Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

ডিজিটাল দুর্ভোগে ভাতাভোগীরা

রেদওয়ানুল হক ও মেহেদী হাসান মাসুদ (বালিয়াকান্দি)

রেদওয়ানুল হক ও মেহেদী হাসান মাসুদ (বালিয়াকান্দি)

মে ১৮, ২০২২, ০২:৪৮ এএম


ডিজিটাল দুর্ভোগে ভাতাভোগীরা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেশের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের বিভিন্ন মেয়াদে ভাতা দেয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। বয়স্ক, বিধবা ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গসহ বেশ কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত এসব ভাতা প্রাপ্তিতে নানা হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাই সহজ ও হয়রানিমুক্ত উপায়ে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে ভাতা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল মাধ্যমের সহায়তা নেয় সরকার। 

এর মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব এবং মোবাইল ব্যাংকে ভাতা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হয়রানিমুক্ত উপায়ে এ সেবা পেলেও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর অযৌক্তিক নিয়মনীতি ও অবহেলার কারণে ডিজিটাল বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন লাখ লাখ ভাতাভোগী। 

অন্যদিকে অধিদপ্তর থেকে টাকা ছাড় করা হলেও দীর্ঘ সময় পরও টাকা পৌঁছছে না গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে। এছাড়া অটো ক্যাশআউটের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত থাকছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন সেবা। ফলে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার ভাতাভোগীরা। 

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বাইরে এমএফএসের আওতায় ভাতা দেয়া হচ্ছে বিকাশ ও নগদে। ভাতাভোগীদের অভিযোগ, তাদের নগদ অ্যাকাউন্টে টাকা আসার সাথে সাথে তা অটো ক্যাশআউট হয়ে চলে যাচ্ছে প্রতারকচক্রের হাতে। পরবর্তীতে ক্যাশআউট হওয়া নম্বরে কল দেয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। 

অন্যদিকে বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার পর ক্যাশআউট ব্যতীত অন্য সব সেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিকাশের কাস্টমার কেয়ারে কল দিয়ে গ্রাহক জানতে পারছেন ৩০ দিনের জন্য তার সব সেবা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে লোনের কিস্তি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন বিল পরিশোধ করতে না পারায় জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এসব অভিযোগ নিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে ভিড় করছেন ভাতাভোগীরা। কিন্তু বিকাশ ও নগদ কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে ভাতাভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। 

গাইবান্ধা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জানান, ঈদের আগে টাকা ছাড় করা হলেও এখনো গ্রাহক টাকা বুঝে পায়নি। এমন অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিনই ভাতাভোগীরা তাদের কাছে আসছে। অন্যদিকে জেলার পলাশবাড়ি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জানান, নগদ থেকে ম্যাসেজ আসছে কিন্তু গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হচ্ছে না। এমন অভিযোগ তারা পাচ্ছেন। 

কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নগদ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন অথবা সময়ক্ষেপণ করছেন। তাই গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। চুক্তি অনুযায়ী বিকাশ ও নগদ গ্রাহকদের ১০ ধরনের সেবা দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কাগজে-কলমেই থাকছে। বাস্তবে গ্রাহকের সেবা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই তাদের। 

এছাড়া অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার সক্ষমতাও নেই। প্রান্তিক পর্যায়ে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমেই সারছেন কাস্টমার কেয়ারের কাজ। তাই সমস্যার সমাধান কিংবা সঠিক তথ্য দিয়ে গ্রাহকদের সহায়তা করতে পারছেন না এসব এজেন্টরা। জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার সমাজসেবা অফিসে নগদ গ্রাহকদের অটো ক্যাশআউট হওয়ার পঞ্চাশের অধিক মৌখিক এবং পাঁচটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। 

উপজেলার তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মানিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ ভাতাভোগী নিরক্ষর, বয়স্ক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সচেতন নন। তারা সমস্যা হলে আমাদের কাছে আসেন কিন্তু নগদের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা যথাযথ সহায়তা না করায় আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না।’ 

তিনি বলেন, ‘পলাশবাড়ি উপজেলার একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর টাকা ক্যাশআউট হয়ে গেলে আমরা নগদের সহায়তা চাই। তারা প্রাথমিকভাবে আমাদের বলে— রংপুর বা রাজশাহী অঞ্চলের কেউ একজন টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরবর্তীতে নগদ আমাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করেনি।’

এসব বিষয়ে নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা জাহিদ সজলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময় লাগবে বলে জানান। পরবর্তীতে বারবার যোগাযোগ করেও নগদ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

অন্যদিকে বিকাশ হেল্পলাইন বলছে, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাতা গ্রহণের পর ৩০ দিন আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্টে ক্যাশআউট ছাড়া অন্য সকল লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। সাময়িক এই অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত।’ 

কিন্তু বিকাশের কর্পোরেট কমউনিকেশন বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম আমার সংবাদকে বলেন, ‘সেবা স্থগিত রাখার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ সক্ষমতার ঘাটতি বা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে টাকা দেরিতে পৌঁছানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্নের জবাব দেননি।

তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল প্রতারণার হাত থেকে ভাতাভোগীদের অর্থের সুরক্ষা দিতে সেন্ডমানি বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। বিকাশ এ ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে নগদ এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেনি, তাই নগদের ক্ষেত্রে অটো ক্যাশআউটের ঘটনা ঘটছে। ৩০ দিনের জন্য সেবা স্থগিত রাখায় গ্রাহকের সমস্যার বিষয়টি নজরে আনলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (বয়স্কভাতা শাখা) ফরিদ আহমেদ মোল্লা আমার সংবাদকে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের অধিকাংশ ভাতাভোগী প্রযুক্তি জ্ঞানে পিছিয়ে রয়েছেন তাই তাদের সচেতন করতে সাময়িক সময়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’ 

প্রান্তিক পর্যায়ে নগদ এবং বিকাশের সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়ে একমত হয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার বিষয়টি তাদের নজরে এনেছি। আশাকরি এ বিষয়ে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।’ এছাড়া অর্থবিভাগ, বাংলাদেশে ব্যাংক এমএফএস প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয় বলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছতে সময় লাগে বলেও জানান এ কর্মকর্তা। 

বেশ কয়েকজন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের দ্বিতীয় কিস্তির রিকন্সিলেশন টাকা এখনো অনেকের মোবাইলে পৌঁছায়নি। তৃতীয় কিস্তির টাকাও পৌঁছায়নি বহু ভাতাভোগীর। কবে কখন যাবে তাও জানা যাচ্ছে না। আবার টাকা না পৌঁছলেও ভাতাভোগীর অ্যাকাউন্ট বিবেচনায় বিকাশ নম্বর ব্লকড (অনলি ক্যাশ আউট অপশন চালু) হয়ে আছে। সিস্টেমে টাকা সেন্ট দেখালেও বাস্তবে ভাতাভোগীদের মোবাইলে টাকা না পৌঁছানোয় সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সমাজসেবা কর্মকর্তা বলেন, ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির রিকন্সিলেশনের টাকা অনেকের মোবাইলে না পৌঁছানোয় প্রতিনিয়ত শত শত ভাতাভোগী টাকার খোঁজ নিতে আসেন। কোনো তথ্য না থাকায় আমাদের চুপ থাকতে হয়, শুনতে হয় কটু কথা।’ বহু সংখ্যক ভাতাভোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ কিস্তির টাকা আসার পরপরই বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে। ক্যাশআউট ছাড়া অন্য কোনো অপশন চালু নেই। ফলে কোনো লেনদেন করা যাচ্ছে না। 

ধামরাই উপজেলার মো. আতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমার পিতার বয়স্ক ভাতার টাকা আমার বিকাশ অ্যাকাউন্টে আসে। গত মাসের ২৬ তারিখে (জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চের) ভাতার ১৫শ টাকা আসার পরই ক্যাশআউট ছাড়া সব অপশন বন্ধ রয়েছে। আমি বিকাশের মাধ্যমে মোবাইল রিচার্জসহ সব লেনদেন করলেও ২৬ তারিখের পর থেকে আর কিছুই করতে পারছি না। এতে আমার চরম দুর্ভোগ হচ্ছে। 

পরে জানতে পারলাম এক মাস বন্ধ থাকবে, অ্যাকাউন্ট বন্ধ রাখা দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।’ 

রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার মেঘলা টেলিকমের প্রোপ্রাইটর গৌতম বলেন, ‘প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে বিকাশের সমস্যা নিয়ে। পরবর্তীতে জানতে পারি ভাতাভোগীদের এমন সমস্যা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রতারণা এড়াতে পদ্ধতি ঠিক থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকাউন্ট অচল করে রাখলে মানুষের দুর্ভোগ হয়।’ ক্যাশআউট করার সাথে সাথেই অ্যাকাউন্ট সচল করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। 

ভাতাভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ আগে ভাতার টাকা উঠাতে দিন কামাই হতো। বই জমা দিয়ে সিরিয়াল দিয়ে টাকা নিতাম। এখন ঘরে বসেই টাকা পাওয়া যায়। তবে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ কিস্তিতে হয়রানির শিকার হচ্ছি। বিকাশের অ্যাকাউন্ট অচল, আর নগদের অনেক ভাতাভোগীর অটোমেটিক ক্যাশআউট হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।’ 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক বয়স্ক, বিধবা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সর্বমোট এক কোটি ৬৪ হাজার ৬২ জনকে জিটুপির (গভর্নমেন্ট টু পিপল) আওতায় ভাতা দেয়া হচ্ছে। 

প্রায় ১৯ লাখ ভাতাভোগীকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভাতা দেয়া হচ্ছে, বাকি ভাতাভোগীদের মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার বিধান রেখে বয়স্ক ভাতা চালু করা হয়। একই অর্থ বছরে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের পরিবার ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য বিধবা ভাতা দেয়া শুরু হয়। 

এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভাতা চালু হয়। ওই অর্থবছরেই তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভাতা চালু হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে অসহায় মানুষের সহায়তায় অগ্রাধিকার দিয়ে এক কোটির বেশি বিভিন্ন প্রকার ভাতা ও অনুদান দেয়া হয়। ২০১৮ সাল থেকে সব ভাতাভোগীর ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির পাইলটিং কাজ শুরু করা হয়।