"দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানী করে, যা তুই যুদ্ধে যা"

রুমী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং বেশ অদ্ভুত ধরনের। তার সাথে কথায় কেউ পারত না। কখনও বাংলা, কখনও ইংরেজি কবিতা কিংবা উপন্যাসের যুক্তি দিয়ে মা-বাবাকে কথায় হারিয়ে দিতেন, কখনো বা হৃদয়-গলানো হাসি। 

১৯৭১ সাল ধানমন্ডির এক সকাল। শুরুটা হয়েছিল আমেরিকার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির এক চিঠি দিয়ে। রুমির জন্মের সময় ভবিষ্যতদ্বানী সত্যি হতে চলেছে। মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বিশ্বজয় করবে রুমি। মা-বাবার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। চারিদিকে কত খুশি কত আনন্দ। 

কিন্তু হঠাৎ করে পাল্টে গেল সব। এলো  ৭ই মার্চ। ঘোষণা এলো , “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

যারা দেশকে ভালোবাসে, বজ্রকণ্ঠী বঙ্গবন্ধুর এ ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না তাদের। রুমীও পারেননি সেই ডাককে অবহেলা করতে। আর দশজন বাঙালি যুবকের মতো সদ্য তারুণ্যে পা রাখা রুমী ইমামের মনেও নাড়া দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে যাবার আহ্বান। আমেরিকার শিকাগো শহরের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতছানিও তাকে ভোলাতে পারেনি, তাকে টেনেছিল দেশমাতৃকার ডাক।

একদিন তার যুদ্ধে যাবার সুযোগ এসে গেল। রুমী চাইলেই পালিয়ে যেতে পারতেন, সুযোগ ছিল তার হাতে। কিন্তু মা অন্তঃপ্রাণ ছেলে রুমী। মাকে না জানিয়ে কোনো কাজ করতেন না তিনি। তাই এলেন মায়ের কাছে অনুমতি নিতে। মাকে বলেছিলেন, এই উত্তাল সময় এখন সব দলের উর্দ্ধে, তাকে যুদ্ধে যেতে হবে।

মায়ের মন বলে কথা, সে কি আর সহজে মানে নিজের নাড়ি ছেঁড়া ধনকে বিসর্জন দিতে? কিন্তু যুগে যুগে মায়েরা বুকে পাথর বেঁধে সন্তানকে বিভিন্ন বৃহত্তর স্বার্থে বিসর্জন করে এসেছেন। 

১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল নাছোড়বান্দা মা জাহানারা ইমাম বলেছিলেন, "দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানী করে, যা তুই যুদ্ধে যা"।

রুমী গেল যুদ্ধে। ট্রেনিং নিল। ট্রেনিং শেষে দলবল নিয়ে করল একের পর এক বড় অপারেশন। দেশমাতাকে রক্ষা করতে প্রায় সফল হতে চলেছে। এই তো এর কয়েকটা দিন। কিন্তু তারপর, , , তারপর আর স্বাধীন দেশমাতাকে দেখতে পারিনি রুমী। 

রুমীর মতোই আর এক সাহসী বীরযোদ্ধা ছিলেন আজাদ। আজাদদের বাড়িতেই রুমী, হাবিবুল আলম বদি, জুয়েলরা গেরিলা অপারেশনে অংশ নিচ্ছিলেন আগরতলা থেকে ফিরে এসে। কিন্তু সেই খবর পোঁছে যায় পাকিস্তানি সৈন্যদের কানে। পাকিস্তানি বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে। 

২৯ আগস্ট, ১৯৭১ , রুমী, আজাদ, জুয়েল, বদীসহ বেশ কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধা পাক হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। কিন্তু এরপরে রুমীর আর কোনো খোঁজ কেউ পায়নি। রুমী কতদিন বেঁচে ছিলেন, তার লাশই বা কোথায়, কেউ জানে না আজও।

তবে আটকের পর আজাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার মায়ের। আজাদের মাকে জানানো হয়, আজাদ রাজসাক্ষী হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

তাকে বলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা, কোনো কিছু স্বীকার করবে না’। তখনই আজাদ তার মাকে বলেন, মা কয়েকদিন ভাত খাই না। আমার জন্য একটু ভাত এনো। কথা মতো মা ভাত নিয়েও এসেছিলেন। তবে ছেলেকে আর খাওয়াতে পারেননি।

সেই থেকে অপেক্ষা করেছিলেন আজাদের মা, এই বুঝি ফিরে এসে ভাত চাইবে তার ছেলে। না, আর ফেরেননি আজাদ। তাই মা-ও  আর কোনো দিন ভাত মুখে তোলেননি। ১৪ বছর একবেলা রুটি খেয়ে থেকেছেন মা। ঘুমিয়েছেন মেঝেতে। কারণ ছেলে যে তার শুয়ে ছিলো নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলের মেঝেতে। ছেলের অপেক্ষায় দিন গুণতে গুণতে ১৯৮৫ সালের ৩০ আগস্ট না ফেরার দেশে চলে যান শহীদ আজাদের মা।

আজ বিজয়ের ৫০ বছর। আজ নিশ্চয় আমাদের দেশের, রুমী-আজাদের মতো শহীদেরা স্বর্গ থেকে দেখছে আমাদের সোনার বাংলাদেশ। ভালো থাকুক রুমী-আজাদেরা, আর তাদের মহিয়সী মায়েরা। ভালো থাকুক আমাদের সোনার বাংলাদেশ।