Amar Sangbad
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

লাগামহীন প্রগ্রেসিভ লাইফ

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ৯, ২০২২, ০১:৩১ এএম


লাগামহীন প্রগ্রেসিভ লাইফ
  • যথাসময়ে হিসাব শেষ করতে না পারায় এজিএম করতে পারেনি
  • চেয়ারম্যান ও স্ত্রীর বেশি শেয়ার ধারণ
  • বীমাদাবি সঠিকভাবে পরিশোধ করেনি
  • অনেক কোম্পানিরই এমন অনিয়ম রয়েছে  —কোম্পানি সচিব
  • ঈদের পর খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব —আইডিআরএর মুখপাত্র

অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার আবর্ত থেকে বেরুতে পারেনি পুঁজিবাজারভুক্ত বীমা কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটি বীমা সংক্রান্ত বিদ্যমান অধিকাংশ আইনই মানছে না।

পরিচালকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে আইনি জালে আটকে অর্ধ যুগেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা-এজিএম। পরবর্তীতে ২০২০ সালে দ্বন্দ্ব নিরসন করে এজিএম অনুষ্ঠিত হয়েছে বটে কিন্তু ২০২১ সালে এসে ফের ছন্দপতন। 

বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির না করার ব্যর্থতা ফের ভণ্ডুল হয় ২০২১ এজিএম। শুধু আর্থিক প্রতিবেদনই নয়, প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন প্রতিপালনেও একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে।

পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ। ফলে সার্বিক কর্মকাণ্ডে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতার অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি দাবি উত্থাপনকারী গ্রাহকদের একটি বড় অংশকে ২০১৯ সাল থেকেই পরিশোধ করছে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখো গ্রাহক প্রতিদিন টাকার জন্য স্থানীয় কার্যালয়সহ প্রধান কার্যালয়গুলোতেও ধর্ণা দিচ্ছেন।

কিন্তু এসব গ্রাহকদের বেশির ভাগেরই এই প্রচেষ্টা বৃথা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু’-একজন গ্রাহকের দাবি প্রদান করে তা ফলাও করে প্রচার করছে। কিন্তু প্রায় ৯০ ভাগ গ্রাহকই পাচ্ছেন না টাকা।

এমনকি প্রতিষ্ঠানের ইউনিট ও শাখা ব্যবস্থাপকরাও প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করে দিতে পারছেন না গ্রাহকদের দাবির টাকা। ফলে স্থানীয় কর্মকর্তাদেরও পড়তে হচ্ছে হয়রানির শিকার গ্রাহকদের রোষানলে। 

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট সূত্রে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ দাবির সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ৪৫৪টি এবং মৃত্যুদাবির সংখ্যা ১০১টি। এসব দাবির মধ্যে একটিও পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

অপরদিকে ২০২০ এবং ২০২১ সালের বীমাদাবি সম্পর্কিত কোনো তথ্যই দেয়া হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এই দুই বছরে উত্থাপিত দাবি আগের বছরগুলোর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হবে।  

এদিকে বীমা এজেন্ট নিয়োগে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএর) নানামুখী তৎপরতা সত্ত্বেও এ সম্পর্কিত বিধি-বিধান পরিপালন করেনি প্রগ্রেসিভ লাইফ। প্রতিষ্ঠানটির এক তথ্যে দেখা যায়, মাঠকর্মী বা এজেন্ট রয়েছে ৪০ হাজার ৬৮৩ জন।

অথচ এই বিপুল সংখ্যক মাঠকর্মীর ৭০ শতাংশের বেশির নিবন্ধন মেয়াদ শেষ হয়েছে ১০ থেকে ১৫ বছর আগে। বাকি ৩০ শতাংশের কোনো নিবন্ধন করা হয়নি। অথচ নিবন্ধন ছাড়া এজেন্ট নিয়োগ ও কার্যক্রম না চালানোর ব্যপারে আইডিআরএর কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।

গ্রাহক হয়রানি ও নিবন্ধনহীন এজেন্ট কার্যক্রমের পাশাপাশি কোম্পানি পরিচালকদের বিধিবদ্ধ শেয়ার ধারণে ব্যর্থতা বিষয়টিও উঠে এসেছে। মজার বিষয় হলো, পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণে ব্যর্থতা দেখা দিলেও আইন লঙ্ঘন করে এক পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট শেয়ার ধারণ সীমা লঙ্ঘন করে শেয়ার গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে কোম্পানির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। 

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রত্যেক বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে বীমা আইনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যানুযায়ী কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এখন পর্যন্ত ৩৮.৮২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছেন। 

বিধি অনুসারে এখনো ২১.১৮ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। কিন্তু আইন প্রণয়নের প্রায় ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও তা মেনে চলেনি কোম্পানিটি।

অথচ বীমা আইনে একই পরিবারের সদস্যদের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের বিধান থাকলেও তা লঙ্ঘন করে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিবার ১১.৫২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছেন। 

এদিকে ২০২০ সালে এজিএম আয়োজনে ব্যর্থতার পাশাপাশি ২০২১ সালেও আয়োজন করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমনের পাশাপাশি আনরিয়ালাইজড লস বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বিনিয়োগকারীরা।

 এসব পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে কোম্পানিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন-কানুনের ধার ধারছে না। ইচ্ছেমাফিক পরিচালনা করার ফলে ইতোমধ্যে আইডিআরএ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে কয়েকবার শোকজ নোটিস ও জরিমানা করলেও অনিয়ম এবং আইন লঙ্ঘন থেকে ফিরে আসেনি তারা। ফলে ডেল্টা লাইফ, বায়রা লাইফ ও ফারইস্ট লাইফের মতো এখানেও প্রশাসক বসানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির বীমা গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা। 

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব মো. জহির উদ্দিন দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘মূলত যথাসময়ে আর্থিক হিসাব তৈরি করতে না পারায় আমরা এজিএম করতে পারিনি। অনেক কোম্পানিই পারেনি সঠিক সময়ে হিসাব তৈরি করতে। তা ছাড়া ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণে শুধু আমরাই ব্যর্থ হয়নি।

এমন আরো রয়েছে। কেন আমাদের পেছনে লেগেছেন?’ এজেন্ট ও দাবি বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের এজেন্ট মাত্র চারশ এবং সবারই নিবন্ধন আছে।’ 

এদিকে অভিযোগ ও কোম্পানির বক্তব্যের বিষয়ে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতারের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘একটি কোম্পানির এত অনিয়ম, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। এখন ঈদের ছুটির কারণে ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তবে ঈদের পর এ বিষয়ে আমরা খোঁজ খবর নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’