শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে বিভিন্ন মেলার আয়োজন চলছেই। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে মেলা, যাত্রা, সার্কাস কিংবা বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যাবে না মর্মে ২০০৯ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে মেলা, যাত্রা, সার্কাস ও বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যে কারণে মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা উপেক্ষা করেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে এখনো এসব আয়োজন চলমান রয়েছে। খোদ ঢাকার দোহারের একটি স্কুল সংলগ্ন মাঠেই চলামন এমন মেলা। এনাম মেডিকেল সংলগ্ন সাভার কলেজ মাঠেও একইভাবে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
জানা গেছে, ঢাকার দোহারে কবী নজরুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন শেরেবাংলা মাঠে তাঁত-বস্ত্রমেলার আয়োজন করা হয়েছে, যা চলমান রয়েছে। সাভার কলেজ মাঠেও একইভাবে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও গত বছরের জুনে পৃথক আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে এসব মেলা আয়োজন নিষিদ্ধ করে। দোহারের মেলার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলম বলেন, ডিসি অফিস থেকে তাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে। ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের মেলা পরিচালনার অনুমতি রয়েছে। তাদের কাছে অনুমতির কাগজও রয়েছে। সাভার কলেজে মেলার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাজহারুল ইসলাম বলেন, মেলা এখনো শুরু হয়নি। তারা অনুমতি চেয়েছে ডিসি অফিসে। এখনো রিপোর্ট পাঠানো হয়নি। রিপোর্ট পাঠানোর পর ডিসি অফিস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ ছাড়া এসব মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জেলা থেকেও পাওয়া যাচ্ছে অনিয়মের খবর। সূত্র বলছে, এসব মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা নেই এমন প্রতিষ্ঠানও পাচ্ছে জেলা প্রশাসনের অনুমতি। যেকোনো কম্পিউটার দোকান থেকে নিজেদের মনগড়া নাম দিয়ে প্যাড তৈরি করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুমতি চেয়ে আবেদন করছে বেনামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও। যাদের ট্রেড লাইসেন্স, টিও লাইসেন্স বা লিমিটেড কোম্পানির কোনো বৈধতাই নেই। আবার জেলা প্রশাসনও এসব তদন্ত না করেই অনমুতি দিচ্ছে। এতে বঞ্চিত হচ্ছে এসব মেলা আয়োজনের যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোও।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া একটি লিফলেটে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার হাউসিং সি ব্লক, ঈদগাহ সংলগ্ন প্লে-গ্রাউন্ড মাঠে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয় কুষ্টিয়া শিল্প ও বাণিজ্যমেলা-২০২৩। যার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে, মনিপুরী তাঁতশিল্প ও জামদানি-বেনারশি কল্যাণ ফাউন্ডেশন। তাদের মেলা আয়োজনের বৈধতা আছে কি-না এবং সরকারের কোষাগারে দেয়া অর্থসহ সব শর্ত পূরণ করেছে কি-না এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তিনি দেখবেন। তবে তিনি জানেন কি-না সেখানে মেলা হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি মন্তব্য না করেই বলেছেন, আমি দেখব। স্থানও জানেন না তিনি। জানতে চাইলে পুলিশ সুপার খাইরুল আলম বলেন, মেলা চলছে না, ডিসি দপ্তরে অনুমতির জন্য আবেদন করেছে। এখনো চালু হয়নি। তবে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে এই মেলা শুরু হবে। যদিও আয়োজকদের মেলা আয়োজনের বৈধতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
নোয়াখালীতেও চলছে এমন মেলা। জেলার চৌমুহনী চৌরাস্তা হেলিপেড মাঠের ওই মেলার আয়োজকদের বৈধতা নিয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, সেখানে মেলা প্রায় শেষের দিকে। শেষও হয়ে যেতে পারে। বৈধতার বিষয়ে তিনি বলেন, আয়োজকরা সরকারি কোষাগারে যে পরিমাণ অর্থ জমা দেয়ার কথা তা দিয়েছেন এবং সব শর্ত পূরণ করায় আমরা তাদের অনুমতি দিয়েছি। একইভাবে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা মাঠেও মেলা চলমান রয়েছে। জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হাসান বলেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা চলছে। এখানকার প্রেস ক্লাব থেকে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। তবে তাদের মেলা আয়োজনের বৈধতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমার জানা নেই। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অনুমতি নিয়েছেন তারা। জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, দেখতে হবে কী শর্ত দেয়া হয়েছে এবং তারা সব শর্ত পূরণ করেছে কি-না। না দেখে বলতে পারব না। যদিও অনুমতি আমরাই দিয়েছি।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেলা শুরু হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। অনুমতিও দেয়া হয়েছে। চামেলি ট্রেডার্সের এসব মেলা আয়োজনের বৈধতা আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া হয়েছে তার নাম মনে নেই, জেনে বলতে বলতে হবে। তবে যদি তারা মেলা আয়োজনের সব শর্ত পূরণ না করে থাকে তাহলে তাদের অনুমতি দেয়া হবে না। একইভাবে সিলেটের বিয়ানীবাজার, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ ধরনের মেলার আয়োজন চলছেই। কোথাও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আবার কোথাও এসব মেলা আয়োজনে দক্ষ ও বৈধ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে লাইসেন্সবিহীন বেনামি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হচ্ছে মেলা আয়োজনের অনুমতি। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জেলা প্রশাসন তদন্ত করে অনুমতি দিলেই বঞ্চিত হবে না লাইসেন্সধারী বৈধ প্রতিষ্ঠান— এমনটিই বলছেন এ ধরনের মেলা আয়োজনের সাথে জড়িতরা।