জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২৩, ১১:২২ পিএম
  • রাজপথ দখলে মরিয়াসরকার ও বিরোধীরা
  • সুষ্ঠু নির্বাচনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ জাতিসংঘের

দিন যত যাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততই গোলাটে হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করছে। বিরোধী দলগুলো প্রতিদিনই সরকারের পদত্যাগ চেয়ে রাজপথে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ করছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগের মিত্র দলগুলোও রাজপথে পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকছে। রাজনৈতিক দলের এমন পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে পরিস্থিতি সামলাতে চাপে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপরাধ দমনের চেয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। 

তা ছাড়া বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা (রাষ্ট্রদূত) বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ করছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইইউ কানাডা ও ব্রিটেন বেশি তৎপর। সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে সরব অবস্থানে রয়েছে জাতিসংঘও। এমন পরিস্থিতি দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে টেনশন বিরাজ করছে। তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা ও দমনের নামে কোনো সহিংসতা চান না। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। 

এখন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলই সক্রিয়। এককভাবে ও জোটগতভাবে দল এবং জোট কর্মসূচি পালন করে আসছে। এতদিন যারা নিষ্ক্রিয় ছিল এখন তারাও সক্রিয়। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এতদিন বিরোধী দলকে এককভাবে মোকাবিলা করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি ১৪ দলীয় জোটকে সক্রিয় করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের ডেকে তিনি তাদের কথা শোনেন এবং একসঙ্গে নির্বাচন ও সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু ?অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ১৪ দলের একটি সভা হয়। ওই সভায় ঢাকা মহানগর ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সভায় ১৪ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। গতকালকের এই সভা থেকে আগামী ৭ আগস্ট ঢাকায় সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয় ১৪ দলীয় জোট। ওই দিন বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই সমাবেশ হওয়ার কথা। আন্দোলনের নামে বিএনপির ‘সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের’ প্রতিবাদে সপ্তাহব্যাপী সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিক্ষাভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

এদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়ের প্রতিবাদে রাজধানীল নয়াপল্টনে সমাবেশে করে বিএনপি। বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে বিএনপি নেতাকর্মীরা এই বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে, গতকাল শুক্রবার ঢাকায় সমাবেশে করতে চেয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু পুলিশ তাদের অনুমতি দেয়নি। ফলে দলটি রাজধানীর কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ করে। সমাবেশের অনুমতি না পেয়ে ৬ আগস্ট রোববার বিভাগীয় শহরে বিক্ষোভের ডাক দেয় দলটি। এ ছাড়াও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল গতকাল রাজধানীতে কর্মসূচি পালন করে। গত ২৯ জুলাই শনিবার রাজধানী ঢাকার প্রবেশ পথগুলোতে অবস্থান নেয় বিএনপি। এতে বাধা দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ওই দিন সংঘর্ষ হয়। বিএনপির সিনিয়র নেতারাও আহত হন। ওই ঘটনার সপ্তাহ না যেতেই সরব হয় জাতিসংঘ। ‘বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব রাজনৈতিক দল, তাদের সমর্থক ও নিরাপত্তা বাহিনীকে একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

 গতকাল শুক্রবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনের মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সামপ্রতিক মাসগুলোতে বিরোধীদের বেশ কয়েকটি সমাবেশ ঘিরে দফায় দফায় সহিংস পরিস্থিতি দেখা গেছে, যেখানে পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। বিক্ষোভকারীদের মারধর করতে সাধারণ পোশাক পরিহিত লোকজনের পাশাপাশি পুলিশকে হাতুড়ি, লাঠি, ব্যাট ও রড ব্যবহার করতে দেখা গেছে। বিরোধীদলীয় অনেক সমর্থক এবং পুলিশের কিছু সদস্য এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন। বিরোধীদলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর করা হয়েছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য পরিচয়ে তাদের ঘরবাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। সমাবেশের আগে ও সমাবেশের সময় বিরোধী দলের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জেরেমি লরেন্স বলেন, কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তাদের মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে এবং জনগণকে তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মত ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দিতে হবে এবং তৃতীয় পক্ষের দ্বারা সেই অধিকারগুলোর প্রয়োগকে দমন বা সীমিত করার প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা করার জন্য কঠোরভাবে কাজ করতে হবে। আমরা পুলিশকে এটি নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করছি যে, শুধু কঠোরভাবে প্রয়োজন হলেই যেন বলপ্রয়োগ করা হয় এবং যদি বলপ্রয়োগ করতেই হয়, তবে বৈধতা ও সংযমের নীতিগুলো যেন মানা হয়। অতিরিক্ত বল প্রয়োগের ঘটনা অবিলম্বে তদন্ত করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।