Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

কর্মক্ষেত্রেও অনিরাপদ নারী

মুছা মল্লিক

মুছা মল্লিক

মে ১৫, ২০২২, ১২:২০ এএম


কর্মক্ষেত্রেও অনিরাপদ নারী
ফাইল ছবি
  • ধর্মীয় অনুশাসনে জোর দিতে হবে: অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
  • দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে: ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ
  • নানা অজুহাতে শরীর স্পর্শ
  • চাকরি হারানোর ভয়ে মুখে কুলুপ
  • বেসরকারি চাকরিতে হেনস্তা বেশি
  • ৩২ শতাংশই জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে
  • হাইকোর্টের নির্দেশনা মানছে না বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান 
  • হয়রানি প্রতিরোধে ৫০ বছরেও হয়নি কোনো আইন

কামনার চোখে নারী। অনিরাপদ হয়ে উঠছে তাদের চারপাশ। বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত, হাট-বাজার, কলকারখানা কোথাও বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা নেই। সহকর্মীদের লোলুপ দৃষ্টি, অশ্লীল কৌতুক, কাজে সহযোগিতার নামে অপ্রীতিকর স্পর্শ, ফোনে বা ইমেইলে কু-ইঙ্গিত, যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা, সম্পর্ক তৈরি না করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মৌখিকভাবে যৌন হয়রানি যেন প্রতিদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। সময়ের সাথে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হয়রানির মাত্রাও। 

লোকদেখানো নিরাপত্তার অন্তরালে কর্মক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক হয়রানির এমন বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠছে দিন দিন। কিছু ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও ভয়ঙ্কর ও হিংস্রতায় রূপ নিচ্ছে। বসের ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করা, শিক্ষকের ভক্ষকের মতো আচরণ যে নারী একবার দেখেছেন, তিনিই জানেন কত কুৎসিত তাদের দৃষ্টি, কত জঘন্য তাদের ভাষা, কতটা হিংস্র তাদের স্পর্শ। 

কর্মক্ষেত্রে দিনের পর দিন এমন হিংস্র আচরণের মুখে পড়েও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ খুলছেন না ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ। সহকর্মীর বাজে কথা বা ইঙ্গিতে অনেকে চাকরির স্থান বদলির আবেদন করলেও পরিবর্তন আসছে না প্রেক্ষাপটের। তবে নারীদের মুখ না খোলার এমন মানসিকতাকে দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাকেই দায়ী করছেন বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ। 

সমীক্ষায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্র ও কাজের ধরন ভেদে অনিরাপত্তা ও পুরুষতান্ত্রিক এই হয়রানির মাত্রা ও ধরন ভিন্ন। কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। ২০০৯ সালে হাইকোর্ট এ সম্পর্কে ১১ দফা নির্দেশনা দেয়। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন-২০১৮-এর খসড়াও হয়েছে। তবে এ খসড়া এখনো আইন আকারে পাস হয়নি। হাইকোর্টের নির্দেশনায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। অভিযোগ দেয়ার ব্যবস্থা এবং তার নিষ্পত্তির ব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেয়া হয়। কিন্তু তা অনুসরণ করছে না বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান। 

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ওই কমিটির ব্যাপারেই জানেন না। পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের জরিপে বলছে, ২২ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের পাঁচ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে এক কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৯৭ জন। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২ হাজার ৫৫৮ জন নারী। আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এদেশে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের পাকাপোক্ত আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইনের যারা প্রয়োগ করবেন তারা নিজেরাই ওই আইনের পথে হাঁটেন না। কখনো অর্থের লোভ কখনো বা হুমকি ধমকিতে শুরুতেই গলদ দেখা দেয়। মামলার অভিযোগপত্র গঠনের সময় ফাঁকফোকর থেকেই যায়। তাই রায়ে ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার লোকজন সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

গত ৬ মে নড়াইলের কালিয়া থানার একটি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষিকার সাথে কথা হয়। সামান্তা মুস্তারি নামের ওই শিক্ষিকা সহকর্মীদের নানা ধরনের মানসিক অত্যাচার ও শারীরিক বিকৃত অঙ্গভঙ্গির কথা জানান। প্রায় এক দশক ধরে বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন তিনি। 

শিক্ষকতার দীর্ঘ এই সময়ে নানা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। শিক্ষকতা পেশায় থেকেও সহকর্মীদের থেকে বিরূপ মন্তব্য, পুরুষ শিক্ষকদের থেকে অপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি, ছুটির দিনগুলোতে ঘুরতে যাওয়ার প্রলোভন, অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাবসহ বিচিত্র ভয়ানক অভিজ্ঞতার সাক্ষী তিনি। ১০ এপ্রিল সংসদে কর্মরত এক নারী তার পুরুষ সহকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার ওই নারী এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন। 

তবে নানা ভয়-ভীতি ও হুমকি-ধমকিতে ভুক্তভোগী সেই জিডি তুলে নিতে বাধ্য হন। এরপর ওই নারী এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দেন সংসদ সচিব বরাবর। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি সংসদ সচিবালয়ের কমিটি শাখা-৬ এ অফিসার মো. রফিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে লিখিত জবাব চাওয়া হয়। 

৭ মার্চ ঢাকার একটি বেসরকারি আইটি ফার্মে কর্মরত সিরাজাম মনিরা নামের এক ভুক্তভোগী জানান, পুরুষ সহকর্মীরা কাজের নামে বারবার তার ডেক্সের কাছে আসতেন। কখনো কখনো কাজ শেখানোর নামে হাতের ওপর হাতও রাখেন তারা। 

বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব, বসের রুমে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগসহ তিনিও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা জানান। এমন অভিযোগ শুধু সামান্তা মুস্তারি, সংসদে কর্মরত ওই নারী বা আইটি ফার্মে কর্মরত সিরাজাম মনিরারই নয়। কর্মজীবী নারী ও কেয়ার বাংলাদেশের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এদিকে করোনা মহামারিকালীন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের সহায়তায় জরিপ পরিচালনা করে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। এ জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৩৫ জন নারীর শতভাগই নিজ কর্মস্থলে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানান। তাদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৪৮ শতাংশ দুই থেকে তিনবার, ২৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ নারী চার থেকে পাঁচবার এবং ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ নারী একবার করে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। 

ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে, কেউ মৌখিকভাবে, কেউবা আবার সরাসরি যৌন আবেদনের শিকারও হয়েছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, গার্মেন্টসে কর্মরত নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সুপারভাইজার দ্বারা ৬৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ম্যানেজার বা বস অথবা নিয়োগকর্তা কর্তৃক ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ নারী নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। 

নির্যাতনের শিকার এসব নারীদের ৩২ ভাগই জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে। চারটি এলাকার আটটি কারখানার শ্রমিকের পর করা এক গবেষণায় সজাগ কোয়ালিশন নামের একটি প্লাটফর্ম বলছে, ২২ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, তারা কখনো না কখনো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। 

কমবেশি ৮৩ শতাংশ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না। যৌন হয়রানি হিসেবে কারখানায় প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের অস্বস্তিকরভাবে দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা, সম্পর্ক তৈরি না করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। 

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায় যে পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে সেটা সামগ্রিকভাবে বা অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

তবে আমরা যারা সরাসরি যৌন নিপীড়ন, ফিজিক্যাল এ্যাবিউজ, সেক্সুয়াল এ্যাবিউজ বা ইমোশনাল এ্যাবিউজ নিয়ে কাজ করছি সেখানে দেখা গেছে— এসবের হার আরও ব্যাপক এবং বিধ্বংসী। আমরা যতগুলো কেস পাই (বিশেষ করে বিষণ্নতার রোগীদের) তাদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগের এ্যাবিউজের অভিজ্ঞতা থাকে। এ সমস্যা কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাক্ষেত্র, মিডিয়া অথবা যেখানে নারীরা কাজ করছেন সেখানেই।

আসলে নারী পুরুষ কাছাকাছি থাকলে ভালোলাগার ব্যাপার আসে। তবে সেটা ভিন্ন জিনিস ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ভালোলাগার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বিপরীতে এ্যাবিউজের মাত্রা বেড়ে গেছে। আমাদের অনৈতিকতার চর্চা এর পেছনে দায়ী। আমাদের ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফির সাইট ব্রাউজ করে।

ফলে নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে মস্তিষ্কে ছাপ বসে যায়। এ সত্তা নিয়ে যখন সে বড় হচ্ছে তখন পরিস্থিতি যদি অনুকূলে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে এ্যাবিউজের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তির মস্তিকের এ সমস্যা প্রকট। এক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব এমনভাবে গড়ে উঠতে হবে যে, অপরাধ করার সুযোগ থাকলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। 

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখা ও নারী-পুরুষ সত্তাকে পরিশীলিত করতে হলে ব্যক্তিসচেতনার পাশাপাশি নৈতিকতার পরিচর্যা, পারিবারিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা, সামাজিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলায় জোর দিতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ আমার সংবাদকে জানান, কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতে নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি হয়রানি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমিটি করার কথাও বলা আছে। 

তবে আইন থাকলেও সব জায়গাতে তা মানা হচ্ছে না। আইন থাকার পরেও তা যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার পেছনে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটা বড় সমস্যা হয়ে থেকে যাচ্ছে। শুধু আইন দিয়েই মানুষের পরিবর্তন সম্ভব নয়, এ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।সমস্যা সমাধানে সবার আগে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।

নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে না ভেবে একজন মা, একজন বোন বা একজন মানুষ হিসেবেও ভাবতে শিখতে হবে। নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। নারীর প্রতি ইতিবাচক এ চর্চা পরিবার ও সমাজ থেকে শুরু না হলে শুধু আইন করেই অবস্থার পরিবর্তন আশা করা কঠিন। 

কর্মক্ষেত্রে কিছু প্রতিবাদী নারী সাহসী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসলেও তাদের আরও বেশি প্রতিকূলতার মাঝে পড়তে হচ্ছে। সমাজ ও গণমাধ্যমের আচরণ তাদের প্রতিকূলে যাচ্ছে। আইনের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যেতে এ প্রতিবন্ধকতাকে কমিয়ে আনতে হবে। সুতরাং নারীর প্রতি সমাজের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এলেই এ সমস্যা কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।