এজেন্সিরা যাতে এখানে এসে লাইনে ভিড় না জমায় আমরা সেদিকে মনোযোগী হবো
—শহিদুল আলম, এনডিসি, মহাপরিচালক, বিএমইটি
বিদেশগামীদের সব সেবা অনলাইনে হলে আমাদের জন্য সহজ, ব্যক্তির জন্যও সহজ
—সাজ্জাদ হোসেন সরকার, উপপরিচালক, বিএমইটি
অতিরিক্ত টাকা দিলেই সেবা মেলে বিএমইটিতে। পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বিদেশ গমনেচ্ছুদের। ব্যক্তি কিংবা এজেন্সি সবাই দালালের খপ্পরে জিম্মি। গত বৃহস্পতিবার বিএমইটির দ্বিতীয় তলায় সরেজমিন দেখা গেছে, অন্তত শতাধিক মানুষের দীর্ঘ লাইন। সবার হাতে একটি ফাইল। অপেক্ষা কর্মকর্তাদের কক্ষে প্রবেশের। অনলাইনে সেবা থাকলেও ঝুঁকির ভয়ে ম্যানুয়ালিই ক্লিয়ারেন্স নিতে এসেছেন সবাই। কিছুক্ষণ পরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কিছু এজেন্সিরনাম ডেকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অপেক্ষমাণ বিভিন্ন এজেন্সির লোকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সসহ নাগরিক সম্পৃক্ত চারটি পরিষেবাকে ডিজিটাইলেশনের আওতায় আনে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো-বিএমইটি। এই সেবাগুলোর মধ্যে বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেইনিং কোর্স ও সার্টিফিকেট, পিডিও সেশন বুকিং এবং বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স অন্যতম। এর মধ্যে প্রথম তিনটি অনলাইনের মাধ্যমে সমাধান করতে পারলেও ক্লিয়ারেন্সের বিষয়টি জটিল হয়ে যাচ্ছে। এজেন্সিদেরও সময় মতো দেয়া হচ্ছে না ক্লিয়ারেন্স। এতে বিদেশযাত্রীদের যেকোনো ঝুঁকির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তাই এজেন্সিগুলো ফাইল নিয়ে সকাল থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা টাকার জন্য এই সিন্ডিকেট ও পরিস্থিতি গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এজেন্সিদের জনপ্রতি ক্লিয়ারেন্সে দুই-তিন হাজার টাকা দিতে হচ্ছে বলেও জানান তারা।
গত বৃহস্পতিবার সকালে গুলশান একটি এজেন্সি থেকে কাকরাইল এসেছে আলী হোসেন। তখন আলীর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, তার কোম্পানি থেকে ১৫ জনের ক্লিয়ারেন্স নিতে এসেছেন তিনি । অনলাইনে আবেদন করা হয়। তবে সেখানে সময় বিলম্বিত হতে পারে। ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো কারণে সময় মতো ক্লিয়ারেন্স না পেলে ফ্লাইট মিস হওয়ারও চিন্তা থাকে। গত ছয় মাস আগে তার কোম্পানিতে এমন একটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। শেষ সময়ে এসেও ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়নি। পরে অনেক ঝটিলতা মোকাবিলা করে সব ঠিক করা হয় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। সেই থেকে অনলাইনের ওপর আর ভরসা করে বসে থাকা হয় না। সরাসরি সব কাগজপত্র নিয়ে বিএমইটিতে চলে এসেছি। প্রতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু চার্জ দিয়ে এজেন্সির মাধ্যমে সব ঠিক করা হয়।
আলী হোসেনের অভিযোগ, এখানে এসেও লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয় তীব্র গরমে। এর মধ্যে সিরিয়ালে থেকেও উপরের মহল থেকে ফোন এলে কিছু এজেন্সির কাগজপত্রে সিরিয়াল ভঙ্গ করে স্বাক্ষর দিয়ে দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল যুগেও সেবা না পেয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, টাকা ছিটালে সব নিয়মই অনিয়ম হয়ে যাচ্ছে। ইয়াছিন আরাফাত নামের কিশোরগঞ্জের এক বিশ্ববিদল্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গেও কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, বিদেশ যেতে চারটি ধাপের তিনটি ধাপ তিনি অনলাইনের মাধ্যমে শেষ করেছেন। তাও অনেক বিলম্বিত হয়েছে। এখন স্মার্ট কার্ড পেতে যে ক্লিয়ারেন্স দরকার সেটি দেয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এজেন্সি কিংবা সরাসরি বিএমইটিতে আসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তবে একাখানে সশরীরে এসেও তার কাজ সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জানান, এখানে আসার আগে একটি এজেন্সির বড় ভাই বিএমইটির এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তাকে সুনির্দিষ্ট একটি টাকার অংক দেয়ার মাধ্যমে তার কাজটি সম্পাদিত হচ্ছে। তবে কত টাকা দেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে ইয়াছিন বলতে রাজি হননি। তিনি আধুনিক যুগে এসেও পুরনো পদ্ধতিতে কাজের ধরন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএমইটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে এটি আমাদের মধ্যেই ঝামেলা, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়া তো সরকার শুরুই করেছে, আর আমরা আছি শুধু আমাদের ভাগ নিয়ে। এখনে কর্মকর্তারা ইচ্ছে করেই অনলাইনে ক্লিয়ারেন্সের ঝামেলা বাধায় যেন মানুষ এটি অনলাইন থেকে না নেয়।’ এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বা কোনো কোনো সময় আরো বেশি টাকা নেয়। আর এ জন্য নন এটাস্টেডে আর এটাস্টেড স্মার্টকার্ডের যে সামান্য সরকারি ফি আসে এটি দিয়ে অনেক টাকা নিজের পকেটে রাখতে পারে। এ কাজে কর্মকর্তারাই এজেন্সিগুলোর সহায়ক হিসেবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। বলেন, আপনি নিজে শুধু আপনার ফাইলটা নিয়ে যাবেন, তারা বলবে কোনো এজিন্সির মাধ্যমে যেতে। কারণ তারা এজেন্সির কাছে থেকে প্রত্যেক বইয়ের জন্য টাকা নেয়।
এ বিষয়ে বিএমইটির ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডার আমি প্রবাসী লিমিটেড জানান, ডিজিটাল ক্লিয়ারেন্সের জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিএমইটি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা আলাদা ইউজার আইডি দেয়া আছে। যা দিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তাদের ডিজিটাল সেবাগুলো নিতে পারবেন আর কর্মকর্তাদের আইডি দিয়ে আনলাইনে যে ফাইলগুলো জমা পড়েছে সেগুলোর বাছাইপূর্বক ত্বরিত অনুমোদন করতে পারবেন। ডিজিটালি অনুমোদন শেষে একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের নিজেরাই তাদের স্মার্টকার্ড ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। সেটি বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসে ডাউনলোড করতে পারবেন। সুতরাং এই প্রক্রিয়ায় সত্যিকার স্মার্টকার্ড পাচ্ছেন বিদেশেগামী কর্মীরা। আর স্মার্ট অভিবাসনের মধ্য দিয়েই স্মার্ট বাংলাদেশের যাত্রা, সেটি এই অভিবাসনের হাত ধরেই। তবে বেশির ভোগ সেবাগ্রহীতা ডিজিটাল এই প্রক্রিয়ায় ক্লিয়ারেন্স নিতে আগ্রহী নন। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় ক্লিয়ারেন্সের জন্য অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয় এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। এ দিকে দীর্ঘদিন থেকে সরকারের নির্দেশিত রোডম্যাপ ছাড়া অবৈধ সার্টিফিকেটে বিদেশে গিয়ে প্রবাসে অনিশ্চয়তায় পড়ে বহু নারী। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে টনক নড়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। মন্ত্রণালয় থেকে নারীদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক করে গত মাসে ৯ তারিখে একটি চিঠি দেন প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মূলত এরপর থেকেই কমতে শুর করে নারীদের বিদেশ যাত্রার ক্লিয়ারেন্স। বিএমইটির এক পরিসংখ্যান এ দেখা যায় নারীদের অনলাইন ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক করার আগে নারীদের ক্লিয়ারেন্সের হার ছিল অনেক বেশি। আর অনলাইন ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক করার পর থেকে সে হার কমে সর্বশেষ চলতি মাসে (জুন) ৫৪০ এ নেমে এসেছে। যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিল ছয় হাজার ৬৮৬টি , ফেব্রুয়ারি ৯ হাজার ২৯টি, মার্চ ৯ হাজার ১১৮টি , এপ্রিল ছয় হাজার ৬৩৯টি এবং মে মাসে চার হাজার ৭৪টি । এ ছাড়া গত বছর ২০২২ সালের পরিসংখ্যান দেখা যায় জানুয়ারিতে ছিল ১০ হাজার ২৮৮টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১০ হাজার ৬১০টি, মার্চ মাসে ১১ হাজার ২০৯টি, এপ্রিল মাসে ১১ হাজার ৪৯৭টি, মে মাসে ছয় হাজার ৭৫৩টি, জুন মাসে ১০ হাজার ৪৮৮টি, জুলাই ছয় হাজার ২৭৫টি, আগস্ট মাসে ৯ হাজার ৪৫২টি, সেপ্টেম্বর ৯ হাজার ২১৬টি, অক্টোবর আট হাজার ৯৭টি, নভেম্বর ছয় হাজার ৩৫৩টি, ডিসেম্বর পাঁচ হাজার ২৫৩টি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক শহিদুল আলম এনডিসি আমার সংবাদকে বলেন, ‘আসলে এক দিনে তো আর ৫০ বছরে রীতিনীতি বদলে ফেলা যায় না। আমাদের অবশ্য একটি জিনিস মাথায় রাখতে হয়, ব্যক্তি উদ্যোগে যদি কাজগুলো হয়ে থাকে তাহলে ঝুঁকি থাকে। ব্যক্তি কার কাছে যাবে ধরনা দেবে। যদি কোনো ঝুঁকিতে পড়ে। কিন্তু এজেন্সির মাধ্যমে হলে বা কোনো খপ্পরে পড়লে এজেন্সি পুরো দায়ভারটা নেবে। এ জন্য আমাদের দেশের সুনামের জন্য আমরা এজেন্সিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তবে এজেন্সির মাধ্যমে যে টাকা লেনদেন হয় এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা আমাদের দেশের ভাবমূর্তি যাতে বিদেশে মাটিতে মর্যাদাহানি না হয় সে জন্য আমরা স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। করোনা-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই বিদেশে শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়া মানুষজনও দেশের বাইরে যেতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। এ জন্য ক্লিয়ারেন্স নিতে এসে একটু কষ্ট হচ্ছে, লাইনেও দাঁড়াতে হচ্ছে আমরা আসা করব ডিজিটালের ছোঁয়ায় এটিও কমে আসবে। এজেন্সিরা যাতে এখানে এসে লাইনে ভিড় না জমায় আমরা সেদিকে মনোযোগী হবো।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, কিছু অভিযোগ আসে যার কোনো বাস্তবতা নেই। আমি দৃঢ়তা সাথে বলতে পারি, আমি দায়িত্বে আসার পর কাজের গতি তিন থেকে চারগুণ বেড়েছে, ভোগান্তি অনেক কমে এসেছে।’
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উপপরিচালক সাজ্জাদ হোসেন সরকার আমার সংবাদকে বলেন, ‘আধুনিক যুগে এসেও দীর্ঘ লাইন বা এজেন্সির মাধ্যমে অ্যানালগ পদ্ধতিতে সমাধানে যে বিষয়টি বলেছেন, এটি আসলে আমাদের চোখেও পড়েছে। আসলে এর সমাধান কিংবা উত্তর আমি দিতে পারব না। আমাদের উপরের কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। এটি আরো কিভাবে সহজ করা যায়, দীর্ঘ লাইন বা কিছু অভিযোগ তা থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়। যাতে আমাদের জন্যও সহজ হয়। কিংবা যারা বিদেশ যাবেন তাদের জন্যও সহজ হয়। ডিজিটাল মাধ্যমকে আরো কিভাবে বেশি ব্যবহার করা যায়। আর আমি আসলে সবগুলো সাইট দেখি না আমি মালয়েশিয়ার বিষয়টি দেখি। অন্য যারা ওমান, কাতার রয়েছে সেগুলো অন্যরা চেক করে। আমি আমার এখানে যেগুলো আসে সঠিক আছে কি-না বা অ্যাম্বাসির বিষয় যেগুলো জড়িত আমি সেগুলো দেখি, সহজে কাজ সম্পাদন করি। এটাস্টেশনের বিষয়টি আরো কিভাবে সহজ করা যায় বা অনলাইনে কিভাবে পরিপূর্ণ করা যায় এটি আমাদের সিনিয়ররা হয়তো খুব দ্রুতই সমাধান করতে পারবেন।