নতুন ফর্মুলায় কি সমাধান

সৈয়দ সাইফুল ইসলাম প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৩, ১১:৪৮ পিএম
  • বর্তমান সংবিধানের আলোকে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায়  আগ্রহ নেই বিএনপির

নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় বিএনপির অংশগ্রহণে সাংবিধানিক বাধা নেই
—ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, আ.লীগ

এখন অনেক রকম কথা হবে এতে আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই
—বেগম সেলিমা রহমান
স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি

ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকারের নতুন ফর্মুলা বের করা সম্ভব
—ড. বদিউল আলম মজুমদার
সুজন সম্পাদক

রাজনীতির গতিপথ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিকদের মনে নানা প্রশ্ন, এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? সাংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকারের যে ধারণা ছিল সেটি কী পুনর্বহাল হবে, নাকি সংবিধানের ভেতরে থেকেই বিকল্প উপায় খোঁজা হবে, নাকি রাজপথে থাকা সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে নতুন কোনো ফর্মুলা বের করা হবে— এ প্রশ্নটিই এখন সর্বজনীন। শুধু রাজনীতিক বা সাধারণ মানুষ নয়, বিভিন্ন পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীরাও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে সেই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছেন। 

দেশের প্রধান প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় রাজপথে সোচ্চার। আগামীতে আরও কঠোর আাান্দোলনের কৌশল নির্ধারণে তারা মাঠে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় বিএনপিকে সুযোগ দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে সম্প্রতি বক্তব্য দিয়েছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল সরকার। তখন বিএনপি সরকারের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মাঠে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। দীর্ঘ দিন পর এখন পুরোনো এমন প্রস্তাবে আমলে নেয়ার কোনো ইঙ্গিত বিএনপিতে পাওয়া যায়নি। 

রাজধানীর বনানীর সেতুভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে গত রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ওই সময় একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন করেন, ২০১৪ সালের ভোটের আগে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখন নির্বাচনের সময় বিএনপির কাউকে মন্ত্রিত্ব দেয়ার সম্ভাবনা আছে কি-না? সাংবাদিকের ওই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত যদি নিতে হয়, তাহলে সংবিধানের মধ্যেই থাকতে হবে। সংবিধানে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ থাকলে আপনি যেটি বললেন, এতে কোনো অসুবিধা নেই।’ ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘বিএনপি যদি বলে, আমরা নির্বাচনে আসব। নির্বাচনে এলে তখন এক কথা। তারা নির্বাচন করবেই না তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া। তারা এই সংসদকে চায় না। মন্ত্রিসভা, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চায়। এসব শর্তারোপের মধ্যে আমরা কীভাবে বলব যে, আপনারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিতে আসুন বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয় আপনাদের দিচ্ছি? তাদের তো সম্পূর্ণ উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর অবস্থান।’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের রোববারের বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কথা হচ্ছে। তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্নেরও। কেউ কেউ বলছেন, আন্দোলনের গতি পাল্টে দিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে থেকে এমন আভাস দেয়া হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিক ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন আমার সংবাদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় বিএনপিকে নিয়ে আসার বিষয়ে দলীয় ছোট-বড় কোনো ফোরামেই কোনো আলোচনা হয়নি। এমন আলোচনা হবে বলেও মনে হচ্ছে না। এক প্রশ্নের তিনি বলেন, সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও তাদেরকে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য করার ক্ষেত্রে আইন ও বিধানগত কোনো সমস্যা নেই। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা চাইলে সে সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। তবে এমন সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন না প্রবীণ এই রাজনীতিক। 

এ প্রসঙ্গে বিএনপি স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্যের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। আমার সংবাদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের এ বক্তব্যে বিএনপি কোনো আগ্রহ নেই। এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে যদি কোনো আলোচনা হয় তাহলে তখন বলা যাবে যে, এমন বক্তব্য বিএনপি কিভাবে নিয়েছে।’ 

দলটির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য বেগম সেলিমা রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘এখন অনেক কিছু হবে, অনেক রকম কথা হবে, সে কারণে এসব বিষয়ে আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ওবায়দুল কাদেরের ওই বক্তব্যে আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। আমাদের কোনো ফোরামেও এ নিয়ে কোনো কথা বা আলোচনা হয়নি।’ 

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকারের নতুন কোনো ফর্মুলা বের করা সম্ভব। এতে সংকট এড়ানো সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর নির্বাচন ব্যবস্থা খারাপের দিকে গেছে। সে অবস্থা থেকে ফেরত আসতে হবে। একই ব্যক্তি সংসদের প্রধান, দলীয় প্রধান ও সরকার প্রধান হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের সুযোগ কম থাকে।’ 

এদিকে গত ৮ মে সোমবার ঢাকাস্থ জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি নেতারা। রাজধানীর গুলশানে গোয়েন লুইসের বাসভবনে সোমবার দুপুরে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।