শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মহলকে তৎপর হতে হবে
—রাশেদা কে চৌধুরী
সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার
অর্ধবছর পরই পুরো ব্যাপারটি বুঝতে পারবে সবাই
—প্রফেসর মো. মশিউজ্জামান
সদস্য, এনসিটিবি
ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এনসিটিবি। শিক্ষকদের মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তকে নানা ভুল, বছরের প্রথম থেকে মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে ধোঁয়াশা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে নতুন শিক্ষাক্রমকে। ফলে শিক্ষাবর্ষের চার মাস পরও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখনো শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। সন্তানদের পাঠদানের উপায় হিসেবে অভিভাবকরা ছুটছেন সহায়ক বইয়ের পেছনে। মূল্যায়ন পদ্ধতিও জানেন না অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শহরের তুলনায় গ্রামের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্রম আয়ত্বে বেশি সময় লাগছে। এতে বৈষম্যর চিত্র ফুটে উঠছে। শিক্ষকরা বলছেন, ক্লাসে পাঠদান শেষে এক ঘণ্টায় প্রায় শ’খানেক শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, এ শিক্ষা পদ্ধতিতে গাইড বই বা সহায়ক বই কোনো কাজে লাগবে না। এনসিটিবির নির্দেশনা অনুসরণ করলে অর্ধ বছর পরই পুরো ব্যাপারটি বুঝতে পারবে সবাই। চার মাস পর মূল্যায়ন পদ্ধতি দেয়া হলেও এনসিটিবি বলছে এটিই সঠিক সময়।
সম্প্রতি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি এনসিটিবি ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছে। এই মূল্যায়ন পদ্ধতি বুঝতে শিক্ষকদের অপেক্ষা করতে হবে ১০ মে পর্যন্ত। আর অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বুঝতে বুঝতে আরো এক মাস পার হয়ে যাবে। এরই মধ্যে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, সন্তানদের কী পড়াবেন? কীভাবে পড়বে? এ সব বিষয় অজানা কারণে গত চার মাস ধরে পড়াশোনাই করতে পারেনি। এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজধানীর মুগদা আইডিয়াল স্কুলের অভিভাবক সালমা খাতুন বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমে স্কুলে কী পড়াচ্ছে? বাসায় কী পড়াব? কীভাবে পড়াব? কিছুই বুঝতে পারছি না। বাজারে গাইড কিনলাম। সেখানেও মূল্যায়নের পদ্ধতি দেয়া নেই। টিউশনের শিক্ষকরাও বুঝতে পারছেন না। পুরো রমজান মোবাইল ব্যবহার করেই কাটিয়েছে। নরসিংদী ব্রাহ্মন্দি কে কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, নতুন পদ্ধতির কোনো কিছুই বুঝতে পারছি না। আগে যা পড়াশোনা হতো। এখন আর তাও হচ্ছে না। নতুন শিক্ষাক্রমের নিয়ে শিক্ষকরা এখনো ধোঁয়াশায় রয়েছে। নরসিংদী ও রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে দেখা যায়, শিক্ষকরা এখনো মূল্যায়ন পদ্ধতি দেখেননি। বই পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছেন তারা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের পরিবর্তে মডেল টেস্ট পরীক্ষা নিতেও দেখা গেছে। রাজধানীর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের তুলনায় গ্রামের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, এক ঘণ্টায় শিক্ষার্থীদের বোঝানোই চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে শ’খানেক শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে নরসিংদীর মামুদপুর স্কুলের শিক্ষক তাসদিক আল ইসলাম বলেন, আমাদের স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ৬৫ জন। ক্লাসের সময় এক ঘণ্টা। পাঠ শেষ করতে করতে সময় পার হয়ে যায়। সব শিক্ষার্থীর শতভাগ যথাযথ মূল্যায়ন নিতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। রাজধানীর গেন্ডারিয়া হাইস্কুলের একজন শিক্ষক বলেন, এনসিটিবির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছি। নতুন করে মূল্যায়ন নির্দেশনা পেয়েছি। তবে আমাদের সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯৫ জন। এত শিক্ষার্থীর আলাদা আলাদা মূল্যায়ন করতে গেলে অনেক সময় লাগবে।
নতুন শিক্ষাক্রমের সমস্যা ও সার্বিক মূল্যায়নের বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য প্রফেসর মশিউজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমের সব বিষয় একেবারেই জানা যাবে না। ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি বিষয় জানতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি আগে প্রকাশ করার জন্য আমাদের ওপর চাপ ছিল। কিন্তু মূল্যায়ন নিয়ে কোনো ধরনের ব্যবসা যাতে না হয় সে জন্য আমরা আগে এটি প্রকাশ করিনি। আমরা যথা সময়ে এটি প্রকাশ করেছি।’ অধিক শিক্ষার্থী মূল্যায়নের ব্যাপারে এনসিটিবির এ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ৩০ হাজার। এর মধ্যে এক হাজার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। বাকি ২৯ হাজার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা চল্লিশের কম। আমরা তো ২৯ হাজার প্রতিষ্ঠানের কথা মাথায় রেখেই কাজ করেছি। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক রাখতে হবে। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।’ এ ব্যাপারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও তত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে একটি চ্যালেঞ্জ পার করছে মাউশি ও এনসিটিবি। এটি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মহলকে অনেক তৎপর হতে হবে। শিক্ষাক্রমের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো বোঝা, ধারণ করা ও সেগুলো বাস্তবায়ন স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এতে সময় লাগবে। সৃজনশীল ব্যবস্থা খারাপ ছিল না। কিন্তু আমরা সেটি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। নতুন পদ্ধতি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে। এটির যথাযথ বাস্তবায়নে অনলাইন প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। সব শিক্ষকের বোঝার ক্ষমতা এক রকম নয়। তাই শিক্ষকদের সরাসরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’