কিন্ডারগার্টেন লাভজনক কোনো ব্যবসা নয়
—জয়নুল আবেদীন জয়, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, বিকেএ
বেতন নির্ধারণে কেউ আবেদন করেননি
—শাহ রেজওয়ান হায়াত, মহাপরিচালক, ডিপিই
স্বল্পবেতনে অনৈতিক পথ অবলম্বনের শঙ্কা
—ড. তারিক আহসান, অধ্যাপক, ঢাবি
আগামী দিনের সোনালি সমাজ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা। দক্ষ শিক্ষকই পারেন জাতিকে সোনার মানুষ উপহার দিতে। কিন্তু দক্ষ শিক্ষক তৈরির জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের সচ্ছল ও স্বাবলম্বী হওয়া। অথচ দেশ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের বেতন যথাযথ না হওয়ায় এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সরকারি, আধাসরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষকরা যে বেতন পান, এর অর্ধেকও পান না বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষকরা। আর অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক পড়ান নামমাত্র বেতনে। তাদের বেতন নিয়ে নেই সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন মালিক থাকেন। মাস শেষে লভ্যাংশ তারা ভাগ করে নেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পাচ্ছেন না ন্যূনতম জীবন চালানোর মতো বেতন। প্রতিষ্ঠানের পাঠদান শেষে বিকালে ও রাতে ছোটেন প্রাইভেট পড়ানোর পেছনে। এর ফলে শিক্ষকদের অনৈতিক উপায় অবলম্বনের আশঙ্কা তৈরি হয় বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তবে কিন্ডারগার্টেন মালিকদের নেতারা বলছেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুল লাভজনক কোনো ব্যবসা নয়। চালাতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
ঢাকা ও ঢাকার বাইরের কয়েকটি স্কুল পর্যবেক্ষণে জানা যায়, কিন্ডারগার্ডেন বা বেসরকারি স্কুলের অধিকাংশ মালিক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত করেন। একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন মালিক থাকেন। অনেক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। শিক্ষকদের স্বল্প টাকা প্রদান করে সম্পূর্ণ লাভ মালিকরা ভোগ করেন। সাধারণ শিক্ষকদের মাসিক বেতন দেড় হাজার থেকে সর্বোচ্চ আট হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রধান শিক্ষকরা পান আট হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি মাসে কমপক্ষে ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০০ টাকা পর্যন্ত নেয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এরচেয়েও বেশি টাকা নিচ্ছে বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এত টাকা নেয়া হলেও তা শিক্ষকদের পকেটে ঢুকছে না। এসব টাকায় পকেট ভারী হচ্ছে প্রতিষ্ঠান মালিকদের।
রাজধানীর গেণ্ডারিয়া এলাকার কসমোপলিটন স্কুলটিতে বাংলা ও ইংলিশ মিডিয়াম দুই ভার্সনেই পাঠদান হয়। স্কুলে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বমোট শিক্ষার্থী রয়েছে চার শতাধিক। তাদের বেতন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা বেতন পান মাত্র তিন থেকে আট হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটি কয়েকজন মালিকের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। এ প্রতিষ্ঠানটির এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মাসে গড়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে প্রায় চার লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকদের বেতন তিন থেকে সর্বোচ্চ আট হাজার টাকা, সে হিসেবে গড়ে শিক্ষকদের বেতন যদি পাঁচ হাজার টাকা ধরা হয় এবং ২০ জন শিক্ষক-কর্মচারী হলে বেতন বাবদ সর্বোচ্চ ব্যয় হচ্ছে এক লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মালিক মাসে তিন লাখ টাকা পকেটস্থ করছেন। অথচ যারা পাঠদান করাচ্ছেন, তারা শ্রমের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেন না। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি এলাকার স্কুল অনির্বাণ কিন্ডারগার্টেন। এখানে মোট শিক্ষার্থী আট শতাধিক। তাদের মাসিক বেতন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। অন্যদিকে শিক্ষকদের বেতন মাত্র দুই থেকে চার হাজার টাকা। এ প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৪০ জন। এই ৪০ শিক্ষকের গড় বেতন তিন হাজার টাকা ধরা হলে মোট বেতন দাঁড়ায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। আর ৮০০ শিক্ষার্থী থেকে গড়ে ৫০০ টাকা করে বেতন নেয়া হলে মোট আয় দাঁড়ায় চার লাখ টাকা। এ প্রতিষ্ঠানের মালিকও মাসে লাভ করেন দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিন্ডারগার্টেন স্কুলের একজন শিক্ষক আমার সংবাদকে বলেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে চাকরির বাজারে অনেক সময় ব্যয় করেছি। শেষ পর্যায়ে কিন্ডারগার্টেনে যুক্ত হয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন একজন সাধারণ শ্রমিকের চেয়েও কম। মাস্টার্স পাস করে তো শ্রমিকের কাজ করতে পারি না। বেতন যা-ই হোক, সমাজে শিক্ষক হিসেবে সম্মান পাই। সংসার চালানোর জন্য অতিরিক্ত টিউশনির পেছনে ছুটতে হয়।
হাসিনা আক্তার কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করছেন ১২ বছরেরও বেশি সময়। বর্তমানে তার মাসিক বেতন চার হাজার টাকা। মাস্টার্স শেষে মাত্র এক হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। তিনি বলেন, পড়াশোনা শেষে সারাদিন বাসায় থাকতে হতো। একাকিত্ব কাটাতে স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা একটু ভালো হওয়ায় চলতে সমস্যা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএ) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব জয়নুল আবেদীন জয় বলেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুল একটি ব্যবসা— এটা মানতে সমস্যা নেই। ব্যবসা তো খারাপ নয়। কিন্তু এটা লাভজনক কোনো ব্যবসা নয়। মালিকরা খুবই কম টাকা লাভ করতে পারেন। তারা কিন্ডারগার্টেনে টাকা ব্যয় না করে অন্য কোথাও ব্যয় করলে আরও বেশি লাভ করতে পারতেন। করোনার সময় অনেক কিন্ডারগার্টেন মালিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো কী হবে— নীতিমালায় এ-সংক্রান্ত সুস্পষ্ট কোনো কথা উল্লেখ নেই; তবে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নীতিমালা ২০১১-এর ১৯ নং ধারায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি শিরোনামে জানানো হয়েছে, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন, ভাতাদি এবং অন্যান্য সুবিধাদি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এককভাবে পরিশোধ করবে এবং উক্ত বেতন, ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা প্রদানে কোনোক্রমেই সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে না।
ধারা ১৮তে বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের ন্যায় ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অথচ বেতনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট করে কিছু্ই বলা হয়নি। এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত আমার সংবাদকে বলেন, বেসরকারি বিদ্যালয়ের বেতন নির্ধারণের ব্যাপারে কেউ আমাদের কাছে আবেদন জানায়নি। আবেদন জানালে বিবেচনা করে দেখব।
কম বেতনের কারণে শিক্ষকদের অনৈতিক পথে রোজগারের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক তারেক আহসান আমার সংবাদকে বলেন, এত কম বেতনের চাকরিতে শিক্ষকদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তারা (শিক্ষক) বিকল্প পথ বা উপায় খোঁজ করবেন— এটাই স্বাভাবিক। সেজন্য আমাদের নতুন শিক্ষা আইনে এ-সংক্রান্ত আইন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনটি পাস হলে শিক্ষকদের অনেক সমস্যারই সমাধান হবে। আপাতত একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়ে হলেও শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।