প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি ঠেকাতে পারে হেপাটাইটিস ভাইরাস

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২২, ০১:৫১ এএম

হেপাটাইটিসের কারণে প্রতি মিনিটে বিশ্বে দুজন মানুষ প্রাণ হারায়। সে হিসাবে বছরে প্রায় দুই কোটি মানুষ মারা যায়। দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। অবাক করা তথ্য যে, প্রতি ১০ জনের ৯ জনই জানে না তার হেপাটাইটিস হয়েছে।

এভাবে নীরবে ভাইরাসটির বিস্তার ঘটছে। স্বামী থেকে স্ত্রী, স্ত্রী থেকে স্বামী কিংবা মা থেকে নবজাতকের শরীরে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই হার আরও ভয়াবহ। গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশেরও বেশি শরণার্থী ভাইরাসটি বহন করছে। সচেতনতা, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন, জীবন আচরণ পরিবর্তন ও সঠিক চিকিৎসার অভাবে ভাইরাসটি দিন দিন মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে হেপাটাইটিস ক্যান নট ওয়েট। অর্থাৎ হেপাটাইটিস, আর অপেক্ষা নয় এমন প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের আহ্বানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। দিবসটি ঘিরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার ও স্ক্রিনিংয়ের ক্যাম্প স্থাপন করাার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসাপাতালে সকাল ১০টায় শোভাযাত্রা, সচেতনতা কর্মসূচি ও হাসপাতালে আগতদের মধ্যে বিনামূল্যে হেপাটাইটিস রোগের পরীক্ষা ও পরামর্শ কর্মসূচি পালিত হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বেলা ২টায় হেপাটাইটিস-বিষয়ক সচেতনতামূলক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

এদিকে ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ বিকাল ৪টায় রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনের কনফারেন্স হলে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচিতে দিবসটি উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন তথ্যমতে, বাংলাদেশের শতকরা ৫ দশমিক ৫ ভাগ মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং শতকরা দশমিক ৬ ভাগ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বাহক। এদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশনে নানাবিধ জটিল লিভার রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সবমিলিয়ে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।

তবে, আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে দেশে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই জানেন না যে তার শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, হেপাটাইটিস একটি নীরব ঘাতক। এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। এজন্য রোগ নির্ণয়ে আরও জোর দিতে হবে। রোগী শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান জন্মদান বৃদ্ধি করতে হবে।

হেপাটাইটিস আক্রান্ত মা থেকে যেন নবজাতকে ভাইরাসটি সংক্রমিত না হয় সে জন্য বার্থডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে বাড়ির কাছের কমিউনিটি ক্লিনিককে কাজে লাগানোর প্রস্তাব চিকিৎসকদের।  

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য লক্ষণ দেখা যায় না।

হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ এবং বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান ১০টি কারণের একটি হলো লিভার সিরোসিস। লিভার ক্যান্সার বিশ্বে এবং বাংলাদেশে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। এই দুই ভাইরাসজনিত লিভার রোগের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষ এবং প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সচেতনতা খুবই বড় বিষয়। আমাদের দেশের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করেন।

হেপাটাইটিস কী, কীভাবে ছড়ায় বা এর চিকিৎসা কী— এসব বিষয়ে গ্রামের মানুষের কোনো ধারণা নেই। তাই তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা গবেষণায় দেখেছি, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হেপাটাইটিস। প্রায় ১৮ শতাংশের মতো এই হার। তাদের নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘লিভার রোগ প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি পান, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ও ভ্যাকসিন নেয়া নিশ্চিত করা জরুরি। লিভারে বি ভাইরাস, সি ভাইরাস এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হয়।

চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুদের আগেভাগে সুস্থ করতে পারলে তারা দীর্ঘায়ু হবে। বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালু হলে সেখানে লিভাররোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসা সেবার সাথে সাথে বিশ্বমানের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেরও ব্যবস্থা থাকবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘হেপাটাইটিসের চিকিৎসায় সরকার শেখ রাসেল, বারডেম ও শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে কয়েক কোটি টাকা অর্থ দিয়েছে। ভাইরাসটি মা থেকে শিশুকে সংক্রমিত করে। এজন্য কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যদি চিকিৎসা ও প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন দেয়া সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, এসব কাজের জন্য অর্থের পাশাপাশি ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। দেশে যত ব্লাড ব্যাংক আছে, সেখানে বিপুল সংখ্যক রক্ত সঞ্চালন হয়, সেখানে কী পরিমাণে ভাইরাসটি শনাক্ত হয় সেটি নির্ণয় করতে পারলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।