটি নদীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথের দুই তীরে অবস্থিত ২২০ কিলোমিটার তীরভূমিতে প্রথম পর্যায়ে ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে এবং দুটি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে এটি স্পষ্ট যে, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় গত এক যুগে নদী রক্ষায় কাজ হয়েছে অনেক বেশি। তারপরও প্রয়োজনের তুলনায় তা অতিনগণ্য। তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে আমাদের হাতে নদী খননের মতো কোনো ড্রেজার ছিলো না। বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রথম চারটি ড্রেজার আনে। 

এরপর শেখ হাসিনার সরকার পুনরায় ৩৮টি ড্রেজার এবং ১৬৮টি ড্রেজার-সহায়ক জলযান সংগ্রহ করেছে। আরো ৩৫টি ড্রেজার সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। দরকার আরো বেশি। এসব দিয়ে নদী খননের কাজ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে নদী দখলমুক্ত করার পাশাপাশি সরকার নদীর নাব্য রক্ষার উদ্যোগ আরো জোরদার করবে— এটাই প্রত্যাশা।