বকেয়া প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা
অযৌক্তিক সুদের দাবি মানা উচিত হবে না। ব্যবসায়ীদের দাবি মানলে তার চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর
—এম শামসুল আলম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
দেরি করে বিল পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। সে কারণে সুদ
চাওয়া হয়েছে
—ফয়সাল খান, সভাপতি, বিপ্পা
ডলার ঘাটতির পর এবার ‘টাকা’ সংকটও পড়ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎই কিনতে হচ্ছে ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস (আইপিপি) ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে। অর্থ সংকটে প্রকট আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ খাতে। ফলে বেসরকারি খাতের রেন্টাল-কুইক রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলোর বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। এতে গুনতে হচ্ছে জরিমানা। সূত্র মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ৮৫ হাজার ৬০৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে নেয়া হয় ৪০ হাজার ১৭৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। বেশি মূল্যের এ বিদ্যুৎ নিতে গিয়ে বিপিডিবিকে গুনতে হয়েছে এ খাতে মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চুক্তি মোতাবেক আইপিপিগুলো থেকে কেনা বিদ্যুতের বিল ৪৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয় পিডিবিকে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে সময়মতো ভর্তুকি না পাওয়ায় ছয় মাসেও বেসরকারি মালিকদের টাকা দিতে পারছে না সংস্থাটি। ফলে ব্যাংক আমানতের সুদহারের (৬ শতাংশ) সঙ্গে দুই শতাংশ যোগ করে (৮ শতাংশ) জরিমানা সুদ গুনতে হয় পিডিবিকে। বিপ্পা জানিয়েছে, গত নভেম্বর থেকে বিল বকেয়া রয়েছে। পিডিবির তথ্য, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। বিপ্পা এই বকেয়া টাকার ওপর সুদ বাবদ প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা দাবি করেছে। যদিও পিডিবি বলছে, পিপিএ (বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি) অনুসারে বিলম্বে বিল প্রদানের জন্য সুদ পরিশোধের নিয়ম নেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গত এক যুগে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকরা শুধু ভাড়া হিসেবেই সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন এক লাখ কোটি টাকা। এখন বকেয়ার ওপর সুদ দিতে গেলে সরকারের খরচ আরও বাড়বে। যেহেতু বেসরকারি কেন্দ্রের বিল ডলারে দিতে হয়, তাই এমন সুযোগ সরকারের ডলার সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। বিপ্পার পাশাপাশি বিলের ওপর সুদ দাবি করে ইতোমধ্যে পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে কনফিডেন্স পাওয়ার, সামিট পাওয়ার, ঢাকা সাউদার্ন পাওয়ারসহ (ডরিন গ্রুপ) আরও কিছু কোম্পানি। বগুড়া-২ কেন্দ্রের বকেয়া বিলের জন্য ৭.৬৯ থেকে ৮.৬৮ শতাংশ হারে সুদ দাবি করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার। গত নভেম্বরে দেয়া চিঠিতে কোম্পানিটি বকেয়া বিলের জন্য সুদ হিসেবে ১১ কোটি ১১ লাখ টাকা দাবি করেছে। ঢাকা সাউদার্ন পাওয়ারের ৫৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রের গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা বাড়তি চেয়ে সুদ দাবি করেছে ডরিন গ্রুপ। সামিট পাওয়ার গাজীপুরের ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৮৫ কোটি ৭১ লাখ কোটি টাকা চেয়েছে।
পিডিবির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এতে দেখা যায়, বিলম্বে বিল পরিশোধের জন্য ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরের বিলম্ব সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরই অর্ধেকের বেশি তথা এক হাজার ৮২১ কোটি টাকা জরিমানা সুদ দিতে হবে পিডিবিকে। যদিও আমানতের সুদহার উন্মুক্ত করে দেয়ায় আগামীতে জরিমানা সুদহার আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে রেন্টাল ও আইপিপির বিল বকেয়া ছিল এক দশমিক ৫৫ মাসের। ওই বছর মাসিক গড় বিলের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে রেন্টাল ও আইপিপির বিল বকেয়ার পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় এক দশমিক ৩৩ মাস। তবে ওই বছর মাসিক গড় বিলের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে রেন্টাল ও আইপিপির বিল বকেয়ার পরিমাণ বেড়ে হয় এক দশমিক ৯৬ মাস। তবে ওই বছর মাসিক গড় বিলের পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে সামান্য কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে রেন্টাল ও আইপিপির বিল বকেয়ার পরিমাণ আবার কমে হয় এক দশমিক ৫৭ মাস। তবে ওই বছর মাসিক গড় বিলের পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে বেশ কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছর শেষে রেন্টাল ও আইপিপির বিল বকেয়ার পরিমাণ বেশ কিছুটা বেড়ে হয় দুই দশমিক ৫১ মাস। ওই বছর মাসিক গড় বিলের পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে বেশ কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে রেন্টাল ও আইপিপির বিল বকেয়ার পরিমাণ আরও বেড়ে হয় চার দশমিক ২৫ মাস। ওই বছর মাসিক গড় বিলের পরিমাণ আগের অর্থবছরের চেয়ে বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। এতে বিদায়ী অর্থবছর জুন শেষে মোট বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। আট শতাংশ সুদে এর ওপর পিডিবিকে জরিমানা সুদ দিতে হবে এক হাজার ৮২১ কোটি টাকা। তার মানে, গত অর্থবছর পিডিবির জরিমানা সুদ ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপিডিবির নিজস্ব ও যৌথ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ নেয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। মূলত বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আর্থিক মুনাফা করতেই বিপিডিবি পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়েছে বলে তাদের দাবি।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ও সামিট গ্রুপের পরিচালক ফয়সাল খান বলেন, অর্থ সংকটে তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ৩০ দিনের বিল ১৮০ দিনেও পাওয়া যাচ্ছে না। দেরি করে বিল পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারণ ডলার বেশি দামে কিনতে হয়। বেসরকারি মালিকরা বিলম্বে বিলের কারণে চার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছেন। শুধু সামিট পাওয়ারের লোকসান হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। লোকসান পোষাতে সুদ চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিপিএতে বিল বকেয়া হলে সুদের কথা বলা আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সরকারঘনিষ্ঠ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের পকেট ভারী করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়েছে। এর পরও ব্যবসায়ীরা সুযোগ চাচ্ছেন। এসব অযৌক্তিক দাবি মানা কখনোই উচিত হবে না। ব্যবসায়ীদের দাবি মানলে তার চাপ গিয়ে পড়বে ভোক্তাদের ওপর। বেসরকারির ওপর বিদ্যুৎ খাত নির্ভরশীল হবে, এ খাতের পলিসি অনুযায়ী এটিই স্বাভাবিক।