বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর কর্নেল শওকত আলী

বঙ্গবন্ধুর উপর ছিলো কর্নেল শওকত আলীর গভীর আস্থা ও বিশ্বাস। অবহেলিত-নির্যাতিত বাঙালির মুক্তির মহানায়ক যে একমাত্র বঙ্গবন্ধু, তা কর্নেল শওকত আলী ষাটের দশকের প্রায়ম্ভেই বুঝতে পেরেছিলেন। কারণ শত সহস্রবছর বাঙালি শুধু শাসিত ও শোষিত হয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙালির বন্দিদশা থেকে মুক্তির কথা ভেবেছেন ও স্বতন্ত্রপরিচয় উন্মোচন করেছেন।

কর্নেল শওকত আলী সামরিক বাহিনীতে প্রবেশের পর পরই স্বচক্ষে দেখতে পান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে সব দিক দিয়ে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতদিন বঙ্গবন্ধুর মুখে শুধু শুনেছেন। আর এখন নিজ চোখে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শওকত সাহেব বাঙালির এই বৈষম্যের কথা সব সময় ভাবতেন। 

তিনি তাঁর লেখা বই ‘সত্য মামলা আগরতলা’তে বলেছেন- ‘এটা কোন পাকিস্তান এবং আমার দেশ ‘বাংলাদেশ’ কোন পাকিস্তান? পাকিস্তানের দুই অংশে এত বৈষম্য কেন? দুই অংশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার এত পার্থক্য কেন? দুই অংশের এক অংশ অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভূত্ব কেন্দ্রীভূত কেন? পূর্বপাকিস্তানের লোকসংখ্যা বেশি হলেও পাকিস্তানের রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানে কেন’? ষাটের দশকে সামরিক শাসনের সেই দুঃসময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের কথা কল্পনা করা ছিলো রীতিমত দুঃস্বপ্ন। 

বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করলেন তখন স্বাধীন বাংলাদেশের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন দেখে শওকত সাহেবের মনেও দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বাঙালিকে উপহার দিতে পারবেন। কর্নেল শওকত তাঁর ‘সত্য মামলা আগরতলা’তে আরো বলেছেন ‘একমাত্র মুজিব ভাই-ই পারবেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে। তিনি বাঙালি জাতির আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে আমার চিন্তায় দৃশ্যমান হয়েছিলেন’। কর্নেল শওকত দূরদৃষ্টিসম্পন্নসামরিক অফিসার ছিলেন। তাঁর সব সময় চিন্তা চেতনা ছিলো বৈষম্য থেকে বাঙালির মুক্তি। তাঁর প্রত্যাশা ছিলো- বাঙালি এমএনএ-গণ বাঙালিদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার একটা সুরহা করবেন। 

কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি গোটা বাঙালি জাতি, বিশেষ করে সশস্ত্রবাহিনীর বাঙালিদের সব আশা-ভরসা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ তারা ঘটাতে পারেননি, কারণ বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমানের মত নেতা তখনকার জাতীয় পরিষদে ছিলেন না। যাঁরা ছিলেন, তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিষয়টিকে একটি ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে পারেননি। 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইস্যু সৃষ্টির জন্য বাঙালি জাতিকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্তঅপেক্ষা করতে হয়েছিল, যখন বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন এবং বাঙালি জাতি স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছিল। বঙ্গবন্ধু বাঙাুলির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা দিলে শওকত সাহেবের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধুঅন্তরালে এক দফা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ শুধুস্বপ্ননয়, এক বাস্তবতা। আর তা হতে চলেছে বঙ্গবন্ধুর সুকৌশল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণেই। যার ফলাফল অতি দ্রুতই দৃশ্যমান হতে থাকে।

বাঙালিদের অনেকে এখনো এই বিশ্বাস নিয়ে আছে যে, আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলা একটি মিথ্যা মামলা ছিলো। কিন্তুনা, এই মামলাটি ছিল একটি সত্য মামলা। এই বিষয়টি কর্নেল শওকত আলী তাঁর ‘সত্য মামলা আগরতলা’তে স্পষ্ট করেছেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালির শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সাথে সাথে কর্নেল শওকত আলীসহ পাকিস্তানের বিভিন্নবাহিনীতে কর্মরত বিভিন্নবাঙালি অফিসাররা গোপনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সামরিক কায়দায় বাঙালিকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদেখেছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিলো, একটি নির্দিষ্ট রাতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা বাঙালিরা বিভিন্নগ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের সবকটি ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের অস্ত্র কেড়ে নেয়া হবে, তাদের বন্দী করা হবে এবং বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেবাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে। (সূত্রঃ ‘সত্য মামলা আগরতলা’ বইয়ের ‘ভূমিকা’, লেখককর্নেল শওকত আলী) উল্লেখ্য, মামলাটির রাষ্ট্রীয় নাম ছিলো ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য’।

 কিন্তুতৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রচারযন্ত্রে মামলাটির শিরোনাম বিকৃত করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলা’ বলে প্রচার করা হয়। ফলে এখনো পত্র পত্রিকায় মামলাটি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলা’ হিসেবে মুদ্রিত ও প্রচারিত হয়ে থাকে। আজও মামলাটির প্রসঙ্গ এলে প্রায় সবাই ‘আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলা’ বলে থাকেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কর্নেল শওকত আলীসহ যাঁরা মামলাটিতে অভিযুক্ত ছিলেন,‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি তাঁদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। কারণ তাঁরা ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন না। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্রপন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে শওকত আলীরা বঙ্গবন্ধুর পরামর্শনিয়ে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেছিলেন। 

তবে একথা ঠিক, তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কৌশলগত কারণে বঙ্গবন্ধুসহ সবাই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিজেদের নির্দোষ বলে দাবী করেছিলেন। বাঙালি জাতিও মামলাটিকে মিথ্যা মামলা হিসেবে অভিহিত করে তা প্রত্যাহারের দাবী তুলেছিল। তা ছিলো ১৯৬৮-৬৯ সালের কথা। আইয়ুব খান হয়তো ভেবেছিলেন- মামলার নামের সাথে আগরতলা শব্দটি যুক্ত করলে বঙ্গববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য অভিযুক্তকে ভারতীয় এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করতে সুবিধা হবে এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটবে। 

সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়- অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভারত সরকারের সঙ্গে ষড়যন্ত্রেলিপ্ত। অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়- ভারত সরকার কর্তৃক সরবরাহ করা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অর্থদিয়ে বলপ্রয়োগ এবং সশস্ত্রবিদ্রোহের মাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে পূর্বপাকিস্তানের ওপর পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বথেকে পাকিস্তানকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে। আইয়ুব খানের পরিকল্পনার অবশ্য বিপরীত ফল হয়। প্রকৃত পক্ষে এ মামলাই পরবর্তীকালে তাঁর পতন ডেকে আনে।

আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলার ৩৫ জন আসামির মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ অনেকে ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি। কিন্তুতাদের সবাইকে সামরিক হেফাজতে বন্দী রাখা ছিলো প্রচলিত আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। কেননা প্রচলিত আইনে বেসামরিক ব্যক্তিদের সামরিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে রাখার বিধান ছিলো না। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলা’র আসামী তথা বন্দীদের নির্যাতন ছিলো অবর্ণনীয়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনারারি ক্যাপ্টেন খুরশীদ মিয়া দৈহিক নির্যাতনের ফলে পঙ্গুহয়ে গিয়েছিলেন। কর্নেল শওকত সাহেবের উপরও অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়। আজীবন নিজের কষ্ট নিজের কাছে রেখেছিলেন।

 না বলার কারণও বলেছেন তাঁর ‘সত্য মামলা আগরতলা’ বইতে, “জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে আমার ওপর যে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে লাখ লাখ বাঙালি পুরুষ-মহিলা ও শিশুর ওপর পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছিল, সে তুলনায় আমার ওপর চালানো নির্যাতন ছিলো অপেক্ষাকৃত কম”। (সূত্রঃ ‘সত্য মামলা আগরতলা’ পৃষ্ঠা-১১৫) আইয়ুব খান সরকার প্রচলিত আইনের সংশোধন করে পশ্চিম পাকিস্তানে বিচারকার্য চালাতে চেয়েছিল। অধিকাংশ সন্দেহভাজন বেসামরিক ব্যক্তিদের সামরিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আনা হয়।

 বঙ্গবন্ধু পরে কর্নেল শওকতকে জানিয়েছিলেন,‘তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটের বাহিরে এসে সামরিক যানে আরোহনের আগ মুহুর্তে ভূমি স্পর্শ করেন এবং তাঁর ধূলো মাখা হাতের আঙ্গুল দিয়ে কপাল স্পর্শকরেন, যেন তিনি বলতে চেয়েছিলেন,‘ওগো বাংলা মা আমার, তোমার মাটিতে যেন আমার কবর হয়’। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন, তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই অমঙ্গল চিন্তার ভিত্তি দৃশ্যমান ছিলো। আইয়ুব খান বিচারকার্য পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পন্নকরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের মুখে তা আর হয়নি। 

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহৃত হলে ২২শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য আসামীদের সাথে কর্নেল শওকত আলী মুক্তিলাভ করেন। কারামুক্তির পরপরই পাকিস্তান সেনা বাহিনী থেকে তাঁকে বাধ্যতামূলক অকাল-অবসর প্রদান করা হয়। কর্নেল শওকত আলী ও জিয়াউর রহমান একই বাহিনীতে চাকরিরত ছিলেন। জিয়াউর রহমানের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কর্নেল শওকত আলী ওয়াকিবহাল ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে সেনাবাহিনীর ভিতর গ্রুপ সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে এমন কোন কাজ নেই যা জিয়া করে নাই। বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর কিছু প্রতিক্রিয়াশীল জুনিয়র অফিসারকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন জিয়া। 

‘কারাগারের ডায়েরী’ তে তিনি বলেছেন,‘ভিতরে ভিতরে সে (জিয়া) গভীর ষড়যন্ত্রেলিপ্ত ছিলো। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃস্টি করার জন্য এবং অপপ্রচার চালানোর জন্য সে বিভিন্নস্তরে কাজ শুরু করে। অফিসারদের মধ্যে কাজ করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে তার প্রতি অনুগত, এমন কিছু অফিসারকে সে নিয়োগ করে। জিয়া যে ঠান্ডা মাথার খুনী ছিলো, বঙ্গবন্ধুহত্যায় মূল কুশীলবের ভূমিকা পালন করে তা শওকত সাহেবের কথা থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সূত্রপাত ছিলো ‘ভাষা আন্দোলন’। 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের রক্তে যখন ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়, তখন বঙ্গবন্ধু জেলে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু জেলখানাতে আমরণ অনশন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুভক্ত কর্নেল শওকত আলী তখন খেপুপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। বাবার ব্যবসার সুবাদে শওকত সাহেব ঐ সময়ে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় অবস্থান করছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে শওকত সাহেব ও তাঁর সহপাঠীরা মিছিল বের করেন। ছাত্রদের সাথে খেপুপাড়ার সাধারণ মানুষও যোগ দিয়েছিলেন। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছিলেন তারা। (‘সত্য মামলা আগরতলা’, পৃষ্ঠা-২০) কর্নেল শওকত আলী লেখক হিসেবেও সমধিক পরিচতি। তাঁর লেখায় একটি বড় অংশ দখল করে আছেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিটি বইয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঘটনাবহুল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যেমন উঠে এসেছে, তেমনি ‘৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চিত্রও উঠে এসেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে (১) সত্য মামলা আগরতলা (২) কারাগারের ডায়েরী (৩) বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ও আমার কিছুকথা (৪) গণপরিষদ থেকে নবম সংসদ (৫) আর্মড কোয়েস্ট ফর ইনডিপেন্ডেন্স (ইংরেজি)। শওকত আলী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। 

বঙ্গবন্ধুর যে কোন নির্দেশনা তিনি অবলীলায় পালন করতেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মাদারীপুর এলাকার কমান্ডার ও পরে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে সাব-সেক্টরের কমান্ডার ও প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি মুজিবনগরস্থ সশস্ত্রবাহিনীর সদর দপ্তরের স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। কর্নেল পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে অর্ডিন্যান্স সার্ভিসেসের পরিচালক থাকাকালে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ২৪ অক্টোবর মোশতাক-জিয়া চক্র তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বাসঘাতকদের স্বরূপ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। অনেকেই খুনী মোশতাক-জিয়া সরকারে শপথ পড়ে মন্ত্রীসভায় যোগদান করে।

 কিন্তু কর্নেল শওকত ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত। তিনি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করে ১৯৭৯ সালে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার শরীয়তপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের হুইপ নির্বাচিত হন। সংসদ সসদ্য নির্বাচিত হওয়ার পর স্বৈরাশাসক জিয়া দমননীতির অংশ হিসেবে তিনটি হত্যা ও অপহরণ মামলা দায়ের করে। 

১৯৮২ সালে সামরিক আইন জারীর পর ১০ মে গ্রেফাতার হন এবং ৮ সেপ্টেম্বও, ১৯৮৩ মুক্তিলাভ করেন। কর্নেল শওকত আলির সমগ্রজীবন ও কর্মপর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে- তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্তসহযোদ্ধা। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সেই উত্তাল দিনগুলোতে সামরিক বাহিনীতে থেকেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশ স্বাধীনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। বাঙালির মুক্তি যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নছিল, সেই স্বপ্ন বান্তবায়নে তিনি ছিলেন বিভোর। বঙ্গবন্ধুই যে তাঁর মহানায়ক, তা তাঁর লেখায় প্রতিটি ছত্রে ছত্রে বলে গেছেন। এই মহান বঙ্গবন্ধুপ্রেমী দেশপ্রেমিকের জন্য অতল শ্রদ্ধা।

লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক, চেয়ারম্যান বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ