ঢাকা-১৭ আসনে আজ ভোট। লড়াই করছেন নয়া আট মুখ। এবার ভোটারদের অধিকাংশই নতুন প্রার্থীদের চেনেন না। যদিও গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে আগে লাঙল প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজেপির আন্দালিভ রহমান ও সর্বশেষ পরিচিত মুখ চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। ঢাকার এ আসনে সব সময় ভোটাররা পরিচিত ও হেভিওয়েট প্রার্থী পেলেও এবার নতুন মুখ নির্বাচিত হওয়ার অপেক্ষায়। জাতীয় নির্বাচনের আগে অল্প সময়ের জন্য হওয়া ভোটে ভোটারদের আগ্রহ কম থাকলেও নির্বাচন কমিশনের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের। এ ভোটে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী নির্বাচনি পরিবেশকে সন্তোষজনক বললেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রচারণা চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন এক প্রার্থী। আরো একাধিক প্রার্থী হুমকি পেয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন।
তবে নির্বাচনি পরিবেশ সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসাইন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সন্ধ্যায় ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবীবুল আউয়াল। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি কেন্দ্র চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেয়া হয়েছে। ১০ প্লাটুন বিজিবিসহ দায়িত্ব পালন করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ভোট হবে ১২৪টি কেন্দ্রের ৬০৫টি কক্ষে। প্রতিটি কেন্দ্র থাকবে সিসিটিভি ক্যামেরা। ব্যালট পেপার দেয়া হবে ভোটের দিন ভোর ৫টায়। গতকাল বিকেল ৪টার মধ্যে সব কেন্দ্র পৌঁছে দেয়া হয় সরঞ্জাম। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে নির্বাচনি এলাকায় ৭২ ঘণ্টার জন্য মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ নিরপেক্ষ হবে এবং জাতীয় নির্বাচনে আগে এটি হবে একটি মডেল নির্বাচন বলেও জানান মনির হোসাইন খান। আজ একই দিন দেশের মোট ৭৮টি স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগে স্বস্তি থাকলেও বিরোধী শিবিরে অস্বস্তির ছাঁয়া। অধিকাংশ প্রার্থী মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনকে ট্রামর্কাড হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন সফররত ইইউ প্রতিনিধি দল। আজ উপনির্বাচন চলাকালীন সময়েও দেশেই অবস্থান করবেন তারা। তারা দেশে থাকা ও জাতীয় নির্বাচনের আগে এই উপনির্বাচনকে বিতর্কিত করবে না সরকার এমনটিই মনে করেন নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীরা।
জাতীয় পার্টি মনোনিত প্রার্থী মেজর (অব.) আনিছুর রহমান আমার সংবাকে বলেন, দু’-একটি কেন্দ্রে বিশেষ দলের কর্মীরা আমাদের কর্মীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। অনেক জায়গায় কালো টাকা ছড়ানোর খবর পাচ্ছি, তবে এখন পযর্ন্ত নির্বাচনি পরিবেশ ভালো দেখছি। আমি কোনো চাপ বা অস্বস্তি বোধ করছি না।’ তিনি আরো বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচন নিয়ে সরকার কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াবে, আমি সেটি মনে করি না।’
জাকের পার্টি মনোনিত প্রার্থী রাশেদুল হাসান রাশেদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় পেশিশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা কেন্দ্রভিত্তিক যে ক্যাম্পগুলো করব সেখানে আমাদের বাধা দেয়া হচ্ছে। বাড়িওয়ালাদের বলা হয়েছে, যেন ক্যাম্পের জন্য ঘর না দেয়া হয়। বিভিন্ন স্থানের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এজেন্টদের টাকার লোভ দেখানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি।’
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের প্রার্থী আক্তার হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, ‘এখন পযর্ন্ত পরিবেশ ভালো দেখছি, তবে সুষ্ঠু ভোট হবে কি-না এখনো বলা যাচ্ছে না। আমাদের এজেন্ট বা অন্যান্য কোনো সমস্যা এখনো দেখছি না। এখন পযর্ন্ত মনে হচ্ছ সরকার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। এদিকে নির্বাচনে অব্যবস্থাপনা ও অসহযোগিতার অভিযোগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি গতকাল ১৬ জুলাই লিখিত চিঠির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে নির্বাচনের দিন নিজের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। এ সময় তরিকুল আমার সংবাদকে বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। ল্যামেনেটিং পোস্টার করা হয়েছে, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়েছে। প্রচারণায় বাধা গেয়া হয়েছে কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমি বেশ কয়েকবার নির্বাচন কমিশনে এলেও রিটার্নিং কর্মকর্তার দেখা পাইনি। আমি কোনো নির্বাচনি সহযোগিতা পাচ্ছি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। অনেক প্রার্থী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ভোট দিলেও তারা জিতবে আর ভোট না দিলেও তারা জিতবে— এমন পেক্ষাপটে আমি নির্বাচনের দিন বেলা ১১টা পর্যন্ত দেখব। পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়াব।’
তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী শেখ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনি পরিবেশ ভালো, দু’-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা চোখে পড়েনি। আশা করি, সরকার সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেবে।’ এদিকে নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমার নির্বাচনি এজন্টদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমি সুষ্ঠু একটি নির্বাচনি পরিবেশ চাই।’ একই সাথে নির্বাচনের আগের রাতে কেন্দ্রে ব্যালট পেপার না দেয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
অবশ্য আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, সুন্দর একটি নির্বাচনি পরিবেশ বিরাজ করছে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। সব প্রার্থী সুন্দরভাবে প্রচারণা চালিয়েছে। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। মানুষ নৌকাকে ভোট দেবে, শেখ হাসিনাকে ভোট দেবে।’ তিনি আরো বলেন, ঢাকা-১৭ উপনির্বাচনে নৌকা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।’ আশা করি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সুষ্ঠু ও সুন্দর একটি নির্বাচন দেখবে ঢাকাবাসী।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়াম্যান প্রফেসর নাজমুল অহসান কলিম উল্লাহ আমার সংবাদকে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনটি অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ বহন করে। এই উপনির্বাচনে যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি খুবই অল্প সময়ের জন্য নির্বাচিত হবেন। যেহেতু আজ নির্বাচন সে কারণে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তেমন কিছু বলতে চাই না যেটি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে। অনেক সময় বর্ষা উপেক্ষা কর প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। এখন পর্যন্ত ভালো পরিবেশ রয়েছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
গত ১৫ মে চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান (ফারুক) মারা যাওয়ার পর আসনটি শূন্য হয়। নির্বাচন কমিশন এই উপনির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করে ব্যালটের মাধ্যমে ভোট নিতে যাচ্ছে। তবে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা থাকবে। এ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ২৫ হাজার ২০৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার এক লাখ ৫৩ হাজার ৫৮০। ১২৪টি ভোটকেন্দ্রের ৬০৫টি ভোটকক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে।
ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন আটজন। তাদের মধ্যে দলীয় প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী আরাফাত, জাতীয় পার্টির সিকদার আনিসুর রহমান, জাকের পার্টির কাজী মো. রাশিদুল হাসান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. রেজাউল ইসলাম স্বপন ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের মো. আকবর হোসেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. আশরাফুল আলম (হিরো আলম) ও মো. তারিকুল ইসলাম।