Amar Sangbad
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

রাজধানীতে ভয়াবহ ডেঙ্গু ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ১০, ২০২২, ১২:৪৯ এএম


রাজধানীতে ভয়াবহ ডেঙ্গু ঝুঁকি

অলি-গলি কিংবা বসতবাড়ি, সর্বত্র এখন জেঁকে ধরে মশার দল। সন্ধ্যা নামলে কোথাও এক মুহূর্ত বসে থাকার উপায় নেই। ঝাঁক বেধে মশা হামলে পড়ে। অতিষ্ঠ নগরবাসী। করোনা মহামারি কাটিয়ে ওঠার আগেই যেন ফের উঁকি দিচ্ছে দুই দশকের চেনা সংকট ডেঙ্গু। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু জাতিকে নাস্তানাবুদ করেছে। 

দায়িত্বশীলরা তখন ফাঁকা বুলিতে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ তো ডেঙ্গুর ভয়ে দায়িত্ব রেখে বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকে তোপের মুখে দেশেও ফিরে আসেন। ভয়াবহ ডেঙ্গুজ্বরের জন্য তখনো দায়ী করা হয়েছিল মশক নিধন কাজের গাফিলতি ও ব্যর্থতাকে। কিন্তু এত কিছুর পরও কোনো পরিবর্তন নেই। মশা ওড়ে আকাশে। পরিকল্পনা আছে ফাইলে আর ভোগান্তি রয়ে যাচ্ছে নগরজীবনে।

কিন্তু কোথাও মশা মারার কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। চলতি ডেঙ্গু মওসুমের ডেঙ্গুর জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর দুই সিটির ১০টি জায়গায় ভয়াবহ রকমের এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। যা ২০১৯ সালের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ভয়াবহ মাত্রায়। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-মওসুম এডিস সার্ভে-২০২২ শীর্ষক জরিপের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে প্লাস্টিক ড্রামে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায় ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, সেখানে ২০২২ সালে মওসুমপূর্ব জরিপে লার্ভার পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে জলমগ্ন ফ্লোরে লার্ভা ছিল ২০ শতাংশ, এখন সেটি ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। প্লাস্টিক বালতিতে ছিল ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, চলতি বছর তা ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। 

পানির ট্যাংকে ছিল     ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, এ বছর ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। যা ২০১৯ সালের চেয়েও ভয়াবহতা ছড়াতে পারে। রাজধানীর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৮, ৪০, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড এবং উত্তর সিটির (ডিএসসিসি) ২০ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডিএনসিসির ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ব্রুটো ইনডেক্স (মশার ঘনত্ব) ২৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ৩৮ ও ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স ২০ শতাংশ। এসব এলাকায় পরিত্যক্ত কন্টেইনারে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। 

এছাড়া জলমগ্ন মেঝে ও প্লাস্টিক কন্টেইনারে বেশি মাত্রায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ডিএসসিসির ২০ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে এডিস মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এই দুটি এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এসব এলাকায় পরিত্যক্ত কন্টেইনার, প্লাস্টিক ড্রামে এডিস মশার লার্ভা সবচেয়ে বেশি ২৩ দশমিক ১৯ শতাংশ পাওয়া গেছে।

এছাড়া জলমগ্ন মেঝেতে ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপের জন্য ২১টি দল নির্বাচন করা হয়। সবগুলো দল ১০ দিনে ঢাকার দুই সিটির ৯৮টি ওয়ার্ডের ১১০টি সাইটে তিন হাজার ১৫০টি বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। 

এদের মধ্যে উত্তর সিটির ৬৩টি এবং দক্ষিণ সিটির ৯৬টি বাড়িতে এডিস মশা অতিরিক্ত মাত্রায় চিহ্নিত হয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু মওসুম হিসেবে ধরা হয়। ২০০০ সালে সর্বপ্রথম দেশে ডেঙ্গুজ্বর দেখা দেয়। সে বছর ৯৩ জন মারা যান। তিন বছর পর মৃত্যুসংখ্যা ধীরে ধীরে প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

তবে ২০১৮ সালে ডেঙ্গু আবার ফিরে আসে। সে বছর জ্বরটিতে ২৬ জন মারা যান এবং ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত হন। ২০১৮ সালের আগে সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০০২ সালে। সে বছর সারা দেশে ছয় হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত ২০১৯ সালে। সেই বছর রাজধানীসহ সারা দেশে এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। সরকারি হিসাবে মারা গিয়েছিল ১৭৯ জন। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো কয়েকগুণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ২০১৬ সালের প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ছিল ৩৩ জন। 

২০১৭ সালে তা বেড়ে গিয়ে হয় ১৮৬ জন। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮৯ জন। ইতোমধ্যে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মাত্র ছয় জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। গত চার মাসে এখনো পর্যন্ত ডেঙ্গু সন্দেহে দেশে কারো মৃত্যু হয়নি। 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা এর আগের সব বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছিল। এ বার ২০১৯ সালের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হতে পারে— মত বিশেষজ্ঞদের। তবে ডিএসসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফজলে শামসুল কবির ও ডিএনসিসির নতুন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান উভয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, মশা প্রতিরোধে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সিটি কর্পোরেশন। সিটির সব খালে গাপ্পি মাছ ছাড়ার কাজ শেষ হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা করে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে এ বছরও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটতে পারে, বিশেষ করে প্রজননক্ষেত্র যদি সমূলে ধ্বংস না করা যায়। আমাদের  সিটির কাউন্সিলররা কোনোদিন বাড়ির মালিক কিংবা ভাড়াটিয়াদের ডাকেই না। জনগণকে সম্পৃক্ত না করে স্বল্প কর্মী দিয়ে ডেঙ্গুর মতো মনুষ্য সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। সেই সাথে দুই সিটিতে রোগতত্ত্ববিদের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার খুরশীদ আলম বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করেছি। কারণ, ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধির বেশির ভাগ কারণই হলো মানুষের তৈরি।