তিন বছর আগে বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে যান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের। দেশটির ফাহিল জেলার একটি দোকানে চাকরি করছেন। মাস শেষে দোকান মালিক থেকে যে বেতন পান তা দিয়েই চলে দেশে থাকা তার পাঁচ সদস্যের পরিবার। রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা মেনেই পরিবারের কাছে ব্যাংকের মাধ্যমে বেতনের টাকা পাঠান তিনি। প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই কখনোই হুন্ডি বা সরকার নিষিদ্ধ অন্য পকানো মাধ্যমে টাকা পাঠাননি এই রেমিট্যান্সযোদ্ধা। বৈধ প্রক্রিয়ায় দেশে টাকা পাঠানোর বিষয়ে সচেতন আব্দুল কাদের সরকারের নির্দেশনা ও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের কথা চিন্তা করেই ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতেন দেশে। এর জন্য দ্বারস্থ হয়েছিলেন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আমান এক্সচেঞ্জের। কুয়েতে ভারতীয় ওই এক্সচেঞ্জের ফাহিল-২ শাখার মাধ্যমে একাধিকবার দেশে টাকাও পাঠিয়েছেন তিনি।
আর ওই দেশ থেকে বাংলাদেশে বৈধভাবে (ব্যাংকিং চ্যানেলে) টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রবাসীকেই দেশটির সরকারের দেয়া বৈধতার সনদবাধ্যতামূলক জমা দিতে হয়। নিয়মের খাতিরে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনিও তার সিভিল আইডি কার্ড জমা দিয়েছিলেন আমান এক্সচেঞ্জে। আর এতেই ঘটেছে বিপত্তি। প্রবাসীদের অজান্তেই এমন বিপত্তির ঘটনা ঘটছে শতশত। সম্প্রতি একটি ভুল লেনদেনকে কেন্দ্র করেই প্রবাসীদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়। গেল ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন আগে পারিবারিক লেনদেন, মায়ের চিকিৎসা ও ঈদের খরচ পাঠান আব্দুল কাদের। লেনদেনের সম্পর্ক থাকায় স্বাভাবিকভাবেই এবারও টাকা জমা দেন আমান এক্সচেঞ্জের ফাহিল-২ শাখায়। টাকা পাঠানোর তিন দিন পর ব্যাংকে গিয়ে তার স্ত্রী জানতে পারেন, তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাই ঢুকেনি।
তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানার পর আমান এক্সচেঞ্জে যোগাযোগ করেন আব্দুল কাদের। লেনদেনের তথ্য যাচাই-বাচাই করে আমান এক্সচেঞ্জ তাকে জানায়, ঢাকার নবাবগঞ্জ থানা এলাকার শিকাড়ীপাড়া বাজারস্থ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায় টাকা জমা হয়েছে। অথচ টাকা জমা হওয়ার কথা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাশিনগর বাজারস্থ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায়। লেনদেনের এই প্রক্রিয়ায় ভুলটা কোথায়— তার এমন প্রশ্নে আমান এক্সচেঞ্জ জানায়, দুই অ্যাকাউন্টধারীর নামই এক। দুজনের নামই আফরোজা আক্তার। যদিও অ্যাকাউন্ট নম্বর ভিন্ন।
একাধিক কুয়েত প্রবাসী আমার সংবাদকে বলছেন, দেশে টাকা পাঠাতে হলে সিভিল আইডির ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কোনো প্রবাসীর সিভিল আইডি না থাকলে তিনি অন্যের সিভিল আইডি ব্যবহার করে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। দেশটিতে প্রবাসীদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি সিভিল আইডির মাধ্যমে লেনদেনের সীমাবদ্ধতাও জারি রেখেছে কুয়েত সরকার। যে কারণে একান্তই নিজস্ব লোক ব্যতীত এবং বড় ধরনের বিপদ ছাড়া লেনদেনের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে সাধারণত কেউ কারও আইডি ব্যবহারের অনুমতিও দেন না। আবার যাদের সিভিল আইডি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে তারাও ওই আইডি ব্যবহার করে লেনদেন করতে পারেন না। এমন অসংখ্য প্রবাসী রয়েছেন দেশটিতে, যারা নিয়মের ধরাবাঁধায় এসব সুবিধা পাচ্ছেন না। তারাই টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে হুন্ডি বা অন্যান্য মাধ্যমের আশ্রয় নিচ্ছেন। অন্যদিকে ওইসব গ্রাহক টানতে এবং মুনাফা বাড়ানোর লোভে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব প্রবাসীর টাকা পাঠাচ্ছেন এক্সচেঞ্জ কার্যালয়ে জমা রাখা বৈধ প্রবাসীদের সিভিল আইডি ব্যবহার করে। যা সরাসরি প্রতারণাও বটে।
আব্দুল কাদেরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। আমান এক্সচেঞ্জের প্রতারণায় তার এক লাখ ৭০ হাজার টাকা চলে যায় ভুল অ্যাকাউন্টে। জানা গেছে, আমান এক্সচেঞ্জের সার্ভারে সংরক্ষিত আব্দুল কাদেরের সিভিল আইডি নম্বরের অধীনে তার স্ত্রীর নামের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করা আছে। তিনি দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সিভিল আইডির নম্বর এবং তার স্ত্রীর তিনটি ব্যাংকের যেকোনো একটি বললেই টাকা পাঠিয়ে দেয় আমান এক্সচেঞ্জ। অতীতে এমনটি হলেও এবার ঈদুল ফিতরের সময় পাঠানো টাকা তার স্ত্রী যথাসময়ে না পাওয়ায় ত্রুটি খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, আব্দুল কাদেরের সিভিল আইডির অধীনে তার অজান্তেই নতুন করে আরও একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করা হয়েছে। যেখানে তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকার কথা সেখানে চারটি অ্যাকাউন্ট কীভাবে যুক্ত হলো এই প্রশ্নের উত্তরও এখনো জানায়নি আমান এক্সচেঞ্জ। যেখানে একজনের সিভিল আইডি ব্যবহার করে অন্য জনের টাকা পাঠানোর কোনো সুযোগই নেই, সেখানে কাদেরের আইডি ব্যবহার করে ইয়ারদ্দিন নামে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার শিকাড়িপাড়া এলাকার ওই কুয়েত প্রবাসীর স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে টাকা গেল কীভাবে এমন প্রশ্ন কাদেরসহ অন্যান্য প্রবাসীদের। ওই টাকা এখন পর্যন্ত আটকে রেখেছেন ইয়ারদ্দিনের স্ত্রী আফরোজা আক্তার। টাকা ফেরত চেয়ে আমান এক্সচেঞ্জের ম্যানেজারের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন আব্দুল কাদের।
এখন পর্যন্ত সেই অভিযোগের কোনো সমাধানই করতে পারেনি আমান এক্সচেঞ্জ, বরং তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানায় কাদেরকে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভুল লেনদেনের জন্য আমান এক্সচেঞ্জ ইসলামী ব্যাংককে চিঠি দিতে পারে। রহস্যজনক কারণে তাও দেয়নি। এ বিষয়ে আমান এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে হোয়োটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জারেও অভিযোগের কপি পাঠিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও উত্তর দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক বাড়ানোর কারসাজি আর মুনাফার এমন লোভে কমতে পারে রেমিট্যান্সপ্রবাহ, বলছেন কুয়েতপ্রবাসীরা। এক্সচেঞ্জের এমন ইচ্ছাকৃত ভুলের ভোগান্তি এড়াতে বৈধ প্রবাসীরাও হুন্ডিতে ঝুঁকতে পারে— এমন আশঙ্কাও করছেন তারা। রেমিট্যান্সপ্রবাহের সঙ্গেও প্রবাসীদের বক্তব্যের মিল রয়েছে অনেকটা। যেখানে গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে কুয়েত থেকে আসা রেমিট্যান্স পরিমাণ ছিল ১৮৮ কোটি ডলার সেখানে ২১-২২ অর্থবছরে তা কমে গিয়ে আসে ১৬৮ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক অর্থবছরে ২০ কোটি ডলার কম। এ নিয়ে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথা বলবে কি-না কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন— এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও মিশনের কেউই ফোন ধরেননি।
তবে প্রবাসীদের অনেকেই বলছেন, কুয়েতে অনেক এক্সচেঞ্জ রয়েছে যারা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে প্রবাসীদের বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য আল মোল্লা এক্সচেঞ্জ সম্প্রতি ড্রয়ের মাধ্যমে সাত বাংলাদেশিকে পুরস্কৃতও করে। ওই এক্সচেঞ্জের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার আবদুল বাতেন বলেন, মোল্লা এক্সচেঞ্জ থেকে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি টাকা পাঠিয়ে থাকেন তাদের জন্য বিনামূল্যে এক হাজার দিনার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা) ইন্স্যুরেন্স রয়েছে। এই এক্সচেঞ্জ থেকে টাকা পাঠানোর পর এক মাসের মধ্যে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি গ্রাহকের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ওই মৃতের পরিবারকে ইন্স্যুরেন্সের এই টাকা দেয়া হয়।