Amar Sangbad
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বর্ষায় বাড়বে ডায়রিয়ার প্রকোপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ১১, ২০২২, ১২:৪৭ এএম


বর্ষায় বাড়বে ডায়রিয়ার প্রকোপ
  • চার মাসে ৯৩ জনের মৃত্যু
  • হাসপাতালে ভর্তি ৪০ হাজার
  • একদিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু
  • সর্বোচ্চ মৃত্যু রাজশাহীতে শনাক্তে খুলনা
  • এপ্রিলে শনাক্ত-মৃত্যু ছিল শীর্ষে

ডায়রিয়াজনিত রোগের কারণ ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় ডায়রিয়াজনিত রোগ হয়। ভবরিও কলেরি নামের ব্যাকটেরিয়া কলেরা বা তীব্র ডায়রিয়ার কারণ। এছাড়া রোটা ভাইরাসের কারণে ডায়রিয়া হয় শিশুদের। সারা বছর কমবেশি ডায়রিয়া রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকে। তবে গ্রীষ্মের শুরুতে আর বর্ষার শেষে পানিবাহিত এ রোগের প্রকোপ বাড়ে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বেশি ডায়রিয়া রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। 

গত চার মাসে ৪০ হাজারেরও বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৯৩ জনের। তার মধ্যে গত এপ্রিলে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে। বিভাগীয় হিসেবে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে রাজশাহীতে। আর সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে খুলনায়। চলতি মাসে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে আগামী বর্ষার শেষে ফের ডায়রিয়াজনিত রোগের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

তাদের মতে, প্রতিরোধ যোগ্য রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া ও প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু আমাদের জন্য লজ্জার। অভ্যাস পরিবর্তন ও নিরাপদ খাবার পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সচেতনতা পারে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তিন ধরনের ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসে। এদের মধ্যে তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগতে থাকা রোগীরা সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় থাকে। এ ছাড়া  আংশিক পানিশূন্যতা থাকা ও ডায়রিয়া হওয়ার পর পানিশূন্যতা না থাকা রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। এ জন্য খাবার পানি ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করা, ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা  এবং রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় তৈরি খাবার পরিহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, চলতি বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে গত ৭ মে পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৪০ হাজার ৮৪৯ জন ডায়রিয়া রোগী। এর মধ্যে মারা গেছে ৯৩ জন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে রাজশাহীতে। এই বিভাগের মোট সাত হাজার ৯৮৪ জন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৩১ জন। তবে রোগী সবচেয়ে বেশি খুলনায়। 

এই বিভাগে ৯ হাজার ৬৭ জন রোগী শনাক্ত হলেও মারা গেছে ২১ জন। ময়মনসিংহ বিভাগে শনাক্ত ছয় হাজার ৪৮১ জন, মারা গেছে ১১ জন। ঢাকা বিভাগে শনাক্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৪৪ জন। মারা গেছে ১১ জন। রংপুর বিভাগে চার হাজার ৩৬৫ জন আর মারা গেছে দুজন। চট্টগ্রাম বিভাগে শনাক্ত দুই হাজার ৮৫৩ জন, মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। 

বরিশাল বিভাগে দুই হাজার ৭৪০ জন শনাক্ত, মারা গেছে তিনজন। সিলেট বিভাগে এক হাজার ৫৭১ জন রোগী শনাক্ত এবং এই বিভাগে মারা গেছে দুজন। এক হিসাবে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে ৯ হাজার ৬৮০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে ২৮ জন। 

ফেব্রুয়ারিতে শনাক্ত হয়েছে সাত হাজার ৯৪ জন, মারা গেছে দুজন। মার্চে ৯ হাজার ৫২০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের। এপ্রিলে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯৫৮ জন আক্রান্ত। মৃত্যুবরণ করেছে ৩৫ জন এবং চলতি মাসের গত সাত দিনে এক হাজার ৫৯৭ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার মধ্যে এখনো কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত ও মৃত্যুর তথ্যটি এখনো চলতি বছরের ১১ এপ্রিল। সেদিন ৬৯৮ জন রোগী ভর্তি হয় আর মৃত্যু হয় ১১ জনের। মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চার জানুয়ারি প্রথম এক ডায়রিয়া রোগীর মৃত্যু হয়। এরপর ৬ জানুয়ারি আরও একজনের মৃত্যু হয়। ১০ জানুয়ারি ৯ জনের মৃত্যু হয়। ১৩ জানুয়ারি তিন জনের, ১৮ জানুয়ারি একজনের, ১৯ জানুয়ারি আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়। 

২৩ জানুয়ারি দুইজন এবং ২৭ জানুয়ারি আরও দুইজনের মৃত্যু হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখে একজন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আরও একজনের মৃত্যু হয়। পয়লা মার্চ একজন মারা যায় ডায়রিয়ার কারণে। ১৩ মার্চ আরও একজন মারা যায়। ১৫ মার্চ তিনজন মারা যায় ডায়রিয়ায়। ১৮ মার্চ চারজন মারা যায়। ১৯ মার্চ তিনজন, ২২ মার্চ একজন, ২৭ মার্চ ছয় জন এবং ৩১ মার্চ ৯ জনের মৃত্যু হয়। গত ৪ এপ্রিল মৃত্যু হয় সাত জনের।

 এরপর ১১ এপ্রিল মারা যায় ১১ জন। ১৫ এপ্রিল পাঁচজন, ১৬ এপ্রিল তিনজন, ১৭ এপ্রিল একজন, ১৮ এপ্রিল ছয়জন এবং ১৯ এপ্রিল একজনের মৃত্যু হয়। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) অন্যতম উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘গ্রীষ্ম মওসুমে প্রতি বছর ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর একটু বেশি হয়েছে। এখন থেকে ডায়রিয়া সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। তবে আসন্ন বর্ষা মওসুমের শেষ দিকে ফের বাড়তে পারে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। 

কেননা, সেখানে নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ডায়রিয়া হলেই বাইরের খাবার খাবেন না বলে ক্যাম্পেইন করা হয়। আমি এই কথার সাথে একমত নই। বাইরে খাবার গ্রহণ বন্ধ কোনো সমাধান নয়। বরং সব ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করাই দায়িত্ব। 

ডা. মুশতাক বলেন, যেই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব সেই রোগে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু লজ্জার বিষয়। একটা লোকও মৃত্যুর কথা নয়। কারণ আমরা ডায়রিয়া প্রতিরোধে খাবার স্যালাইন উদ্ভাবন করেছি। এ দেশের ঘণবসতিপূর্ণ এলাকায় কলেরার টিকা দেয়া হচ্ছে। আশা করি সচেতনভাবে উদ্যোগ নিলে শীতের আগেও বর্ষার শেষে ডায়রিয়ার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’