তিন লাখ মানুষের তিন মিটার!

মহিউদ্দিন রাব্বানি প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২২, ০৯:১৪ পিএম

অবৈধ সংযোগ আর নানা অনিয়মে জর্জরিত বিদ্যুৎ খাত। রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে তিনটি। প্রায় ১০ হাজার ঘরেই জ্বলছে বিদ্যুতের আলো। তিন লাখ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে এ তিনটি মিটার থেকে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা এসব লাইন নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় নেতাদের জোগসাজশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ নানা সুবিধার অন্তরালে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। বস্তিবাসীরা বলছেন, অন্তত ৪০ জন এসব নিয়ন্ত্রণ করেন।

সরেজমিনে জানা যায়, গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ৯৭ একর জমিতে মহাখালীর কড়াইল বস্তি। নিচু জমি ভরাট করে ধীরে ধীরে সেখানে বস্তি গড়ে ওঠে। বস্তিটির মূল নাম কড়াইল হলেও নিয়ন্ত্রণকারীরা এই বস্তিকে ১০ ভাগ করেছেন।

সেগুলো হলো : কুমিল্লা পট্টি, বেলতলা বস্তি, গোডাউন বস্তি, পশ্চিমপাড়া ও পূর্বপাড়া বস্তি, উত্তরপাড়া বস্তি, বাইদাপাড়া বস্তি, মোসা বস্তি, বউবাজার ও এরশাদনগর বস্তি। 

জানা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ এই বস্তিতে তিন লাখের বেশি মানুষের বাস। বস্তিটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) দুটি ওয়ার্ডে বিভক্ত। ২০ নম্বর ওয়ার্ডে বাস করেন লক্ষাধিক মানুষ। এ ওয়ার্ডে বৈধভাবে তিনটি সংযোগ দেয়া হলেও সব ঘরেই রয়েছে বিদ্যুতের লাইন।

লাইট, ফ্যান, টিভি ও ফ্রিজ চালাতে দিতে হয় ৭০০ টাকা। বস্তিতে গড়ে উঠেছে ছোটখাটো অনেক কারখানা। শুধু দোকান নয়, বস্তিতে আছে ছোট শিল্প-কারখানাও। এসবের নেই কোনো বৈধতা। যেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও মিটার না থাকায় প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দিলেই চলে। প্রভাবশালীরা এসব লাইন নিয়ন্ত্রণ করায় বেশিরভাগ মানুষ তাদের নাম বলতে চায় না।

এক মিটারে সর্বোচ্চ কত ইউনিট খরচ করতে পারবে— এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা আমার সংবাদকে বলেন, একটি মিটারে ঠিক কত ইউনিট ব্যবহার করা যাবে— এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম  নেই। যার যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করা দোষের কিছু নয়। তবে যার নামে মিটার, তিনি অন্যের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি বা বিতরণের বৈধতা নেই।

ডিএনসিসির ২০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. নাসির জানান, করাইল বস্তিতে অবৈধ সংযোগ আছে— এটা অস্বীকার করা যাবে না। দিনে লাইন কেটে দিলেও রাতে হুক লাগিয়ে আবার বিদ্যুতের লাইন নিয়ে নেয়। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বারবার ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডকে (ডেসকো) চিঠি দিলেও তারা সাড়া দেয়নি।

তিনি গণমাধ্যমকে আরও জানান, ডেসকোকে কয়েকবার বলেছি আপনার আসুন, আমি দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করিয়ে দেব। কিন্তু তারা বলে আসব, আসতেছি, দেখব— এসব বলে রঙতামাশা করছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী আর বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণেই অবৈধ সংযোগ বন্ধ হচ্ছে না।

কড়াইল বেলতলা বস্তির বাসিন্দা রবিন হোসেন বলেন, এক মাসে প্রতিটি লাইটের জন্য ১০০ টাকা, ফ্যানের জন্য ১০০ টাকা, টেলিভিশনের জন্য ২০০ টাকা, ফ্রিজের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হয়। গ্যাসের প্রতিটি চুলার জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। আর বিদ্যুতের পেছনে প্রতিটি পরিবারকে গড়ে ৪০০ টাকা করে গুনতে হয়। এ খাত থেকে সিন্ডিকেট আদায় করে প্রায় তিন কোটি টাকা। আর ঘরভাড়া বাবদ প্রতিটি ঘর থেকে দেড় হাজার টাকা করে আদায় করা হয়।