Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

সয়াবিন চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক

এম এইচ তানভীর 

এম এইচ তানভীর 

মে ১৬, ২০২২, ০১:২২ এএম


সয়াবিন চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক

বর্তমান ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উচ্চ দাম আর আমদানি নির্ভরশীলতা কামানোর জন্য তেলবীজ উৎপাদনের পরামর্শ দিচ্ছে সরকার। সয়াবিন ও সরিষা উৎপাদন বাড়ানো গেলে সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এখন দেশে এসব বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের আধুনিক তেমন কোনো প্রযুক্তি নেই। তাই কৃষকদের ফলানো এসব ফসলের চাহিদাও কম। 

পাইকারি বাজারে উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় এসব বীজ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক। জানা গেছে, দেশে গড়ে এক লাখ ১৫ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টন সয়াবিনের উৎপাদন হয় প্রতি বছর। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশই উৎপাদন হচ্ছে লক্ষ্মীপুর জেলায়। 

এছাড়াও চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, ভোলা, বরিশাল ও ফরিদপুর, নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ে কিছু পরিমাণে সয়াবিনের চাষ শুরু হয়েছে। কিন্তু অস্থিতিশীল বাজার দরের অভিযোগ কৃষকদের। সয়বিন চাষের জন্য বিখ্যাত লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার কৃষক আব্দুর রশীদ বলেন, ‘আমি ১৫ বছর ধরে সয়াবিন চাষ করছি। দুই কানি (১৬০ শতাংশ) জমিতে ৫০-৬০ মণ করে সয়াবিন পাই। 

কিন্তু ফসল ওঠালেই দাম কমে যায়। আমরা ঋণ করে চাষ করি তাই বেশি দিন রাখতেও পারি না। বীজ বেচে ঋণ মিটাতে হয়। এ সুযোগে বেপারীরা আমাদের থেকে কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে। আমরা সময়ভেদে মণ প্রতি এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পাই। সরকারি থেকে আমাদের ফসল কেনার ব্যবস্থা করলে ন্যায্য দাম পাইতাম।’ 

রামগতি উপজেলার সয়াবিন চাষি মো. নুর হোসেন বলেন, ‘এবার পর্যাপ্ত ভালো সয়াবিন হয়েছে। কোনো কোনো সিজনে বীজ ভালো না পড়লে ফলন হয় না। আবার মেঘনার পানিতে আমাদের সয়াবিন নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি অফিসার এবং সরকার থেকে সহযোগিতা পেলে আমাদের ফলন আরও ভালো হতো। 

দামের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দামের ঠিক নাই, একেক সময় একেক দাম পাই। এ জন্য অনেকে সয়াবিন চাষ করে না এখন। কৃষি গবেষকরা বলছেন, স্থানীয় ঘানি বা দেশে প্রচলিত এক্সপেলার মেশিনে সয়াবিন থেকে তেল নিষ্কাশন করা যায় না। অত্যাধুনিক নিষ্কাশন মেশিনে বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করা হয়, যা আমেরিকা, জাপান, চীন, ব্রাজিলসহ সয়াবিন উৎপাদনকারী দেশে ব্যবহূত হয়।

সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অত্যাধুনিক এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন আমদানি করে সয়াবিন তেল নিষ্কাশন করাতে পারে। সয়াবিন আবাদ লাভজনক বিবেচিত হলে কৃষক সয়াবিন চাষে উদ্যোগী হবেন এবং কৃষকরা অন্য রবি ফসল আবাদ কমিয়ে সয়াবিন চাষে ঝুঁকবেন। এতে স্বল্প সময়েই দেশে সয়াবিনের চাহিদার অনেকটাই মেটানো সম্ভব হবে। 

এ ছাড়াও সয়াবিন থেকে তেল নিষ্কাশনের পর মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য পুষ্টি সমৃদ্ধ সয়াময়দাসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার এবং পোলট্রি, গবাদিপশু ও মাছের  খাবারও তৈরি করা যাবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৭ হাজার তিন হেক্টরে ১ দশমিক ৪৬৯ লাখ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৯ হাজার হেক্টরে ১ দশমিক ৩৫২ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে। 

এছাড়াও চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে সয়াবিন চাষ হয়েছে ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে। আর লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৮ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে সয়াবিনের আবাদ হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে হয় ৪০ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে। 

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে সয়াবিন আবাদ হয়েছে ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে। গড় উৎপাদন ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টনের মতো। উৎপাদিত সয়াবিন দিয়ে কী করা হয় জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. জাকির হোসেন বলেন, মাঠ থেকে আহরিত সয়াবিন আধুনিক অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে সিদ্ধ করে শুকানোর পর তেলবীজ, ডালবীজ ও পোলট্রি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে প্রক্রিয়াজাত হয়। 

পরে সেগুলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে ২৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। এর মাধ্যমে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ এলাকা ২০ শতাংশ বাড়ানো এবং তেলজাতীয় ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। 

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডাল, তেল ও মশলা বীজ উৎপাদন প্রকল্পের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, তেলবীজ কম চাষ হওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে। বাংলাদেশে কিছু পরিমাণে সরিষা চাষ হলেও সয়াবিন চাষ তেমন একটা হয় না। দেশের মাটিতে সয়াবিনের ফলনও কম হয়। আবার আমাদের বীজ থেকে তেল উৎপাদনের তেমন ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বীজ থেকে তেলের পরিমাণও কম হয়। এ জন্য কৃষকরা এ জাতীয় বীজ উৎপাদনে কম আগ্রহী।