Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

আসন্ন বাজেট

ব্যয় বাড়বে ৩৫.৮৪ শতাংশ

জাহিদুল ইসলাম

জাহিদুল ইসলাম

মে ১৮, ২০২২, ০৩:০২ এএম


ব্যয় বাড়বে ৩৫.৮৪ শতাংশ

যোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী জুন মাসে বাজেট উপস্থাপন করবে সরকার। যে প্রকল্পগুলো জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এবং আগামী অর্থবছরে শেষ হবে, সেগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিতসভায় বিষয়গুলো চূড়ান্ত হলেও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসির সভায় এটা পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। 

বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ছে বহুগুণ। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়বে বহুগুণ। আসন্ন বাজেটে ঘাটতি ধরা হবে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এটি বাজেটের সম্ভাব্য আকার ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার ৩৫.৮৪ শতাংশ। 

এছাড়া মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তাছাড়া কোভিড পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে এটি দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

গত এপ্রিলে আর্থিক মুদ্রা বিনিময় হারসংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিল ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার হবে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির জন্য দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশনের সভায় এর পরিমাণ দুই লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হবে, যা এডিপির আকারের ২৮.৭৩ শতাংশ। 

মূলত দেশের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে চলমান বেশ কিছু মেগা প্রকল্পকে গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া যেসব প্রকল্প আগামী অর্থবছরে শেষ হবে এবং জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেসব প্রকল্পে বেশি অগ্রাধিকার ও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে পদ্মাসেতু প্রকল্পে বরাদ্দ না থাকলেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, সড়ক, রেল ও বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল (এমআরটি-৬),  যমুনা রেলসেতু, পদ্মা রেলসংযোগ, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে চলতি অর্থবছরের চেয়ে বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। 

চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে দুই লাখ ১৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা করা হয়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৫৫ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় প্রস্তাবিত এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের বরাদ্দ বেড়েছে ১৪ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের এডিপির ৭০ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। 

এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ কমলেও এডিপি বরাদ্দে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আগামী অর্থবছরে এই খাতে ৩৯ হাজার ৪১২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত এডিপিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ২৯ হাজার ৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আর স্বাস্থ্য খাতে ১৯ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। 

কমিশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ, আর আগামী অর্থবছরে এই খাতে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।  শতাংশের হিসাবে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লেও টাকার হিসাবে বেড়েছে ১০ হাজার ৮২০ কোটি। প্রস্তাবিত এডিপিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়িয়ে ১১.৮২ শতাংশ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের এডিপির তুলনায় আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ৩৬.৪৮ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে শিক্ষা খাতে ১০.২৯ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হলেও সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমিয়ে তিন দশমিক ৮১ শতাংশ করা হয়।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী জানান, মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদা অনুযায়ী খাতভিত্তিক বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো খাত। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। 

পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। এ ছাড়া ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেয়া হতে পারে বিদ্যুৎ খাতে ১৮ হাজার কোটি টাকা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানি মূল্য পরিশোধ ও প্রণোদনা প্যাকেজের সুদ ভর্তুকি ১৭ হাজার ৩০০ কোটি, খাদ্য ভর্তুকি ছয় হাজার ৭৪৫ কোটি এবং কৃষি প্রণোদনা বাবদ ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ, সার ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা না হলেই অবশ্য এমনটা হবে। 

এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আসন্ন বাজেটে এই খাতে সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল এক লাখ সাত হাজার ৬১৪ কোটি টাকা।

করোনাকালে গত দুই বছরে এডিপির আকার (সংশোধিত এডিপি ধরে) বেড়েছে চার থেকে ৭ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার বাড়ছে প্রায় ১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। কাঙ্ক্ষিত হারে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এডিপির আকার সংশোধন করে দুই লাখ ১৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা করা হয়। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার বাড়ছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। 

এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রকল্প বাস্তবায়ন গতানুগতিক ধারায় রয়েছে। গত জুলাই-মার্চ মাস সময়ে সংশোধিত এডিপির ৪৫ শতাংশের মতো বাস্তবায়ন হয়েছে। খরচ হয়েছে ৯৮ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা।

 সূত্রমতে, আগামী অর্থবছরে মোট আয় ধরা হচ্ছে চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যেখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে আয় তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ধরে এনবিআরকে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও সে অনুপাতে আদায় করতে পারছে না সংস্থাটি। গত মার্চ পর্যন্ত এনবিআর আদায় করেছে দুই লাখ চার হাজার আট কোটি টাকা। প্রতি প্রান্তিকে গড়ে আদায় হয়েছে ৬৮ হাজার দুই কোটি ৭১ লাখ টাকা। 

এই হিসাবে বছর শেষে এনবিআরের আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে দুই লাখ ৭২ হাজার ১০ কোটি টাকা। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াবে ৫৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৮৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। নিয়মিত রাজস্ব ঘাটতি বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।  আসন্ন বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৭৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হচ্ছে জানিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৬৯ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা।

তবে গত কয়েক বছর যাবত এনবিআরে উচ্চমাত্রার লক্ষ্য নির্ধারণ ও অর্জনে ব্যর্থতার বিষয়টিকে সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এনবিআরের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি না করে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়বে। এমনকি আগামী বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হার চলতি অর্থবছরের ৫.৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫.৫ নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতিকে কোনোক্রমেই এই সীমায় আটকে রাখা সম্ভব হবে না। 

কারণ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের হিসাবে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও বেসরকারি হিসাব বলছে এটি ১০ শতাংশের উপরে। এমন প্রেক্ষাপটে আরেক ধাপ মুদ্রাস্ফীতি হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলবে। ইতোমধ্যে এর প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ক্রমাগত নিচের দিকে।

অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটের প্রভাব কেমন হতে পারে, তা জানতে চাওয়া হয় অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়ার কাছে। তিনি দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘লক্ষ্য অর্জনে বারবার বিফল হওয়ার পরও প্রতি বছরই বাড়ছে এনবিআরের আদায় লক্ষ্যমাত্রা। এতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, ফলে জনসাধারণের জীবনমানের ওপর আরো প্রভাব পড়বে। কারণ মুদ্রাস্ফীতি হলো জনগণের ওপর সরকারের এক ধরনের গোপন ট্যাক্স। তা ছাড়া আমদানি বৃদ্ধির ফলে এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপরও প্রভাব ফেলবে।’ 

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে বলেন, ‘ধনীদের করহার বাড়াতে হবে, তারা যথাযথ কর আদায় করছে না। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনও হ্রাস করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া যেতে পারে।’ 

এদিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বারবার ব্যর্থতায় এনবিআরের মৌলিক পুনর্গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি এখন নিয়মিত একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আমরা বলছি আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু অপরদিকে দেখা যাচ্ছে সে অনুপাতে রাজস্ব বাড়ছে না। এই সমস্যা চিহ্নিত করার খুবই প্রয়োজন ছিল।’ 

এই ব্যর্থতার প্রভাব সম্পর্কে বলেন, ‘সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সরকার যথোপযুক্ত ফাইন্যান্সিং করতে পারছে না, ব্যাপক হারে ঋণ নিয়ে দায়ভার বাড়ছে। এ থেকে বের হয়ে আসা সরকারের পক্ষে মুশকিল হবে।’