পাঁচটি প্রকাশনা জমা দিয়ে নিয়েছেন অধ্যাপক পদে পদোন্নতি। কাজ করছেন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। অথচ এসব প্রকাশনা নিজের নয়, অন্যের! পূর্বে প্রকাশিত বিদেশি প্রকাশনার হুবহু নকল। এফসিপিএস (ফেলোশিপ অব কলেজ অ্যান্ড ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন) পাস না করেও প্রাইভেট চেম্বারের সাইনবোর্ড, ভিজিটিং কার্ড এবং প্রেসক্রিপশন প্যাডে এই ডিগ্রি লেখেন। এমন অভিনব মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জাকির আহমেদ শাহীনের বিরুদ্ধে। এছাড়া প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ জালিয়াতির মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য মেডিকেল জার্নালে অন্তত পাঁচটি প্রকাশনা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ডা. জাকির আহমেদ শাহীন অন্যের প্রকাশিত প্রকাশনাকে নিজে নকল করেছেন। বিভাগীয় ও প্রকাশনা রিভিউ কমিটির প্রধান হিসেবে নিজেই করেছেন এসব প্রকাশনার যাচাই-বাছাই, দিয়েছেন অনুমোদন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব নকল প্রকাশনা জমা দিয়ে তিনি ২০১৮ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নেন। সেখানে তিনি লেখেন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেন্টাল বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য তার প্রকাশনা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার প্রকাশিত আইডিয়াল ওক্লুজাল প্যাটার্নস ফর কমপ্লিট ডেন্টুরেস প্রকাশনাটি জার্নাল অব ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ২০ নম্বর ভলিউমের দুই নম্বরে ২৭ থেকে ২৯ পৃষ্ঠায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এ লেখাটি জাপানের নিহো ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ডেন্টিস্ট্রিতে কর্মরত মাসাহিরো কয়ামা প্রোস্ট্রেট ডেন্ট জার্নালের ১৯৭৬ সালের জুনের ৩৫ ভলিউমের ৬ নম্বরে প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে ওক্লুজাল কনসিডারেশন ইন এস্থেটিক টুথ পজিশনিং প্রকাশনাটি ডা. শাহীন সিটি ডেন্টাল কলেজ জার্নালে ২০১০ সালে প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করেন। অথচ এই প্রকাশনাটিও জিওরজি এ মুরেলের ১৯৭০ সালের মে মাসে জে. প্রস. ডেন্ট নামের ম্যাগাজিনের ২৩ নম্বর ভলিউমের ৫ নম্বর তালিকায় প্রকাশিত হয়।
দ্য রুল অব শর্টেন্ড ডেন্টাল অ্যারেচ কনসেপ্ট ইন দ্য ম্যানেজমেন্ট অব রিডিউসড ডেন্টিয়েশন শীর্ষক শিরোনামের অপর প্রকাশনাটি জার্নাল অব ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২০১৫ সালের মার্চের ২১ নম্বর ভলিউমের প্রথমে ৬১ থেকে ৬৪ পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেন। অথচ এ প্রকাশনাটিও তার নিজের নয়। লেখাটি পি এফ অ্যালেন ডি রাইটার ও এন. উইলসন ব্রিটিশ ডেন্টাল জার্নালে ১৯৯৫ সালের ১১ নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশ করেন। লিঙ্গুয়ালাইজ ওকোলেশন ইন কমপ্লিট ডেন্টরি শীর্ষক প্রকাশনাটি তিনি বাংলাদেশ ডেন্টাল জার্নালে ২০০৫ সালে ২১ নম্বর ভলিউমে ১২ নম্বরে ১৩ থেকে ১৬ পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেন।
দ্য ইফেক্ট অব অ্যান্টিরিউ প্রোস্টারিওর ইনক্লুয়েশন অব দ্য ওক্লুজাল প্ল্যান অন বিটিং ফোর্স (রিভিউ) প্রকাশনাটি জার্নাল অব সিটি ডেন্টাল কলেজের ভলিউম ২-এর দুই নম্বর তালিকার ৮ থেকে ১১ পৃষ্ঠায় ২০০৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশ করেন। অথচ এই প্রকাশনাটি জাপানের হিরোশিমা ইউনিভার্সিটি, স্কুল অব ডেন্টিস্ট্রির হিডেকি ওকানি দ্য জার্নাল অব প্রোস্ট্রেস্থিক ডেন্টিস্ট্রিতে ১৯৭৯ সালের নভেম্বর সংখ্যার ৪২ নম্বর ভলিউমে ৫ নম্বর তালিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রকাশনাকে হুবহু নকল করে নিজের নামে প্রকাশ করে এই চিকিৎসক পদোন্নতি নেন।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক ডা. জাকির আহমেদ শাহীন আমার সংবাদকে বলেন, পদোন্নতির জন্য জমা দেয়া সবগুলো পাবলিকেশন অরিজিনাল। পাবলিকেশনে কোনো ভুল বা নকল থাকলে সেটা রিভিউ কমিটির দেখার কথা। তারা তো আমার পাবলিকেশন রিভিউ করে কপি কিছু পায়নি। আমার এমএস (বিডি)-এর সময়ে বিএসএমএমইউতে জমা দেয়া থিসিস থেকে এই পাবলিকেশন করেছি। পাবলিকেশন বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তাদের রিভিউ কমিটিকে জিজ্ঞেস করতে বলুন। তাহলে কেন এই অভিযোগ তোলা হয়েছে? এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে কেউ হয়তো শয়তানি করে আমার বিষয়ে অভিযোগ জমা দিয়েছে। তবে আমার পাবলিকেশন অরিজিনাল।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ডা. শাহীন তার ভিজিটিং কার্ডে নিজের নামের পাশে ‘এফসিপিএস’ ডিগ্রি ব্যবহার করেন। তবে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনসের ফেলোস ডাইরেক্টরিতে তার নাম পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এফসিপিএস পাস না করেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই ডিগ্রি ব্যবহার করে আসছেন; যা বেআইনি এবং প্রতারণার শামিল।
এ প্রসঙ্গে ডা. জাকির বলেন, আমি কোথাও এফসিপিএস ডিগ্রি ব্যবহার করি না। প্রাইভেট চেম্বারে ও ভিজিটিং কার্ডে এফসিপিএস ডিগ্রি ব্যবহার করা হচ্ছে জানালে তিনি বলেন, আমি কোথাও ব্যবহার করছি না। তবে এই প্রতিবেদকের কাছে ‘এফসিপিএস’ ডিগ্রি লেখা তার কার্ড রয়েছে। এ ছাড়া ডা. শাহীনের বিরুদ্ধে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে গত ১৭ এপ্রিল ডেন্টাল ইউনিটের ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকারও অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মো. শামসুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ডা. শাহীনের বিষয়ে তার কাছেও অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। তিনি এই প্রতিষ্ঠানে যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। এক্ষেত্রে তিনি কোনো মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।