বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসের বাণিজ্য পরিসংখ্যান। একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অফিসের (অটেক্সা) সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ৮ শতাংশেরও বেশি।
অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ২৪৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ কম। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি কমেছে পোশাকের রপ্তানি পরিমাণ ও গড় ইউনিট মূল্য। আলোচ্য সময়ে রপ্তানি হওয়া পোশাকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি ৫ লাখ এসএমই (স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট), যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কম।
এছাড়া পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৩ দশমিক ০৫ ডলার থেকে কমে ২ দশমিক ৯৯ ডলারে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রাখলেও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে কম্বোডিয়ার রপ্তানি ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশবৃদ্ধি পেয়েছে। ভিয়েতনামও এ বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, চীন ও ভারত যখন নানা কারণে বাজার হারাচ্ছে, তখন সেই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। পোশাক খাতের রপ্তানি হ্রাসের জন্য উদ্যোক্তারা নানামুখী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণকে দায়ী করছেন।
এর মধ্যে রয়েছে- নীতিসহায়তার অভাব ও করের বোঝা: এনজেড অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউদ জামান খান জানান, ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলো বিনিয়োগ আকর্ষণে কর-সুবিধা দিচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে ২৭ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। এই উচ্চ করহার প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছে। জ্বালানি সংকট: শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দর নির্ধারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রণোদনা জটিলতা: বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অভিযোগ করেন, সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা যে পরিমাণ আমলাতান্ত্রিক হয়রানির শিকার হন, তা ব্যবসার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা: বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ মনে করেন, ইরান যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক বাজারে যে অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা পোশাকের ক্রয়াদেশ কার্যকরে দেরি ঘটিয়েছে।
পরিসংখ্যানের কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, কেবল মে মাসের হিসাব করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও এই বৃদ্ধিতেও পোশাকের ইউনিট মূল্য শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ কম ছিল। উদ্যোক্তারা মনে করেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন চিত্র হতে পারে, তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে এই নেতিবাচক প্রবণতা আমাদের পোশাক খাতের দুর্বলতাগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের আর কোনো বিকল্প নেই।
চীন থেকে অর্ডার সরিয়ে নেয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক কর কাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি দূর করতে হবে। পোশাক খাত আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। এই খাতকে গতিশীল রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ এবং দূরদর্শী নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি প্রয়োজন অন্যথায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল পথটিকে সংকীর্ণ করে তুলতে পারে।