স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্ত উত্তরণ দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় মাইলফলক হলেও বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় তা এক গভীর মহাসংকটের রূপ নিয়েছে।
জাতিসংঘের নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী, আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসেই এই রূপান্তর সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক মন্দা ও ডলার সংকটের মুখে বাংলাদেশ এই সময়সীমা পিছিয়ে দেয়ার জন্য জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানালেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মের মারপ্যাঁচে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত।
এমন এক অগ্নিপরীক্ষার মুহূর্তে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় ‘এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি’র বিষয়টি স্থান না পাওয়া দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উত্তরণের সাথে সাথেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা (জিএসপি) হারাবে, সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হবে এবং তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি ও কৃষি খাতে নগদ ভর্তুকি বা প্রণোদনা বন্ধ করতে হবে।
এই আসন্ন ধাক্কা সামলাতে যদি বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও আলাদা ‘রোডম্যাপ’ এবং বিশেষ তহবিল ঘোষণা না করা হয়, তবে সক্ষমতার ঘাটতি ও নীতিগত সংস্কারের অভাবে দেশের রপ্তানি খাত মুখ থুবড়ে পড়বে, যা সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক অপূরণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সাজাতে সরকার যে ১৩টি প্রধান খাতকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে, তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ‘এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি’র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকারের এই উদাসীনতা শিল্প, কৃষি এবং সেবা- সব খাতেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিনআহমেদ এই বিষয়ে তার অভিমত ব্যক্ত করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউএনসিটিএডি আমাদের এই উত্তরণ অনুমোদন করবে- এমন বিশ্বাস বেসরকারি খাতের আছে। কিন্তু গত ৩ বছরের টাইমলাইনে আমাদের যে ধরনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা ছিল, আমলাতান্ত্রিক ও কৌশলগত কারণে আমরা তা করতে পারিনি। এলডিসি উত্তরণ শুধু সরকারের বিষয় নয়, এটি সফল করতে বেসরকারি (প্রাইভেট) ও সরকারি (পাবলিক) খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। যার প্রতিফলন আসন্ন বাজেটে থাকা বাধ্যতামূলক।’
একই সুর শোনা গেছে ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদের কণ্ঠেও। তিনি দ্রুত রেগুলেটরি রিফর্ম বা আইনি কাঠামোর সংস্কারের তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মকানুন পুরোপুরি বদলে যাবে। অনেকগুলো রেগুলেটরি রিফর্মের ব্যাপার আছে যেগুলো আমরা এখনো করতে পারিনি। এই পরিবর্তনগুলো আগামী নভেম্বর মাসে উত্তরণ হোক বা না হোক, অবিলম্বে শুরু করা উচিত এবং বাজেটে এর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা দরকার।’
অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, উত্তরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানোর প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই অনেক দেরি করে ফেলেছে।
তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা যে শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি) হারাবো, তা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ আরও চার থেকে পাঁচ বছর আগে শুরু করা উচিত ছিল। এক বাজেটে এই ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়, এটি ধারাবাহিক কয়েক বছরের প্রক্রিয়াসাপেক্ষ বিষয়।’
মাসরুর রিয়াজ আরও যোগ করেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পরে আমরা ঠিক কী ধরনের সক্ষমতার অভাবে ভুগবো, আমাদের সক্ষমতার গ্যাপগুলো কোথায়, তা পূরণে সরকারের ও বেসরকারি খাতের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী হবে- এই নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট কৌশল বা রোডম্যাপ এখনো সরকারের তরফ থেকে দেখা যায়নি। আসন্ন বাজেট থেকেই এই সুনির্দিষ্ট কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।’
উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়া গৌরবের হলেও এর অর্থনৈতিক খেসারত অনেক চড়া। এলডিসি উত্তরণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে— রপ্তানি বাজারে শুল্ক সুবিধা বিলোপ: বর্তমানে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পায়, তা বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে রপ্তানি পণ্যের ওপর প্রায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হবে, যা তৈরি পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেবে।
সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি হ্রাস: বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা জাইকার মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো থেকে বাংলাদেশ আর স্বল্প সুদে ও দীর্ঘমেয়াদি নমনীয় ঋণ পাবে না। বাণিজ্যিক শর্তে চড়া সুদে ঋণ নিতে হবে, যা বৈদেশিক ঋণের বোঝা আরও বাড়াবে। ভর্তুকি হ্রাসের চাপ: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলো স্থানীয় শিল্প বা কৃষি খাতে সরাসরি নগদ সহায়তা বা রপ্তানি ভর্তুকি দিতে পারে না।
ফলে পোশাক খাত ও কৃষি খাতে সরকারের দেয়া প্রণোদনা বন্ধ করতে হবে, যা স্থানীয় উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেবে। মেধাস্বত্ব আইনের কড়াকড়ি: এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পে প্যাটেন্ট বা মেধাস্বত্ব আইন ছাড় পেয়ে আসছে, যার কারণে সস্তায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন সম্ভব হয়। উত্তরণের পর এই সুবিধা না থাকায় ওষুধের উৎপাদন খরচ এবং বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা এলডিসি থেকে বের হই বা সময় বাড়িয়ে নিই, প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। কৌশলগত প্রস্তুতি এবং তা বাস্তবায়নের দিক থেকে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি। বাজেট প্রক্রিয়ায় এই কৌশলটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যুক্ত করা এবং এর পেছনে মনোযোগ দেয়া এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় মাইলফলক হলেও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এতে পদার্পণ করা হবে আত্মঘাতী। সময়সীমা পেছানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করা হলেও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও নিয়মের মারপ্যাঁচে তা নিশ্চিত নয়। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটই হতে পারে এই ধাক্কা সামলানোর প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার।
সরকারের উচিত হবে প্রথাগত আয়-ব্যয়ের হিসাবের বাইরে গিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী বাজেটে এলডিসি উত্তরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘ডেডিকেটেড রোডম্যাপ’ ও বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষায় আইনি সংস্কারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা যদি এই বাজেটে না থাকে, তবে দেশের শিল্প উৎপাদন ও বৈদেশিক বাণিজ্য এক অপূরণীয় সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।