Amar Sangbad
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০২২, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

পাসপোর্ট বৃত্তান্ত ও বাস্তবতা

এম. রনি ইসলাম

নভেম্বর ১৪, ২০২১, ০৬:১৫ পিএম


 পাসপোর্ট বৃত্তান্ত ও বাস্তবতা

বুক অফ নেহেমিয়া থেকে জানা যায়, পারস্যের রাজা  আরটাজেরেস ‘জুডিয়ার’ ভেতর দিয়ে নিরাপদে চলাচলের অনুমতি দিয়ে তাঁর এক সরকারি কর্মকর্তাকে চিঠি লিখেছিলেন যেটাকে ইতিহাসে প্রথম পাসপোর্ট হিসেবে বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ১৫৪০ সালে ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম হেনরি বিদেশীদের সনাক্ত করার জন্য ভ্রমণ তথ্য হিসেবে পাসপোর্টের ধারণার প্রবর্তন করে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে(প্রাইভেসি কাউন্সিল অব ইংল্যান্ড) পাসপোর্ট ইস্যু সংক্রান্ত একটি আইন পাস করে। ১৭৯৪ সালে ইংল্যান্ডে ক্যাবিনেট মিনিস্টারসহ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বতন্ত্র পাসপোর্ট ইস্যুর প্রচলন হয়। 

শুরুতে পাসপোর্টে কেবল হাতে লেখা তথ্য সংযোজিত ছিলো, এবং তাতে কোন ছবি ছিলো না। ফলশ্রুতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সম-সাময়িক পরিস্থিতিতে এক জার্মান গুপ্তচর জাল আমেরিকান পাসপোর্ট নিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশ করেন। এটা নিয়ে তখন বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তাই সমস্যা এড়াতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই পাসপোর্টে ছবি সংযুক্ত করার প্রথা চালু হয়। প্রথম দিকে পাসপোর্টে যেকোন ধরনের ছবি ব্যবহার করা যেত, এমনকি পারিবারিক ছবির ব্যবহারও দেখা গেছে।

 এতেও নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। তাই বর্তমানে কানসহ মুখমন্ডল স্পষ্টভাবে দেখা যায় এমন ছবি, দুই হাতের আঙ্গুলের ছাপ এবং চোখের আইরিসের ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘কনফারেন্স অন পাসপোর্ট অ্যান্ড কাস্টমস ফ্যামিলিয়ারিটিজ থ্র টিকিট’ লীগ অব নেশন্স বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে আধুনিক পাসপোর্টের ধারণা শুরু হয়। 

ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের হাত ধরে ১৯৮০ সালে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের(এমআরপি) ধারণা আসে। ত্রিশ বছর পর ২০১০ সালে বাংলাদেশেও তা চালু হয়। যদিও এর পূর্বেই অর্থাৎ ২০০৮ সাল হতে উন্নত দেশগুলোতে ই-পাসপোর্ট এর প্রচলন শুরু হয়েছে, সেই পরিক্রমায় ২২ জানুয়ারি, ২০২০ এ বাংলাদেশও ই-পাসপোর্টের যুগে প্রবেশ করে।

বিশ্বায়নের এ যুগে নানা প্রয়োজনেই আমাদেরকে দেশের বাইরে যেতে হয়। কখনো চাকরি বা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে আবার কখনোবা চিকিৎসা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাত্রা করতে হয়। আর এ যাত্রা করতে চাইলেই সবার আগে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটি সামনে আসে তা হলো পাসপোর্ট।

পৃথিবীর যেকোন দেশে বৈধভাবে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে পাসপোর্টের প্রয়োজন। আবার রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিরও সবচেয়ে বড় দলিল এটি। দেশের নাগরিক হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র অন্যতম প্রমাণপত্র হলেও দেশের সীমা পেরোলেই এ পরিচয়পত্র প্রায় অচল, কেবল পাসপোর্টই সেই ব্যাক্তির নাগরিকত্ব প্রমাণ করে। 

তাই, নাগরিকদের বিদেশ যাতায়াতে সহায়তা প্রদানের জন্য ১৯৬২ সালে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে একটি পরিদপ্তর হিসেবে জোনাল কার্যালয়, ঢাকা এবং আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা নিয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে ছয়টি কার্যালয়ের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গরুপে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এর কার্যক্রম শুরু করে। 

২০১০ সালে উনিশটি, ২০১১ সালে আরও তেত্রিশটি নতুন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস স্থাপনসহ ভিসা সেল, ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া বিশ্বের ৭৩টি বাংলাদেশী মিশনে এমআরপি ও এমআরভি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩,১২,৬০,২১২ টি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এম.আর.পি) ও ১৬,৩১,০০৮ টি মেশিন রিডেবল ভিসা (এম.আর.ভি) সফলভাবে মুদ্রণ করা হয়েছে। (সূত্রঃ ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর) অতীব প্রয়োজনীয় এ পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয় প্রয়োজনের তাগিদেই। 

কিন্তু পাসপোর্ট অফিসের শরণাপন্ন হলেই এ প্রয়োজন বিরক্তিতে অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সেবাখাতের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাসপোর্ট অফিস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবাখাত। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট অফিসের সেবা পাওয়া আমাদের নাগরিক অধিকার। কিন্তু নাগরিক অধিকার তো দূরের কথা রীতিমতো একটি অব্যবস্থাপনা, ঘুষ আর দালালদের কারখানায় পরিণত হয়েছে আমাদের পাসপোর্ট অফিসগুলো। ভোগান্তির চরম এক জায়গার নাম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।

টিআইবির জরিপ মতে- প্রকাশিত ১৬টি সরকারি সেবা খাতের জরিপ ফলাফল অনুযায়ী সবক্ষেত্রেই কম-বেশি দুর্নীতি হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে শীর্ষ সাতটি সেবা খাতের; বাঁকি পাঁচটি হলো পাসপোর্ট, বিচারিক সেবা, ভূমি সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। পূর্বে পিডিএফ ফরম প্রিন্ট করে হাতে লিখে পূরণ করে তা পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে হতো। আর এ জমা দিতেই হয়রানির শিকার হতে হতো সাধারণ নাগরিকদের। হাতে পুরণকৃত পাসপোর্ট ফরমটি নানাভাবে ভুল বের করে তা বার বার ফেরত পাঠানো হতো। 

অথচ সেই ভুল বের করা ফরমটিই যখন দালালদের মাধ্যমে জমা দেওয়া হতো, টাকার মাধ্যমে ভুল করা ফরমটি নিমিষেই শুদ্ধ হয়ে যেত। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, হাতে পূরণকৃত পাসপোর্ট ফরমের একশোটির মধ্যে প্রায় পঁচানব্বইটিই নানা অজুহাত দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হতো। তাই হাতে পূরণের এই ঝামেলা থেকে মুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন জমা নেওয়ার জোর দাবি উঠে। বেহাল অবস্থা অনুভব করে কর্তৃপক্ষ অনলাইনে আবেদন জমা নেওয়া শুরু করে। সবাই আশান্বিত হয়েছিলেন, এইবার বুঝি ঝক্কি-ঝামেলা কমলো। কিন্তু আশায় গুঁড়োবালি থেকেই গেল, বাস্তবতায় দেখা যায় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

বরং কিছু কিছু জায়গায় আগের চেয়েও বেশি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। হাতে ফরম পূরণের সময় নির্দিষ্ট কোন জায়গায় ভুল হলে সাথে সাথেই নতুন ফরমে তা সংশোধন করা যেত কিন্তু অনলাইন আবেদনের কোন জায়গায় ভুল হলে বা পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা অখুশি হয়ে ভুল বের করলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে গিয়ে সেই ভুল সংশোধন করতে হয়। এই সংশোধনের প্রচেষ্টায় কেউ কেউ সফল হলেও বেশীর ভাগের পক্ষেই তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। 

আর তখনই শুরু হয় দালালদের দৌরাত্ম্য। এসব দালালের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা থেকে প্রধান কার্যালায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ পর্যন্ত। এভাবে দেশের উনসত্তরটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে কর্মকর্তাদের নামে প্রতি মাসে অন্তত ১২ কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে। শুধু তাই-ই নয়, ঘুষের এ টাকা বিভিন্ন হারে ভাগ হয়ে যথাসময়ে পৌঁছে যাচ্ছে প্রধান কার্যালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের পকেটেও।

দালাল ও টাকার মাধ্যমে কোন রকমে অফিস পর্বের প্রাথমিক কাজ শেষ হলেই যে সোনার হরিণ পাসপোর্ট হাতে এসে পৌছাবে বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। এবার অপেক্ষা পুলিশ ভেরিফিকেশনের। আবেদনকারীর তথ্য যাচাইয়ের জন্য পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (বিশেষ শাখা) কার্যালয়ে আর জেলা পর্যায় হলে পাঠানো হয় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। সেখান থেকে একজন উপ-সহকারী পরিদর্শক(এএসআই), সহকারী পরিদর্শক(এসআই) কিংবা ইন্সপেক্টরকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

তাদের উপর অর্পিত এই কাজটি পুলিশি চাকুরীর অংশ হলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেবাপ্রার্থীকে অতিরিক্ত সেবা দেওয়া হচ্ছে এই মর্মে চা-মিষ্টি, মোটর বাইকের তেল খরচের নাম করে অর্থ দাবী করা একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন এমন মানুষের তিন-চতুর্থাংশকেই পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হয়ে ‘ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূত টাকা’ দিতে হয়। এমন অনিয়মের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং টিআইবিসহ অনেক সংস্থা পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেবার প্রস্তাব করেছিল।

২০১৬ সালে একজন বিচারপতির দুই মেয়ের পাসপোর্টের ভেরিফিকেশনের জন্য বাসায় গিয়ে বিচারপতির স্ত্রীর কাছে দুই হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন এএসআই। তার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেন সেই বিচারপতি। পরে আদালতে তোলা হলে ঐ এএসআইকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পুলিশ মহাপরিদর্শককে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশও দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিচারপতি না হয় পুলিশকে-পুলিশে দিয়েছেন, অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করেছেন কিন্তু সাধারণ জনগণ কী করবে!

উপর্যুক্ত সমস্যাবলীর পাশাপাশি কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে পাসপোর্ট সেবাখাতে। প্রায় ১৭ কোটি জনগণের দেশে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান জনবল মাত্র ১১৮৪ জন। দক্ষ লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে এই সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি  পাসপোর্ট প্রিন্টিং এ গতি বাড়ানো প্রয়োজন। কোথাও তথ্যগত কোন ভুল থাকলে উপযুক্ত প্রমাণ-যাচাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত সংশোধন নিশ্চিত করা দরকার। ই-পাসপোর্ট এর জন্য বিমানবন্দরে আলাদা গেট চালুও একান্ত আবশ্যক। ৬৫ বছরের উর্দ্ধবয়স্ক নাগরিকদের ই-পাসপোর্টের মেয়াদ ১০ বছর করার(বর্তমানে ৫ বছর) ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বয়স্কদের নাগরিক সেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোগান্তিও কমে আসবে। প্রয়োজনে পাসপোর্ট সংক্রান্ত আইন-বিধিতে যুগোপযোগী সংশোধন আনা যেতে পারে। 

এছাড়াও বিশ্বের সর্বোত্তম সুরক্ষিত ই-পাসপোর্টে ৮৯টি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশী ই-পাসপোর্টে মাত্র ৩৮টি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যুক্ত আছে, এর উন্নয়নে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন; বিশ্বের শক্তিশালী ১১৬ পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশে ১০৮তম অবস্থানে অর্থ্যাৎ শেষ দিক থেকে নবম স্থানে, এই অবনয়ন ঠেকাতে হবে। সর্বোপরি, নির্ধারিত সময়ের মাঝেই পাসপোর্ট বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের সেবাখাতের সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব খাতের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আর ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়ম দূরীকরণে প্রয়োজন সরকারের উচ্চ মহলের সুদৃষ্টি। 

লেখক :  শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।