ওজনে কারসাজি সুরাহা নেই

মহিউদ্দিন রাব্বানি প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২২, ০১:১৪ এএম

পেট্রোলপাম্পগুলোতে পরিমাণে জ্বালানি তেল কম দেয়ার অভিযোগ করছে ক্রেতা সাধারণ। আর এ অভিযোগ বেশ পুরোনোও বটে। তবে নেই কোনো প্রতিকার। পেট্রোলপাম্পের নানা অনিয়মের অভিযোগে অভিযান সীমিত হলেও বেরিয়ে আসছে গুরুতর অপরাধ। তার মধ্যে সব চেয়ে বেশি অনিয়মের প্রমাণ মিলছে ওজনে ক্রেতা ঠকানো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় ৬০ শতাংশ পেট্রোলপাম্পেই পরিমাণে কম দেয়ার ঘটনা ঘটছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, দেশের পেট্রোলপাম্পগুলো আগে তেলে ব্যাপক পরিমাণ ভেজাল দিতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। আর এ কারণে এখন আর ভেজাল দিতে পারে না পাম্পমালিকরা।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থা আমাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে। উনারা যেসব ওজন মাপার মেশিন নিয়ে আসেন সেগুলোর সঙ্গে আমাদেরগুলোর অনেক তফাৎ। এ কারণে পরিমাপ এক হয় না। আমরা আমাদের পরিমাপক মেশিন অনুযায়ী ঠিকই দিচ্ছি।

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা শিমুল আমার সংবাদকে বলেন, পেট্রোলপাম্পগুলোতে পরিমাণে কম দেয়ার অভিযোগ বেশ পুরোনো। যারা অভিযানে আসে তারা এক রকম কথা বলে, আর পেট্রোলপাম্প মালিকরা বলেন অন্য কথা। তারা পরস্পর দোষারোপ করে যাচ্ছেন।

জ্বালানি বিভাগের দেয়া এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত আগস্ট মাসে দেশের ৭৭টি পেট্রোলপাম্পে অভিযান পরিচালনা করে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। এর মধ্যে ৪৫টি পেট্রোলপাম্পেই পরিমাপে গরমিল পাওয়া গেছে। সেই হিসাব বলছে, দেশের ৫৮ ভাগ পেট্রোলপাম্পই পরিমাণে কম দেয়।

তবে মালিকপক্ষ বলছে, পরিমাপক ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় এ ধরনের গরমিল পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি সমাধানে একসঙ্গে বসারও অনুরোধ তাদের। এর আগে জ্বালানি বিভাগে জমা দেয়া আরেকটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ডিসেম্বরে ৪৬টি পেট্রোলপাম্পে অভিযান চালিয়ে ৩৩টিতেই অনিয়মের প্রমাণ মেলেছে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর পরিচালিত অভিযানে। বিশেষ প্রক্রিয়ায় মিটার টেম্পারিং করে বেশিরভাগ পেট্রোলপাম্প ওজনে কম দেয় বলে জানা গেছে।

বিষয়টি সবাই জানলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সামান্য জরিমানা দিয়েই আবার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে পেট্রোলপাম্পগুলো।  জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলো আগস্ট মাসে মোট ৭৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ৩৪টি, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২২টি এবং যমুনা অয়েল কোম্পানির ২১টি পেট্রোলপাম্প ছিল। এর মধ্যে পদ্মার ২৩টি, মেঘনার ১২টি এবং যমুনার ১০টির বিরুদ্ধে পরিমাণে কম দেয়াসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান অভিযোগই ছিল পরিমাণে কম দেয়া।

একটি তেল বিপণন কোম্পানির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন, সরকারি ও আর্মি ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের কিছু পেট্রোলপাম্প রয়েছে, এগুলোতে সঠিক পরিমাপে তেল দেয়া হয়। এখান থেকে যারা তেল কেনেন, তাদের ওজন এবং তেলের মান নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। কিন্তু এর বাইরে সারা দেশে যে পেট্রোলপাম্প রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই পরিমাণে কম দেয়। কী পরিমাণ কম দেয়, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতি পাঁচ লিটারে অন্তত ২০০ মিলিলিটার কম দেয়। নিয়মিত যাদের দেখার কথা, তারাও বিষয়টি দেখছেন না।

এর আগে ওজন কম দেয়ার কারণে পদ্মার ৯টি, মেঘনার সাতটি এবং যমুনার ১১টি ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা করা হয়েছে। ক্যালিব্রেশন মেয়াদ উত্তীর্ণের জন্য পদ্মার দুটি এবং যমুনার তিনটি ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা করা হয়। ডিসপেন্সিং ইউনিটে ত্রুটি থাকায় পদ্মার একটি ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা করা হয়। তবে, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সময় পদ্মার পাঁচটি, মেঘনার দুটি এবং যমুনার ছয়টি ফিলিং স্টেশনে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেট্রোলপাম্পে পরিমাণে কম দেয়াসহ নানা অভিযোগে জ্বালানি বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ করে। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে সারা দেশের পেট্রোলপাম্পে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয় না। মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হলে বড় রকমের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, সাধারণত সারা দেশের পেট্রোলপাম্পে কতগুলো অভিযান পরিচালিত হলো তা একমাস পরপর জেলা প্রশাসন থেকে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়। সেই হিসাব ধরে অর্ধেকের বেশি পেট্রোলপাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, পেট্রোলপাম্পে যেসব পরিমাপক রয়েছে, এর মধ্যে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকায় কিছু মেশিন পাওয়া যায়। অন্যদিকে আমেরিকা থেকে প্রতিটি ১০ লাখ টাকায় যেসব মেশিন আমদানি করা হয়, সেগুলো টেম্পারিং করা যায় না। আবার দামি এই মেশিন ব্যবহারে পেট্রোলপাম্প মালিকদের বাধ্যও করতে পারে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। কারণ, দুই ধরনের মেশিন একই কাজ করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমুল হক বলেন, পাম্পে অনিয়মের নামে ঢালাওভাবে অভিযান চালানো হয়। সেখানে বিপিসির একজন প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও তাদের না নিয়ে শুধু মাজিস্ট্রেট গিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। এটা পাম্প মালিকদের ওপর জুলুম।

তিনি আরও বলেন, ওজনে কম দেয়া এবং ভেজাল তেলের বিষয়ে নানা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে সরকারের সঙ্গে আমরা বহুবার সভা করেছি। সরকারের কাছে একটি মনিটরিং টিম করার প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কোনো সমাধান আমরা পাইনি। তিনি আরও বলেন, অভিযানের মাধ্যমে অনেকের জরিমানা হয়, অনেকের ডিলারশিপ সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিষয়টির কোনো সমাধান আসলেই হয়নি।  

সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব হোসেন জ্বালানি তেল পরিমাপে কম দেয়া এবং ভেজাল প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। এদিকে তেল বিপণন কোম্পানিগুলো থেকে এসব বিষয় পর্যবেক্ষণে কর্মকর্তা রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এসব কাজ হয়ে থাকে। তারা নিয়মিত মনিটরিং করলে এটি হওয়ার কথা নয়।