Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ নার্স পাঠানোর সুযোগ

চাহিদা থাকলেও পাঠানো হচ্ছে না

মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান

মে ১২, ২০২২, ০১:৫৪ এএম


চাহিদা থাকলেও পাঠানো হচ্ছে না
ফাইল ছবি

করোনার আগেই স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট ছিল জার্মানিতে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে পদ খালি ছিল প্রায় অর্ধ লাখ। করোনার কারণে বাইরে থেকে কর্মী নিতে পারেনি দেশটি। এখন চাহিদা আরও বেড়েছে। একই অবস্থা মালদ্বীপেরও। জাপানে শতবর্ষী রয়েছে অন্তত ৭০ হাজারেরও বেশি। তাদের সেবাশুশ্রূষার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশটি দক্ষ নার্স খুঁজছে। 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী যোগান দেয় ভিয়েতনাম। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করে নার্স পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ থেকে নার্স নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জার্মানি, গ্রিস, যুক্তরাজ্য ও ইতালি। 

এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত এবং এশিয়ার দেশ জাপানেরও বাংলাদেশি নার্সে আগ্রহ রয়েছে। অনেক দিন থেকে বাংলাদেশ থেকে ডাক্তার ও নার্স নিতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল মালদ্বীপ।

করোনা ভাইরাস মহামারির শুরুর দিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি চিকিৎসক দল পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই দলে বেশ ক’জন নার্সও ছিলেন। সেখানে করোনা চিকিৎসায় সহায়তা শেষে দেশে ফিরেছে সেই দলটি। 

সম্প্রতি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফর করেছেন।

সেখানেও ঢাকা ও মালের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দ্বৈত কর পরিহার, বন্দি বিনিময় এবং যুব ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে তিনটি চুক্তি সই হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান (নবায়ন) সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

শ্রমবাজারের নতুন এ সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো-বিএমইটি এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের দুজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে কমিটিও করা হয়েছে। 

তবে এই মুহূর্তে দেশে নার্সের চাহিদা পূরণকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানোর যে অঙ্গীকার সেটি পূরণে নার্সিং খাত সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। আন্তর্জাতিন পরিমণ্ডলে নার্সদের বেতন-ভাতা প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। 

বিদেশে নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো সম্ভব হলে রেমিট্যান্স খাতে বড় অবদান রাখবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম প্রণয়ন, নার্সিং শিক্ষায় সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ। নার্সদের ভাষাগত দক্ষতা অর্জন, আচরণগত প্রশিক্ষণসহ সার্বিকভাবে একটি কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে নার্স বিদেশে পাঠানো হলে সফলতা আসবে। 

নার্সিং অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে চিকিৎসক অনুপাতে এখনো নার্সের ঘাটতি রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ। দেশের চাহিদা পূরণ ছাড়া এখনই বিদেশে নার্স পাঠানোর সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতে বিদেশে নার্স পাঠানোর জন্য ইতোমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। 

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশের নার্সিং শিক্ষায় একই মান বজায় রাখতে সব সরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি প্রতিষ্ঠানে একই মানের অধ্যক্ষ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ সৃজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দক্ষ শিক্ষক গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যায়ে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ কলেজ নির্মাণের প্রস্তাব করেছে অধিদপ্তর।

প্রস্তাব করা হয়েছে স্বতন্ত্র নার্সিং ও মিডওয়াইফারি ইউনিভার্সিটি স্থাপনের। দেশের প্রতিটি নার্সিং কলেজে অত্যাধুনিক ভার্চুয়াল সিম্যুলেশন ল্যাব স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 

এছাড়া ১৩টি নার্সিং কলেজের পূর্ণাঙ্গ জনবলের পদ সৃজনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সিং শিক্ষার প্রসারে এ পর্যন্ত চার হাজার ৩০৫টি ও মিডওয়াইফে দুই হাজার ১৩৫টি ভর্তির আসন বৃদ্ধি করা হয়েছে।

নার্সিংয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিয়েনারে ৬০টি আসন বৃদ্ধিসহ সরকারি আরো ১০টি নার্সিং কলেজে এমএসসি নার্সিং, পাঁচটিতে দুই বছর মেয়াদি পোস্ট বেসিক নার্সিং ও চারটিতে পোস্ট বেসিক বিএসসি মিডওয়াইফারি চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়েছে। 

এছাড়া দেশের সাতটি নার্সিং কলেজের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। খাগড়াছড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি আধুনিক নার্সিং কলেজ। দেশের যে ৯টি জেলায় এখনো সরকারি নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, সেসব জেলায় কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে নার্সিং অধিদপ্তর। 

এছাড়া পিপিপির আওতায় ঢাকার মহাখালিতে ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে স্টাইপেন্ড বৃদ্ধিসহ প্রতি বছর কৃতী তিন শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়ার প্রথা চালু করা হয়েছে। গেল দুই অর্থবছরে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য দুইজনকে দক্ষিণ কোরিয়া, তিনজনকে থাইল্যান্ড ও একজনকে জাপানে পাঠানো হয়েছে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে অপারেশনাল প্লানের অধীনে এক হাজার ২০০ নার্সকে আইসিইউ, ৬০০ জনকে আইপিসি, ২১০ জনকে পেডিয়াট্রিক, ৯ হাজারকে ফাউন্ডেশন, ১৬০ জনকে ইংরেজি ভাষা, ১২০ জনকে কম্পিউটার, ১২০ জনকে অর্থব্যবস্থাপনা, ১২০ জনকে গেরিয়াট্রিক নার্সিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এছাড়া ৩২ জন মিডওয়াইফকে সুইডেনের ডালার্না ইউনিভার্সিটির অধীনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। নার্সিং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ইতোমধ্যে ২৫০ জনকে টিচিং মেথোডোলজি প্রশিক্ষণ দিয়ে পদায়ন ও দক্ষ শিক্ষক সমস্যা সমাধানে আরো ৮০০ শিক্ষককে পদায়ন ও প্রশিক্ষণের কাজ চলমান রয়েছে। 

মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে ৫০-৬০ জন শিক্ষককে বিদেশ প্রশিক্ষণেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি গবেষণা কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে অধিদপ্তরে চালু করা হয়েছে রিসার্চ শাখা। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণির শূন্যপদ পূরলের লক্ষ্যে ১৯০ জনের একটি পদোন্নতি তালিকা পাবলিক সার্ভিস কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির মাহমুদ তিহান বলেন, বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১৩ বছরে প্রায় ৩৩ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে। এতে সেবার মান বেড়েছে কয়েকগুণ।

আগে যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন নার্সকে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগীর সেবায় দায়ত্বি পালন করতেন। এখন সেখানে একজন নার্সকে অর্ধেক রোগী সামলাতে হয়।

প্রতি বছর মাত্র ২০ হাজার নার্স শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্মজীবনে ফিরছেন। সরকারি ও বেসরকারি মিলে মাত্র পৌনে এক লাখেরও কম নার্স কর্মরত রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দেশে আরও আড়াই লাখের বেশি নার্স সঙ্কট রয়েছে। 

তিনি বলেন, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ হাত ছাড়া করা মোটেও উচিত নয়। যদিও দেশে অপ্রতুল নার্স থাকার কথা বলে ইউরোপ, কুয়েত, সৌদিসহ বিভিন্ন দেশে নার্স পাঠানোর উদ্যোগ আপাতত বাতিল করা হয়েছে।

সর্বশেষ কুয়েত নার্স চেয়ে যোগাযোগ করেছিল। বিশ্ব বাজারে দক্ষ নার্স পাঠানো সম্ভব হলে রেমিট্যান্সেও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো। দেশ ভেদে নার্সদের প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন নিধারণ করা হয়। এসব সুযোগ নেয়া দরকার।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে করোনা মোকাবিলা করাটা বড় চ্যালেঞ্জ। করোনার কারণে স্বাস্থ্য খাতে কর্মী নেয়ার সুযোগ হয়েছে। সেই চাহিদা পূরণও বড় কাজ। 

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, এই মুহূর্তে দেশে নার্সের ঘাটতি রয়েছে। ৪৫ হাজার নার্স সরকারি বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে। আরও প্রায় তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ পদ শূন্য রয়েছে। 

এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মান অনুসারে একজন চিকিৎসকের অনুপাতে তিনজন নার্সের যে পদ সৃষ্টি করা, সেটি পূরণের জন্য আমাদের অধিদপ্তর থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই ফাইলটি পাস হলে ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে চাহিদার অনুপাতে নার্স নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিদেশে নার্স পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, কোভিডকালে আমাদের নার্সরা বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। 

এরপর আরব বিশ্ব ও ইউরোপসহ বিভিন্ন  দেশ আমাদের কাছে দক্ষ নার্স চেয়ে যোগাযোগ করেছিল। করণীয় ঠিক করতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো ও নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর থেকে আমরা বৈঠকে বসেছিলাম। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে দেশের চাহিদা পূরণ করার পর বিদেশে বেসরকারি খাত থেকে নার্স পাঠানো হবে। আন্তর্জাতিক খাতে কাজ করার জন্য ভাষাগত দক্ষতা, আচরণ গত প্রশিক্ষণসহ বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে খুব শিগগিরই উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানান এই কর্মকর্তা।