বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষক গবেষণা ও পাঠ দিতে পারছি না
—মো. সোহেল রানা, অধ্যাপক, জাবি
চাহিদার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে
—ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাবি
অনুমোদনের আগে যথাযথ মান নিশ্চিত করতে হবে
—ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাবির সাবেক ভিসি
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বৃদ্ধির পরিবর্তে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। সর্বশেষ সাড়ে ১৪ বছরে প্রায় দ্বিগুণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একইভাবে সরকার উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণে প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর বিগত ১১ বছরে ৬০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এখনো জমা আছে অর্ধশতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ক্রমাগত বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রয়োজনের কারণে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথাযথ মান নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ার কারণ হিসেবে মাউশি বলছে, যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আদেশেই বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে।
জানা যায়, দু’বছর আগে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শত বছর পূর্ণ হয়েছে। শত বছরের মধ্যে দেশে অনুমোদন পেয়েছে মোট ৫৪ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর দীর্ঘ ৮৭ বছরে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ২৯ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর বর্তমান সরকারের আমলে সাড়ে ১৪ বছরেই অনুমোদন পেয়েছে ২৪ বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ ৩২ বছরে ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। অন্যদিকে ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠার ৩১ বছরে দেশে ১১১ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত সাড়ে ১৪ বছরে অনুমোদন পেয়েছে ৬২ বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্বববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন শিক্ষকরা। শিক্ষকরা বলছেন, অনুমোদনপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথাযথ মান নিশ্চিত করা যায়নি। এর মধ্যে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ায় আমাদের শিক্ষার মানে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল ইসলাম মামুন বলেন, ‘এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে যা হচ্ছে তা আসলে কলেজ। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নাম দিয়ে যেই শিক্ষক নিয়োগ দেই, যেই বেতন দেই, যেই বরাদ্দ দেই— সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় নামের সঙ্গে যায় না। একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় বানানো মানে একেকটি এলাকা দখল, রাজনৈতিক শিক্ষকদের পদ-পদবির পেছনে লেলিয়ে দিয়ে শিক্ষকতা পেশাটিকে ধ্বংস করার তাণ্ডব চালানো।’ আমরা কলেজগুলোতেও অনার্স মাস্টার্স চালু করে লাখে লাখে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী সার্টিফিকেট দিচ্ছি। কে পড়াল, কী পড়াল, কিভাবে পরীক্ষা হলো ইত্যাদিতে নজর নেই। মাস্টার্স পাস দিয়ে মাস্টার্সের কোর্স পড়াচ্ছি। যেখানে সারা বিশ্বে অনার্সের সাবজেক্ট পড়ানোর ন্যূনতম যোগ্যতা শুধু পিএইচডি নয়, সঙ্গে কয়েক বছরে পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতাও লাগে। পিএসসি সরাসরি পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিয়ে কিছুটা হলেও মান বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মো. সোহেল রানা আমার সংবাদকে বলেন, ‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া সরকারের শিক্ষানীতির একটি অংশ হতে পারে। তবে এখানে মান নিশ্চিত করা জরুরি। সেই ব্যবস্থায় মনে হয় না আমরা এই মুহূর্তে প্রস্তুত আছি। সেই প্রস্তুতি নিয়ে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া যেত, তাহলে বোধ হয় এটি ফলপ্রসূ হতো। একই সময়ে, অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। কিন্তু সেখানে কি আমরা যথাযথ মানের পাঠ দিতে পারছি? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী যথাযথ মানের শিক্ষক আছে? মানসম্মত গবেষণা কি আমরা পাচ্ছি? সামগ্রিকভাবে বললে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের এ অধ্যাপক মনে করেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলে যথাযথ মান নিশ্চিত করা জরুরি। মান নিশ্চিতে আমরা এখনো প্রস্তুত নই। এভাবে ঢালাওভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হলে একটা সময় আমাদের কর্মসংস্থানের ওপর চাপ পড়বে। যোগ্য লোকের সংকট সৃষ্টি হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাড়ার প্রক্রিয়া ও কারণ জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের (মাউশি) অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. আবু ইউসুফ মিয়া আমার সংবাদকে বলেন, ‘যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও প্রক্রিয়া মানা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ানোর ব্যাপারে আমাদের জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞেস করেন। আমরা হুকুমের দাস। আমাদের যেভাবে বলা হয়, আমরা সেভাবেই কাজ করি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, চাহিদার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। চাহিদার পাশাপাশি শিক্ষার গুণগতমান বাড়বে এটিই বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে পারলেও মান বাড়াতে পারছি না।’
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আমার সংবাদকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসম্মত করার জন্য যথাযথ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদনেও গুরুত্ব দিতে হবে। অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় সাত বছর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নিজস্ব ক্যাম্পাস ও মাঠ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ক্যাম্পাস হওয়ার আগেই দেখতে হবে এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, শিক্ষকের মান সব কিছু যথাযথ আছে কি-না? এরপর সাময়িক সময়ের জন্য অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। তাহলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে পারবে।’