প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য

সৈয়দ সাইফুল ইসলাম প্রকাশিত: আগস্ট ২৩, ২০২৩, ১১:৩০ পিএম

নিজস্ব বিনিয়োগ রক্ষায় বিদেশিরা তৎপরতা চালান
—অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিজেদের মধ্যে বিভেদ থাকায় বিদেশিরা সুযোগ পান
—অধ্যাপক মোহাম্মদ রুহুল আমিন  আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিবেশী, মহল্লার মোড়ল বা মাতুব্বররা তখনই সমস্যা সমাধানের সুযোগ পান যখন একই পরিবারে ভাইয়ে-ভাইয়ে বা ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয়। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষকর্তা ব্যক্তিরা বসে সেটি সমাধান করে ফেললে প্রতিবেশী বা বাইরের মোড়েলদের নাক গলানোর সুযোগ থাকে না। দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এখন বিশ্বের প্রভাবশালী দেশের কূটনৈতিক এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা যে দৌড়ঝাঁপ করছেন তার সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলোই সৃষ্টি করে দিয়েছে। ফলে তারা নিজেদের স্বার্থ মাথায় রেখে তৎপরতা চালান। নির্বাচন নিয়ে নিজেদের পলিসি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠেন। সুযোগ বুঝে হস্তক্ষেপও করেন। যা দেশের কারো জন্যই ভালো নয়। এতে আমাদের জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। জাতীয় নির্বাচন বা অন্য বিশেষ ইস্যুতে বিদেশি তৎপরতা রোধ করতে হলে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। কোনো সংকট তৈরি হলে তা নিজেরা বসে সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে জাতীয় সংলাপ আয়োজন করতে হবে। এতে বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ বন্ধ হবে। আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। 

প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনের আগেই অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ভোট আয়োজনে তৎপর হয়ে উঠে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো। এসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশি নিযুক্ত দূতরা নির্বাচন নিয়ে নানা তৎপরতা চালান। তারা দেশের সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের স্বার্থ ও পলিসির আলোকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রকাশ্যে নির্বাচন নিয়ে তাদের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে চাইবে, ভোট সেভাবে হবে’। তারা মুখে যাই বলে থাকেন বাস্তবে তারা নিজেদের দেশের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। 

গতকাল সচিবালয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এতে চীনের হস্তক্ষেপ করার কোনো কারণ নেই। এর আগে গত সপ্তাহেও একই কথা বলেছিলেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘চীন কখনোই কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে চীন। নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। চীন এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।’ বৈঠক শেষে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের (চীন) ভূমিকা খুবই পরিষ্কার। আমরা চাই, বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে যে দেশ কারা পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাই চান। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বটা তারা আরও বেশি এগিয়ে নিতে চায়, আমরাও চাই। এর আগে গত ৩ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নয়াদিল্লি চায় বাংলাদেশের নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দেশের জনগণের দ্বারা নির্ধারণ করা হোক। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রথম কোনো মন্তব্য করল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে চাইবে, সেভাবেই ভোট হবে। আমরা সেটাই মেনে নেব।’ তবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পুরো বছরজুড়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দেশ কথা বললেও এই ৩০ আগস্টই প্রথম ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রাথমিক মতামত ব্যক্ত করল। 

সম্প্রতি রাশিয়া বলেছে, বাংলাদেশে নির্বাচন কীভাবে হবে, সেটা দেশটির আইনেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। কাজেই বাংলাদেশে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাজনীতিবিদদের তৎপরতাকে নব্য উপনিবেশবাদ ছাড়া কী বলা যেতে পারে। জুলাইলের শুরুর দিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা মস্কোতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এ মন্তব্য করেন। ওইদিনই রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক টুইটে মুখপাত্রের বক্তব্য সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করে। পরবর্তীতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে মুখপাত্রের পুরো বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, কোনো নির্দিষ্ট একটি দল নয়, যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ আগামী সরকার নির্বাচনের সুযোগ পাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী, আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সমর্থন করি। যেখানে কোনো পক্ষ থেকে সহিংসতা হবে না। আমরা বিশ্বাস করি, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রত্যেকের ভূমিকা আছে। সরকার, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ, নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যেককে তার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, নির্বাচন এলে বিদেশিদের তৎপরতার সুযোগ আমরাই তৈরি করে দিয়েছি। এটি এখন অনেকটা মেনে নিতে হবে। এছাড়া করার কিছু নেই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন নির্বাচন নিয়ে তৎপরতা চালায় তখন রাশিয়া ও চীন আর বসে থাকে না, তারাও প্রতিক্রিয়া জানায়। তিনি বলেন, ২০ বছর আগের পৃথিবী তো এখন আর নেই। এখন পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশে যেসব দেশের বিনিয়োগ আছে তারা নির্বাচন এলে বেশি তৎপরতা চালান। এর কারণও আছে। কারণটা হচ্ছে, নির্বাচন যদি শান্তিপূর্ণ না হয়, গণ্ডগোল হয়, তাহলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, লোকসানেরও শঙ্কা থাকে। সে কারণে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আরেক অধ্যাপক মোহাম্মদ রুহুল আমিন মনে করেন, ভোট এলে বিদেশিরা যে তৎপরতা চালান তা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনেকটা হস্তক্ষেপের শামিল। তিনি বলেন, আমাদের নিজেদের ঐক্য না থাকার কারণে বিদেশিরা এসে নাক গলান, তৎপরতা চালান। ভাই-বোনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হলেই তো প্রতিবেশীরা সমাধানের সুযোগ পায়। তিনি বলেন, নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যতিক্রম, তাছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐক্য রয়েছে। আমাদের দেশে সেটি নেই, এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, এখন যেসব সমস্যা রয়েছে সেটির সমাধান রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে নিজেরাই করতে পারে। এজন্য প্রয়োজনে সংলাপের আয়োজন করতে হবে। তা না হলে বিদেশিদের তৎপরতা ও হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে না