Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি

মান এক বৈষম্য বেতনে

রায়হান উদ্দিন

রায়হান উদ্দিন

মে ১৫, ২০২২, ১২:১৩ এএম


মান এক বৈষম্য বেতনে
  • প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত নীতিমালা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি
  • নীতিমালা কার্যকরের অভাবে সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী 
  • ১৫১৯ মাদ্রাসাশিক্ষকের বেতন নামমাত্র, তাও আবার অনিয়মিত
  • প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসাশিক্ষকের বেতনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য
  • হতাশায় পেশা পরিবর্তন, বহু শিক্ষকের মানবেতর জীবনযাপন
  • বন্ধ হয়ে গেছে বহু ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, বন্ধের পর্যায়ে আরও অনেক

প্রতিষ্ঠান আছে, রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীও। পাচ্ছে বিনামূল্যে বই। শুধু নেই বেতন-ভাতা। নাম তার ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। আবার কোথাও রয়েছে নামমাত্র অবকাঠামো, নেই ছাত্র-ছাত্রী কিংবা শিক্ষক। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত চলে পাঠদান। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ক্লাসও নিচ্ছেন শিক্ষকরা। প্রাথমিকের ও ইবতেদায়ির সিলেবাস ভিন্ন, তবে শিক্ষার মান-পরীক্ষা পদ্ধতি এক ও অভিন্ন। একজন স্কুলশিক্ষক বেতন পাচ্ছেন ২২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। 

অন্যদিকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসার একজন শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা। এ যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। স্কুলশিক্ষকের বেতন নিয়মিত পক্ষান্তরে ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকের বেতন নিয়মিতই অনিয়মিত। প্রাথমিক শিক্ষকের বেতন মাসের শুরুতেই আর মাদ্রাসার শিক্ষকের বেতন মাসের মাঝে কিংবা শেষে। সব কিছু ঠিক থাকলেও বেতন-ভাতায় চরম বৈষম্য। সবারই একই প্রশ্ন, কেন এমন বৈষম্য।

জানা যায়, ১৯৯৪ সালের একই পরিপত্রে রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা হয়। এখন পর্যন্ত ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ হয়। ফলে বর্তমানে কোনো বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো জাতীয়করণ হয়নি। সরকারি হিসাবে দেশে চার হাজার ৩১২টি স্বতন্ত্র মাদ্রাসা রয়েছে। এ ছাড়াও জয়েন্ট ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে আরও অনেক। 

২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বিষয়াদির ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ফলে ২০১৮ সালের নভেম্বরে একটি নীতিমালা করা হয়। সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকদের বেতন হতো ১১তম গ্রেডে আর সহকারী শিক্ষকদের বেতন হতো ১৬তম গ্রেডে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত এ নীতিমালা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে এমপিওভুক্ত ১৫১৯টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা পাচ্ছেন নামেমাত্র বেতন। তাও আবার অনিয়মিত। কেউ কেউ পান তিন মাস বা চার মাস পর পর বেতন।

 অন্যদিকে সর্বশেষ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জারিকৃত নীতিমালায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের বেতন ১৩তম গ্রেডে করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকের বেতন ১১তম গ্রেডে আর সহকারী শিক্ষকের বেতন ১৩ গ্রেডে হচ্ছে।

এসব স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিতই মাসের শুরুতেই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু একই মানের ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষকরা এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সারা দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক তাদের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। 

এ ছাড়া দিনের পর দিন বেতন-ভাতা না হওয়া, ২০০৯ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। ফলে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তাদের পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

কোথাও কোথাও শিক্ষক না থাকায় ছাত্র-ছাত্রীও ভর্তি হচ্ছে না। ফলে মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন অনেক মাদ্রাসা রয়েছে যেগুলো বহু বছর ধরে বন্ধ আছে। সরকারি অনুদান না থাকায় টিনশেডের ঘরগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 

অন্যদিকে প্রাথমিকের স্কুলগুলোতে রয়েছে আধুনিক ভবন, স্বীকৃত পরিচালনা কমিটিসহ সব সুযোগ-সুবিধা। ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতে নেই স্বীকৃত পরিচালনা কমিটি, নেই অবকাঠামো, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মচারী। ইবতেদায়িগুলো জাতীয়করণ না হওয়ায় আজ ধ্বংসের প্রান্তে বলে জানিয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষকরা। 

এছাড়াও ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে জাতীয়করণের দাবিতে নানান সময় আন্দোলন ও মানবন্ধন হয়ে থাকে। এসব আন্দোলনের জন্য প্রতি মাদ্রাসা থেকে বছরে হাজার হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। যার কোনো সঠিক হিসাবও নেই। আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি গ্রহণের জন্য নেতারা বিলাসবহুল হোটেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন আর সাধারণ শিক্ষকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন জায়গায় দিন-রাত পার করেন। এসব আন্দোলন কেন সুফল হচ্ছে না তাও জানেন না বলে অভিযোগ ইবতেদায়ির সাধারণ শিক্ষকদের।

মেকিয়ারকান্দা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আ. রশিদ মিয়া বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সব শিক্ষার্থী তা পাচ্ছে না। যেসব মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত সেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা পাচ্ছে। অথচ জাতীয়করণের ফলে প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থী সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। কয়েকটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা বলেন, ২০১৮ সালের নীতিমালা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। 

এরফলে এসব মাদ্রাসার শিক্ষকদের হতাশা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেকেই মাদ্রাসা ছেড়ে অন্য কোনো পেশায় চলে গেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী রয়েছে। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় এ পদটিই নেই। ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোর প্রায় সাত হাজার শিক্ষক দিনের পর দিন ভেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা নেই। এছাড়াও শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা রয়েছে। এটি সমাধান না করা হলে মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। দ্রুত প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা। 

তারা আরও বলেন, আন্দোলনের জন্য আমরা প্রতি বছর হাজার টাকা সংগ্রহ করে দেই। কারণ মানববন্ধন করতে খরচাপাতির বিষয় রয়েছে। এর জন্য কত টাকা খরচ হয় তার সঠিক হিসাব আমরা জানতে পারি না।

বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির মহাসচিব কাজী মোখলেছুর রহমান বলেন, একই পরিপত্রে রেজিস্ট্রার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হয়। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করা হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ যে নীতিমালা করা হয়েছে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দ্রুত এ সব সমস্যার সমাধানের দাবি জানায় তারা। 

দেশের মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের একমাত্র পেশাজীবী অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতে ২০০৯ সাল থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। অনেক মাদ্রাসায় শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক না থাকায় বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধের পর্যায়ে রয়েছে আরও অনেক ইবতেদায়ি মাদ্রাসা।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত নীতিমালা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের দুর্দশা লাঘব হতো।’ সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কে এম রুহুল আমীনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।