ধ্বংসের দ্বারে নারী ফুটবল

আহমেদ হৃদয় প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৩, ১১:২১ পিএম
  • সাত মাসে দল ছেড়েছেন চার ফুটবলার
  • ছুটি শেষে ক্যাম্পে ফেরেননি তহুরা-আনাই
  • ২২ বছর বয়সে ফুটবল ছেড়েছেন জয়া চাকমা
  • ২৫ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানান ডালিয়া

সাফ চ্যাম্পিয়নদের ধরে রাখতে পারছে না ফেডারেশন
—আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু  
সাবেক ফুটবলার

বাফুফে সভাপতি মেয়েদের ফুটবলের প্রতি উদাসীন
—গোলাম সারোয়ার টিপু  
সাবেক ফুটবলার

মূল হেডলাইনাটির সঙ্গে অনেকেই হয়তো একমত হবেন। আবার অনেকেই দ্বিমত প্রকাশ করতে পারেন। তবে বেশিরভাগ মানুষই এর পক্ষেই থাকবেন। গত ১৫ বছরে বাফুফে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য কি করেছে? এ প্রশ্নটা ছোড়া হয়েছিল দুই সাবেক ফুটবলারের দিকে। 

সাবেক তারকা ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপু বলেন, গত ১৫ বছর ধরে দায়িত্বে রয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন। সে সময় ভালো একটি র্যাংকিংয়ে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। সেখান থেকে প্রায় ৩০-৪০ ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশ  পুরুষ ফুটবল দলের র্যাংকিং এখন ১৯২তম। বলতে গেলে বিশ্বের মধ্যে একেবারে তলানিতে রয়েছে তারা। গত বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হাত ধরে সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ট্রফি নিয়ে ফিরল তারা। তবে তাদের কি সম্মান করেছে বাফুফে? কিইবা দিয়েছে মেয়েদের! নেই কোনো খেলা, নেই ভালো বেতন, নেই ভালো খাবারও। বাফুফে ভবনে থেকে শুধু তারা ঘামই ঝরিয়ে যাচ্ছে। 

গোলাম সারোয়ার টিপু আরও বলেন, আমার মনে হয় মেয়েদের ফুটবলের প্রতি বাফুফে ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলেছে। যে কারণে মেয়েদের ফুটবলকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না বাফুফে। মেয়েদের যে একটা ইউনিটি ছিল, সেই ইউনিটিটা মনে হয় ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, এখানে মানসিক একটা ব্যাপার আছে। সেটা যদি না থাকে, তাহলে মেয়েরা কীভাবে ফুটবল খেলবে! প্রি-অলিম্পিক খেলার জন্য মেয়েদের মিয়ানমার পাঠানো হলো না। অথচ পুরুষ দলকে সৌদি আরবে ক্যাম্প করানো হলো। সেটি হোক; বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দলের বাইরে অনুশীলন করার দরকার আছে। তবে মেয়েদেরকেও অন্তত একটু গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল। সেই গুরুত্বটা দিচ্ছে না বাফুফে। যে কারণে ধীরে ধীরে নারী দলটা ভেঙে যাচ্ছে। একের পর এক নারী ফুটবলার দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের আরেক সাবেক তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু বলেন, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল আমাদের দেশের গৌরব। তারাই ফুটবলে সাফল্য এনে দিয়েছে। আর সেই মেয়েরা ধীরে ধীরে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ফলে মেয়েদের ফুটবল ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। 

আশরাফ উদ্দিন চুন্নু আরও বলেন, যারা ফুটবল ফেডারেশনে কাজ করছেন, যারা এই দায়িত্বে আছেন, তারাই এর জন্য দায়ী। নারী ফুটবল দল সাফল্য পেয়েছে। সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এখন তাদের ধরে রাখতে পারছে না। এর ব্যর্থতার দায় তাদের নিতে হবে এবং জাতির সামনে তাদের জবাব দিতে হবে। কেন মেয়েরা ফুটবল থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে, এর জবাব অবশ্যই বাফুফে কর্তাদের দিতে হবে।

এদিকে এখন পর্যন্ত সাফজয়ী চার নারী ছেড়েছেন জাতীয় দল। গত সাত মাসে মূল একাদশের এই চার ফুটবলার চলে গেছেন। সাফজয়ী দলের আনুচিং মগিনি আর সাজেদা খাতুন ক্যাম্প থেকে বাদ পড়ে ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন আগেই। ক’দিন আগে বাফুফের ক্যাম্প ছেড়ে যান সাফজয়ী দলের আরেক সদস্য সিরাত জাহান স্বপ্না। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি বলেছেন, ফুটবল আর খেলবেন না। সর্বশেষ সাফজয়ী দলের আরেক সদস্য আঁখি খাতুনও ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছেন সিরাজগঞ্জের বাড়িতে। বলেছেন তিনি চীনে যাবেন। এরপর গত মাসে হঠাৎ নারী দলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনও। একের পর এক অভিযোগ বাসা বাঁধছে বাফুফে ভবনে। তবুও যেন দায়সারা ভাব বাফুফে কর্তাদের। ফলে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে খেলাপ্রেমীদের মধ্যে। আসলে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ভবিষ্যৎটা কী? নেই কোনো খেলা। 

এদিকে চলতি জুনের ৮ তারিখ থেকে চার দিনের ছুটি দেয়া হয়েছে সাবিনা-কৃষ্ণাদের। হঠাৎ ছুটির কারণ এখনো জানা যায়নি। ছুটি শেষে ৩২ ফুটবলার ক্যাম্পে ফিরেছেন। ফেরেননি তহুরা খাতুন ও আনাই মোগিনি। তাদের ছাড়াই অনুশীলন চলছে মেয়েদের। কোচ মাহবুবুর রহমানের আশা, শিগগিরই এ দুই ফুটবলার ক্যাম্পে যোগ দেবেন। জানা গেছে, তহুরা জ্বর ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। দু-একদিনের মধ্যে তিনি ক্যাম্পে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন। আনাই মোগিনি শুক্রবারের (গতকাল) মধ্যে ক্যাম্পে যোগ দেবেন বলেছেন। এই দুজন ক্যাম্পে না ফেরায় সংশ্লিষ্টরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। কারণ, আগেই ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছেন আনুচিং মোগিনি ও সাজেদা খাতুন। পরে হতাশায় সিরাত জাহান স্বপ্না ও আঁখি খাতুনও ক্যাম্প ছেড়েছেন। তবে বিশ্বস্ত এক সূত্রে জানা গেছে, বাফুফে ভবনে আর ফিরবেন না আনাই মোগিনি। 

বাফুফের ক্যাম্প ছেড়ে মেয়েদের চলে যাওয়া এবারই নতুন নয়। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডালিয়া আক্তার। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি ফুটবল ছেড়ে দেন। কিছুদিন হ্যান্ডবল খেলেছেন; এরপর শুরু করেন কোচিং। কিন্তু কেন তার এমন পরিণতি? শুধু ডালিয়া নন; আরও অনেক সম্ভাবনাময় তরুণী অল্প বয়সেই ঝরে পড়েছেন। অম্রাচিং মারমা; সাফ ফুটবলে গোল করেছেন এই তারকা। ফুটবল ছেড়েছেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে। সাবিনা খাতুন, জাতীয় দলের নিয়মিত ফুটবলার। তাকে বলা হয় নারী ফুটবলের সাকিব আল হাসান। তবে জাতীয় দলের খেলা না থাকায় তিনি বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে নতুনভাবে খেলোয়াড় হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে তাগাদা দিয়েছে বাফুফে। জয়া চাকমা, ২৮ বছর বয়সের এই সাবেক নারী ফুটবলার বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে রেফারির দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তিনি ফুটবল ছেড়েছেন ২০১২ সালে, অর্থাৎ মাত্র ২২ বছর বয়সে।