পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাবলিক টয়লেট বাড়াতে হবে
—ড. আদিল মুহাম্মদ খান
নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ, আইপিডি
ভিক্টর ক্লাসিক বাসের হেলপার আশিক। বাস থেকে নেমেই বাহাদুর শাহ পার্কের সাইডে লোকালয়ে থাকা উঁচু জায়গায় মূত্রত্যাগ করছেন তিনি। একটু পাশেই পার্কের সঙ্গে রয়েছে পাবলিক টয়লেট। পাবলিক টয়লেট থাকতে কেন এখানে নোংরা-দুর্গন্ধ করে প্র্রস্রাব করলেন জানতে চাইলে এই বাস হেলপার বলেন, ওই যে দেখু, এক চাচাও প্রস্রাব করছেন। আমিও তার দেখাদেখি করলাম। আবার এখানে সবাই প্রস্রাব করতে করতে নোংরা বানিয়ে ফেলছে, তাই আমরাও সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি— বললেন এই হেলপার।
সবাই করলে আপনিও করবেন— এমন প্রশ্নে আশিক বলেন, যা-ও পাবলিক টয়লেটে যাব, সেখানে বেশি টাকা নেয়। এজন্য এখানেই সহজে করে ফেলে মানুষ। বাস্তবতাও তা-ই বলছে, পাবলিক টয়লেট রেখেই রাজধানীতে যেখানে-সেখানে মল-মূত্র ত্যাগের জন্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া নতুন কিছু নয়। আবার সিটির জনসংখ্যা অনুযায়ী পাবলিক টয়লেটের পরিমাণ অনেক কম। এ কারণেও মানুষ পাবলিক টয়লেট রেখে রাস্তাঘাটে-লোকালয়ে কাজ সেরে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং মনে হচ্ছে এখন পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে তাদের আগ্রহ নেই— বলছে সচেতন নাগরিক সমাজ। সরেজমিনে রাজধানীতে দেখা গেছে, এয়ারপোর্ট, মিরপুর, ফার্মগেট, সদরঘাট, ভিক্টোরিয়া পার্ক, গুলিস্তানসহ উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বেশ কয়েকটি জনবহুল এলাকায় অল্প কিছু পাবলিক টয়লেট আছে। তার মধ্যে অল্প কিছুর অবস্থা ভালো। অধিকাংশেরই ভেতরে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। কয়েকটিতে রয়েছে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। কিন্তু অধিকাংশ টয়লেটের পরিবেশ নোংরা, দুর্গন্ধ, যত্রতত্র মেঝের ওপর পানি, দেয়ালজুড়ে লেখা অশ্লীল কথা, পানি ব্যবহারের পাত্র ভাঙা, দরজা ভাঙা। নারী-পুরুষের জন্য নেই আলাদা টয়লেট। বাধ্য হয়ে কমন টয়লেট ব্যবহার করছেন নারীরা।
সিটি কর্পোরেশনের তথ্য বলছে, ঢাকা দক্ষিণ (ডিএসসিসি) ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা রয়েছে ১৩৭টি; যেখানে জনসংখ্যা আড়াই কোটিরও বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় টয়লেটের সংখ্যা অপ্রতুল বললেই চলে। এত বিশাল জনসংখ্যার শহরে সামান্য এ কটি টয়লেট কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়— বলছেন নিত্যপ্রয়োজন হওয়া ব্যবহারকারীরা। আবার অনেক জায়গায় দেখা গেছে পরিত্যক্ত ও ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে রয়েছে কিছু পাবলিক টয়লেট। কোথাও কোথাও নির্ধারিত ফি বেশি হওয়ায় পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে কোনো আগ্রহ নেই মানুষের। দেখা যাচ্ছে, আশেপাশে থাকা টয়লেট বাদ দিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুটপাতে বা লোকালয়ে মলমূত্র ত্যাগ করছেন অনেকেই। যাতে পরিবেশ নষ্টসহ রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে পুরো শহরজুড়ে। তাদের দাবি, পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে অতিরিক্ত ফি নিয়ে থাকেন সেখানকার নিয়োজিত লোকেরা। আবার ইজারা নিয়ে এসব পাবলিক টয়লেট চালানোর কারণে টাকা বেশি নিতে হয়— বলছেন সিটির বিভিন্ন পাবলিক টয়লেটের ইজারাদার। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না টয়লেটগুলো। নেই পর্যাপ্ত সাবান ও হ্যান্ডওয়াশের ব্যবস্থা। দেখা গেছে, এ নিয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থাপনাও নেই সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের। যদিও প্রতিবছর এ খাতে নির্ধারিত পরিমাণ বাজেট হলেও তেমন কোনো পাবলিক টয়লেট নির্মাণের নামগন্ধ নেই। এমনকি যেসব টয়লেট পরিত্যক্ত এবং ব্যবহার-অযোগ্য, সেগুলো মেরামতেও নেই কোনো পদক্ষেপ। বেসরকারি সংস্থা ওয়াটার এইডের তথ্যমতে, রাজধানীতে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বসবাসরত ও বহিরাগত মিলিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিদিন বাইরে চলাচল করে। কিন্তু বাইরে চলাচল করা মানুষের প্রস্রাব-পায়খানার জন্য পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নেই। ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ প্রতিদিন বাইরে যাতায়াত করে থাকে। এদের মধ্যে ৫০ ভাগ ভাসমান মানুষ। প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। শহরের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য রয়েছে একটি পাবলিক টয়লেট। শহরের মোট ভাসমান মানুষ বিবেচনায় প্রায় ৭৫ হাজার জনের জন্য রয়েছে একটি টয়লেট। ঢাকায় মোট ১৩৭টি সচল পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৬৭ এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৭০টি।
দুই সিটি কর্পোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ৬৭টি সচল পাবলিক টয়লেট আছে। এর মধ্যে ৬৪টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরও নতুন তিনটি স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে, যা শিগগিরই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। উত্তরের অধিকাংশ টয়লেটে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলেও দক্ষিণের অধিকাংশগুলোয় তা নেই। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীনে সর্বমোট পাবলিক টয়লেট আছে ৯০টি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক বন্ধ হয়ে আছে। সচল আছে ৫০টির মতো। এগুলো আবার সিটি কর্পোরেশন বেসরকারি পর্যায়ে ইজারা দিয়ে পরিচালনা করছে। সরকারি নজরদারি না থাকায় ইজারাদাররা বেশি টাকা আয়ের জন্য পাবলিক টয়লেটের পানি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করছে। অনেকেই আবার টয়লেটগুলোকে মাদক ব্যবসায়ীদের লেনদেনের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে।
এ বিষয়ে দুই সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম দৈনিক আমার সংবাদ প্রতিবেদককে জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছেরকে ফোন দিতে বলেন। পরবর্তীতে তাকে (জনসংযোগ কর্মকর্তা) বারবার ফোন দিলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে এ নিয়ে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের উত্তর সিটিতে বর্তমানে মোট পাবলিক টয়লেট সংখ্যা ৬৭টি, যার ৬৪টি সম্পন্ন হয়েছে। এগুলো বিভিন্ন এনজিও সংস্থার মাধ্যমে করা হয়েছে এবং পাবলিক টয়লেটগুলো আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
মকবুল হোসাইন বলেন, বাকি টয়লেটগুলো পরিচালনার দায়িত্বসমূহ অনুমোদনের বিষয়াদি প্রক্রিয়াধীন। আশা করছি খুব দ্রুতই সেগুলো সম্পন্ন হয়ে যাবে। রাজধানী শহরে পাবলিক টয়লেট সংকট ও করণীয় সম্পর্কে কথা হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সঙ্গে। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, দুই সিটি কর্পোরেশন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ আরও বাড়াতে হবে। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী খুব বড় পরিসরে পাবলিক টয়লেট করতে না পারলেও ছোট পরিসরে পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা জরুরি। এজন্য সিটি কর্পোরেশনকে জমি খুঁজে বের করতে হবে এবং এর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তিনি বলেন, একটি আধুনিক শহর গড়ার অন্যতম অনুষঙ্গ পাবলিক টয়লেট। তিনি আরও বলেন, পাবলিক টয়লেট সংকট না কমালে ঢাকা শহর যে বসবাস-অযোগ্য, তা দিনে দিনে আরও বাড়বে।