তৃণমূলে সংঘর্ষ-সংঘাত

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৩, ১১:৪৬ পিএম
  • পটুয়াখালীতে বিএনপি যুবলীগের প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ, আহত শতাধিক
  •  রাজবাড়ীতে সংঘর্ষ লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলিতে সাংবাদিকসহ আহত ২০

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ১০ দফা দাবিতে গতকাল মহানগর দক্ষিণসহ দেশের ১৮ জেলা ও মহানগরে জনসমাবেশ করেছে বিএনপি। দলের ৮২ সাংগঠনিক ইউনিটে চারদিনের এ কর্মসূচির গতকাল ছিল দ্বিতীয় দিন। এ দিন সারা দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও বিভিন্ন স্থানে ‘শান্তি সমাবেশ’ কর্মসূচি পালন করেছে। এতে তৃণমূলে মুখোমুখী অবস্থানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে পালটাপালটি। অধিকাংশ জেলায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালিত হলেও পটুয়াখালীতে বিএনপি-যুবলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে জেলা বিএনপি কার্যালয়। পণ্ড হয়ে যায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি। এছাড়া রাজবাড়ীতে বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন ২০ নেতাকর্মী। দু’দলের শীর্ষ নেতাদের এ নিয়ে হয়েছে পালটাপালটি বক্তব্য। 

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমাদের সরকারের সময় কখন শেষ হবে, তা এ দেশের জনগণ ও আল্লাহ নির্ধারণ করবেন। বিএনপি আছে সরকার পতনের আন্দোলন নিয়ে, আর আওয়ামী লীগ আছে জনগণের জান-মাল রক্ষার আন্দোলনে। বিএনপির আন্দোলন পথহারা পথিকের মতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, বারবার বসেও আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করতে পারেনি বিএনপি। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অনাচারের ওপর ভিত্তি করে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না। এই সরকারের পতন অত্যাসন্ন। বিএনপির শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশ চলাকালে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে এবং নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করছে। নিপীড়িত মানুষ ও বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না ভেবেই সরকার এখন শান্তিপূর্ণ যে কোনো কর্মসূচিতেই দলীয় ক্যাডার আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে বর্বরোচিত আক্রমণ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।

পটুয়াখালীতে বিএনপি-যুবলীগ সংঘর্ষ, আহত শতাধিক : পটুয়াখালীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বনানী মোড়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে উভয়পক্ষের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ সময় ভাঙচুর করা হয়েছে জেলা বিএনপি কার্যালয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে পটুয়াখালীতে জনসমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও সংঘর্ষের কারণে তা পণ্ড হয়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু।

অন্যদিকে সকালে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীরা শহরে ‘শান্তি সমাবেশের’ মিছিল করেন। মিছিল নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিএনপির সমাবেশস্থলের দিকে এগোলে পথে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়। এ সময় উভয় পক্ষই লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সকাল ১০টার দিকে শুরু হওয়া ওই সংঘর্ষের কারণে বিএনপির দলীয় কার্যালয় থেকে সিঙ্গারা পয়েন্ট পর্যন্ত পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় জেলা বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় একটি মোটরসাইকেলে। দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলা এ সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ তিনটি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জেলা বিএনপি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বাহাউদ্দিন বাহার অভিযোগ করে বলেন, সমাবেশের প্রধান অতিথি আবদুল আউয়াল মিন্টু যাতে সভাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য তার হোটেলের সামনে মহড়া দিয়ে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকেই যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে ভীতির সৃষ্টি করে চলেছে। এ সংঘর্ষে তাদের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা যুবলীগের শান্তি সমাবেশের মিছিলে বিএনপির মিছিল থেকে উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। বিএনপি সন্ত্রাসীদের হামলায় আমাদেরও অন্তত ৫০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের শান্তি সমাবেশ থেকে ঘোষণা করছি, পটুয়াখালীতে আগুনসন্ত্রাসী ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের আমরা মাঠে থেকে প্রতিহত করব।’

রাজবাড়ীতে বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, আহত ২০ : রাজবাড়ীতে বিএনপির সমাবেশ ও আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ উভয়পক্ষের ২০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। গতকাল দুপুরে শহরের আদর্শ মহিলা কলেজের পাশের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে পূর্বনির্ধা?রিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজুবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা এলাকার বিএনপির সাবেক এমপি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের বাড়িতে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বের হলে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় উভয় দলের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া শুরু হয়। এতে ২০ জনের বেশি আহত হন। সংবাদ সংগ্রহের সময় এখন টেলিভিশন ও ঢাকা মেইলের জেলা প্রতিনিধি কাজী তানভীর মাহমুদ এবং গ্লোবাল টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি খন্দকার রবিউল ইসলাম আহত হন।

এ বিষয়ে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম অভিযোগ করে বলেন, কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় রাজবাড়ী যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ হামলা চালায়। এতে আমাদের বেশ কজন নেতাকর্মী আহত হন। পরবর্তীতে আমরা মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর থানার ওসি মো. শাহাদাত হোসেন জানান, বিএনপির সঙ্গে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তিন ছক্কা শেষ, সরকার এবার বাতিল —আলাল : গতকাল শনিবার জামালপুর জেলা বিএনপির উদ্যোগে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে অধীনস্থ আদালত এবং সরকারের অবজ্ঞা, গায়েবি মামলায় নির্বিচারে গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা ও পুলিশি হয়রানি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের লোডশেডিং, আওয়ামী সরকারের সর্বগ্রাসী দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং ১০ দফা দাবি আদায়ে গণসমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। আপনাদের নেতারা বলেন খেলা হবে। কীসের খেলা? লুডু খেলা, ফুটবল খেলা, কী খেলা খেলবেন? লুডু খেলায় তিনটি ছয় উঠলে যেমন বাতিল হয়ে যায়, তেমনি এই সরকার এবার বাতিল হয়ে যাবে। তারা ২০০৯ সালে একটা ছক্কা মেরেছে, ১৪ সালে রাতের বেলায় ভোট চুরি করে ১৮ সালে ছক্কা মেরেছে। তারা তিন ছক্কা মেরেছে; এবার পোককা হয়ে যাবে।

জামালপুর জেলা বিএনপি সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীমের সভাপতিত্বে ও জামালপুর জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ।

‘দু-তিন মাসের মধ্যেই সরকারের পতন’ : বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, শেখ হাসিনা বলেছেন যারা স্যাংশন দেবে, তাদের কাছ থেকে কিছু কেনা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, স্যাংশন কেন দিচ্ছে, তা জাতিকে স্পষ্ট করে জানান। আওয়ামী লীগ জনগণের দল নয়, আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে সামরিক সরকার ও ভারতের সঙ্গে আঁতাত করে এবং পরবর্তীতে বিনা ভোটে ক্ষমতায় এসেছে। গতকাল শনিবার বিকালে কুড়িগ্রাম জেলা শহরের এনআর প্লাজা মার্কেটের সামনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলু, জেলা বিএনপি সভাপতি তাসভীর উল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানাসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।

দেশের মানুষ আর এই সরকারকে চায় না —ড. মোশাররফ : জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দেশের মানুষ আর এই সরকারকে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। গতকাল শনিবার বিকালে ঢাকায় এক জনসমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন। মতিঝিল পীরজঙ্গী মাজারের সামনে এ জনসমাবেশের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল, সহ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আলীম, সহ-সম্পাদক আনিছুর রহমান তালুকদার খোকন, মহিলা দলের সভানেত্রী মির্জা আফরোজা আব্বাস, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম মিল্টন প্রমুখ।

ড. মোশাররফ বলেন, আজকে সারা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তারা এই স্বৈরাচার সরকারের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়। যেখানেই আওয়ামী লীগ, সেখানেই গণতন্ত্র হরণ হয়েছে। আজ সেজন্য দেশে গণতন্ত্র নেই। গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই সরকার যা-তা করে যাচ্ছে। দেশের মানুষ আর এই সরকারকে চায় না।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম বলেন, পুলিশের বলে বলীয়ান হয়ে অনেক কথা বলা যায়, একা আসুন দেখি কতক্ষণ থাকতে পারেন ঢাকায়। পুলিশ ভাইদের বলতে চাই, জনগণের টাকায় আপনাদের বেতন হয়, সে কথা ভুলে যাবেন না। যে পুলিশ মিথ্যা মামলা দিয়েছে আমাদের নামে, তাদের তালিকা করা হবে। আপনারা আওয়ামী লীগের দলীয় বাহিনী হবেন না। ৫০ বছর পর যদি কোনো বিচার হয়, তাহলে অবৈধ ও জোর করে ক্ষমতায় থাকারও একদিন বিচার হবে। ইনশাল্লাহ, আওয়ামী লীগের অধীনে আর কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যখন আমাদের ওপর হামলা করবে, তখন কী আমরা বসে থাকব? না, আমরা আর বসে থাকব না। আমরা শুধু বাঁশি বাজাব না। প্রতিহত করতে হবে। আমরা যদি এই সরকারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা বলতে আর কিছু থাকবে না। এরা দেশকে বিলীন করে দেবে।