বাজেটে নেই বউয়ের হিসাব!

আবদুর রহিম প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৩, ১২:৪৫ পিএম

তুষ্ট-রুষ্ট বিতণ্ডায় পিষ্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত 

প্রকাশ কায়েফ। বিয়ে করেছেন ছয় মাস আগে। রাজধানীর মতিঝিলে একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন। যা স্যালারি পান তা দিয়ে বাসাভাড়া, সংসার খরচ, গ্রামে মা-বাবাকে টাকা পাঠিয়েই শেষ। মাঝে মধ্যে বন্ধুদের থেকে ঋণ নিয়েও চলতে হয়। ঢাকায় টিকে থাকা কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তাতে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। টেলিভিশনের স্কিনে এমন তথ্য দেখে খাতাকলম নিয়ে হিসাবে বসেন কায়েফ। সদ্য বিবাহিত স্ত্রী নতুন বছরকে সামনে রেখে প্রতি মাসের খরচ ও জমায় একটি তালিকা দিয়েছিলেন। তাতে আয়ের সঙ্গে বিশাল সাংঘর্ষিক। ছোটখাটো কিছু স্বপ্ন পূরণ কিংবা অল্প কিছু জমার ইচ্ছে তো সুযোগ নেই তার সাথে দৈনন্দিন হিসাব অনুযায়ী মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকার ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

প্রকাশ কায়েফ প্রতি মাসে বাড়ির জন্য মাঝারি ধরনের খেজুর কিনতেন যার নাম দাবাস। নিয়মিত এই খেজুরের দাম ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। গতকাল বাজেট ঘোষণায় খেজুরের দাম বাড়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রী জানান, এখন থেকে তাজা ও শুকনো খেজুর আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে গিয়ে দেখা যায় এক লাফে প্রায় ১৫০ টাকা বেড়ে নিয়মিত কেনা খেজুর ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংসারের চাল, ডাল, তেল, চিনির হিসাব করতে করতেই চোখে সর্ষেফুল দেখছিলেন তিনি। এখন তো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বলা চলে। বিয়ের পর এখনো করা হয়নি হানিমুন। পাওয়া যায়নি ছুটি। জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরু দিয়ে ভ্রমণের প্ল্যান ছিল এই দম্পতির। এর মধ্যই গতকাল দুঃসংবাদ দেন মুস্তফা কামাল। তিনি জানান, এখন থেকে ভ্রমণ করতে গেলে ছয় হাজার টাকা কর দিতে হবে। আকাশপথে সার্কভুক্ত কোনো দেশে ভ্রমণে করের পরিমাণ দুই হাজার টাকা। এ ছাড়া আকাশপথে অন্য কোনো দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর দিতে হবে চার হাজার টাকা। আকাশপথে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর দিতে হবে ২০০ টাকা। স্থল ও জলপথে যেকোনো দেশে ভ্রমণের জন্য কর দিতে হবে এক হাজার টাকা। সন্ধ্যার পর থেকে হিসাব করতে করতে বউয়ের হিসাবের সংঘর্ষের সঙ্গে নিজের জীবনেও অন্ধকার দেখতে পাচ্ছেন প্রকাশ কায়েফ। গেলো মাসে স্ত্রীর চোখে হালকা একটু ব্যথা অনুভব হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ডাক্তার দেখালে নতুন চশমা নিতে পরামর্শ দেন চিকিৎসক। একই মাসে মায়ের অসুস্থতার কারণে মাস পার হয়ে গেলেও অর্থ সংকটে আর চশমা কেনা সম্ভব হয়নি। ঈদের আগে কিনে দেয়ার প্রস্তুতি রেখেছিলেন তিনি। এর মধ্যে চোখ ছুঁয়ে যাওয়া ঘোষণা দেখতে পেলেন তিনি। এবারের বাজেটে চশমার ফ্রেম ও সানগ্লাস আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বাজারের সেই এক হাজার ২০০ টাকার চশমা এখন কত হবে তা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ এই নবদম্পতির।  এ দিকে টিভি স্কিনে একের পর এক তাজা খবর দেখতে দেখতে একেবারের হাঁফিয়ে ওঠার অবস্থা। চলতি মাসের সাংসারিক বাড়তি খরচের লিস্ট হাতে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ জিনিসেরই দাম বাড়ার খবর পান তিনি। সাথে সাথে বউকে মাগরিবের আগে ফোন করে জানান, অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণাকালে জানিয়েছেন, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি টেবিল ও রান্নার পাত্র, টিস্যুপেপারসহ বিভিন্ন পণ্যের ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হবে। এতে করে এ মাসে টার্গেট অনুযায়ী নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে  জিনিসগুলো কেনা সম্ভব হবে না। প্রয়োজনে পরের মাসে কেনা হবে। যাতে আরো কিছু সময় ধৈর্য ধরে এ জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

অর্থমন্ত্রীর রঙিন স্কেচে আঁকা বাজেট নিয়ে কাল সকালে কিভাবে বাজারে যাবেন ভাবছেন প্রকাশ কায়েফ। তিনি জানেন, বাজেটের পর বাজারে যাওয়া মানে কারণে-অকারণে অবশ্যই তাকে নিত্যেপণ্যে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। মোটা অঙ্কের এই বাজেটে সরকার দল তুষ্ট, তারা বলছে— নতুন বাজেটে দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। তবে রুষ্ট বিরোধী দল। তারা বলছে— ঋণ করে ঘি খাওয়ার জন্য এত বড় বাজেট দেয়া হয়েছে। তবে মাঝে পড়ে প্রকাশ কায়েফের মতো মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পিষ্ট।

বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, নয়া বাজেটে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। ট্যাক্স ও করের চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। সংকট মোকাবিলাও ও আইএমএফের চাপে ভর্তুকি তুলে দিয়ে উল্টো রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনায় জনজীবনে পাহাড় সমান চাপ বাড়বে। দেশীয় উৎপাদনকে সুবিধা দিতে সোনার বার আনার পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে এর ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়বে। এ ছাড়া কসমেটিক্স, প্রশাধনী ও বিলাসপণ্য দাম বৃদ্ধির তালিকায় থাকায় বাড়বে বিয়ের খরচ। ফলে এ বাজেট যুবক শ্রেণির জন্য হতাশা নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে ঊর্ধ্ব মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট জনসাধারণ যখন জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন; ঠিক তখন করজালে জড়িয়ে ফেলার খবর নিয়ে হাজির নতুন বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যূনতম আয়কর দুই হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থাৎ করমুক্ত সীমার নিচে আয় রয়েছে, অথচ সরকার থেকে সেবাগ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে— এমন করদাতাদের ন্যূনতম কর দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে। তবে বর্তমান সরকারের শেষ বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য কিছুটা সুখবর আছে। নয়া বাজেটে এ শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর দিতে হবে না। পাশাপাশি ৬৫ বছরের বেশি বয়সি নাগরিক এবং নারীর ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশে নির্ধারণের প্রস্তাবও করেন অর্থমন্ত্রী। আগামী অর্থবছর থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি পরবর্তী এক লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ে কর দিতে হবে ৫ শতাংশ হারে। তার পরবর্তী তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ে কর দিতে হবে ১০ শতাংশ হারে। পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর দিতে হবে ১৫ শতাংশ হারে। তার পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর দিতে হবে ২০ শতাংশ হারে এবং এর চেয়ে বেশি আয়ের জন্য ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে।

মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে গতি বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে এ খাতে বড় সুখবর নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে মাসিক বয়স্ক ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। আর বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীর ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী ২৩.৬৫ লাখ থেকে ২৯ লাখ জনে বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাসিক শিক্ষা উপবৃত্তির হার বাড়িয়ে প্রাথমিক স্তরে ৫০ টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ১৫০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভাতাভোগীর সংখ্যা চার হাজার ৮১৫ জন হতে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ছয় হাজার জন করা হয়েছে এবং বিশেষ ভাতাভোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৬০০ জন।