Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের কেনাকাটার ১৭ নথি গায়েব

রহস্য কাটেনি সাড়ে ছয় মাসেও!

মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান

মে ২৪, ২০২২, ০১:৪৮ এএম


রহস্য কাটেনি সাড়ে ছয় মাসেও!

সর্বোচ্চ নিরাপত্তা স্থাপনা (কেপিআই বা কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের কেনাকাটার ১৭ নথি গায়েবের ঘটনা সাড়ে ছয় মাসেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। 

এর আগেও গত বছর আগস্টে একই শাখা থেকে নথি গায়েব হয়। সেই ঘটনারও তদন্তসাপেক্ষে কোনো বিচার হয়নি। নথি গায়েব ঘটনার সাথে কারা জড়িত এবং কী-উদ্দেশ্যে নথিগুলো চুরি করা হয়েছে তার তদন্তের কোনো কিনারা করতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। 

তদন্তে কোনো ক্লু না পাওয়ায় অন্ধকারে আছেন তারা। চুরির পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং একজন ঠিকাদারসহ ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সিআইডির কর্মকর্তারা। 

সিআইডির সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছিলেন। তবে এ ঘটনায় কোনো মামলা না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। সচিবালয়ের ৩ নম্বর ভবনের নিচ তলায় ২৯ নম্বর কক্ষ থেকে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ থেকে কেনাকাটার ১৭ নথিসহ একটি ফাইল হারিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে গত বছরের ২৮ অক্টোবর শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নাদিরা হায়দার। 

দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তদন্তও অজানা কারণে থেমে আছে। চুরির মতো ফৌজদারি অপরাধের ঘটনা ঘটলেও মামলা করতে রাজি নন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নথি চুরির ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. শাহ্ আলমকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চার কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। 

তারা হলেন— ওই বিভাগের ক্রয় ও সংগ্রহ-২ শাখার সাঁট মুদ্রাক্ষরিক-কাম কম্পিউটার অপারেটর আয়েশা সিদ্দিকা, জোসেফ সরদার, প্রশাসন-২-এর (গ্রহণ ও বিতরণ ইউনিট) অফিস সহায়ক বাদল চন্দ্র গোস্বামী ও প্রশাসন-৩ শাখার অফিস সহায়ক মিন্টু মিয়া। 

চার কর্মচারীকে শাস্তি প্রদান, মামলা না হওয়ার কারণ ও ঘটনার সামগ্রিক বিষয়ে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারাও এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো কথা বলতে চান না। গত বুধবার কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. শাহ্ আলমকে ফোন করে সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এদিকে সিআইডি বলছে, সর্বোচ্চ নিরাপত্ত বেষ্টনী থেকে ফাইল গায়েব হয়েছে। শুরু থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সাথে দেখছে তারা। বিভিন্ন দিক সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। 

তার মধ্যে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী এ ঘটনার সাথে জড়িত। ভেতর থেকেই ওই ফাইল সরানো হয়েছে। তবে কে ওই ফাইলগুলো সরিয়েছে তাকে চিহ্নিত করা যায়নি। ফাইলগুলো সরিয়ে দুর্বৃত্তদের কী লাভ হয়েছে তা তারা খতিয়ে দেখছেন। 

এছাড়াও বাইরের কোনো চক্র এ চুরির সাথে জড়িত আছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়াও এ ঘটনার সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছেন তারা। তাকে তারা নজরদারিতে রেখেছেন। তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন তারা। 

এছাড়াও ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কল রেকর্ড তারা করছেন চুলচেরা বিশ্লেষণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চায় না, তাই জিডির তদন্ত বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা করতেও রাজি নন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জিডিতে বলা হয়, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ক্রয়সংক্রান্ত শাখা-২ এর কম্পিউটার অপারেটর জোসেফ সরদার ও আয়েশা, ২৭ অক্টোবর কাজ শেষ করে ফাইলটি একটি কেবিনেটে রেখে গিয়েছিলেন। ওই ফাইলের ভেতরে ১৭টি নথি ছিল। পরদিন অফিসে গিয়ে ওই ফাইলটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সচিবালয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। 

পুলিশ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সচিবালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) শাহাদৎ হোসাইনের কক্ষ লাগোয়া ঘর থেকে নথিগুলো চুরি হয়। পাশের লাগোয়া ঘরটিতে বসেন ক্রয় ও সংগ্রহ শাখা-২-এর সাঁট মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর মো. জোসেফ সরদার এবং আয়েশা সিদ্দিকা। ফাইলগুলো এই দুই কর্মীর ক্যাবিনেটে ছিল। যে নথিগুলো খোয়া গেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের অধীন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও বিভাগের কেনাকাটা-সম্পর্কিত। 

জিডি সূত্র জানায়, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য মেডিকেল কলেজের কেনাকাটা-সংক্রান্ত একাধিক নথি, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি, জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) কেনাকাটা, ট্রেনিং স্কুলের যানবাহন বরাদ্দ ও ক্রয়-সংক্রান্ত নথি চুরি হয়েছে। 

এর বাইরে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্পের নথিও চুরি হয়েছে। গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও পণ্য অস্বাভাবিক দামে কেনাকাটায় ভয়াবহ অনিয়মের তদন্ত করে আসছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি এ দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। 

অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন ছাড়াই শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে কেনা হয়েছে অনেক পণ্য। এর মধ্যেই ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েবের ঘটনা ঘটে। ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পড়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ওপর। 

সিআইডি সূত্র জানায়, যে কক্ষ থেকে ১৭টি নথি চুরি হয়েছে সেখান থেকে এর আগেও গত আগস্টে একবার নথি গায়েব হয়েছিল। যারা আগে একবার এমন চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে তারা দ্বিতীয়বারও চুরির সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। সেই বিষয়টিকেও তারা তদন্তের মধ্যে এনেছেন। 

এ ঘটনার মুখ্য তদন্তকারী সিআইডির সদর দপ্তরের এডিশনাল ডিআইজি (ঢাকা মেট্রো) মো. ইমাম হোসেন জানান, ১৭ নথি গায়েব ঘটনার তদন্ত চলমান আছে। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত জায়গা সচিবালয় থেকে ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও ফাইল গায়েব হয়েছে যেহেতু তাই বিষয়টি খুবই সুক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। 

এমন সুরক্ষিত জায়গা থেকে স্বাভাবিকভাবে ফাইল গায়েব হওয়ার কথা নয়। এখানে একটি চক্রের যোগসাজশ রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। গোয়েন্দাদের তদন্তসাপেক্ষে মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। 

একই সাথে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি কী প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রণালয় থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এ বিষয়ে জনসম্মুখে তথ্য প্রকাশ করা দরকার।