রিজার্ভ থেকে ঋণ দিয়ে বিপাকে রূপালী ব্যাংক

রেদওয়ানুল হক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৩, ১২:১৩ এএম

থার্মেক্স গ্রুপ

  • ৩০ সেপ্টেম্বরের পর শ্রেণিকরণের নির্দেশ ১৫৫ কোটি টাকার ফোর্সড ও পিএডি দায়
  • একক গ্রাহক ঋণসীমা লঙ্ঘন করেছে গ্রুপটি
  • আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচারের সন্দেহ
  • অগ্রণী, জনতা ও সোনালী ব্যাংকের খেলাপি তালিকায় থার্মেক্স গ্রুপ
     

রিজার্ভ থেকে রপ্তানিকারককে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে ঋণ ফেরত দেয়নি প্রভাবশালী থার্মেক্স গ্রুপ। সময় অতিবাহিত হওয়ায় বিদেশি মুদ্রায় দেয়া ঋণ বাধ্য হয়ে দেশি মুদ্রায় ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে তা-ও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংকটি। খেলাপি মানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পর তা পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এ ছাড়া দায় বেড়ে যাওয়ায় একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করেছে গ্রুপটি। এখন ঋণ ফেরত দিতে আরও ছয় মাস সময় চাচ্ছে থার্মেক্স গ্রুপ। বাংলাদেশ ব্যাংক সময় আবেদন নাকচ করে চলতি মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে দায় পরিশোধের সময় বেঁধে দিয়েছে। অন্যথায় ঋণটি শ্রেণিকরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রূপালী ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গঠিত রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল-ইডিএফ ফান্ডের আওতায় থার্মেক্স গ্রুপকে কাঁচামাল আমদানি বাবদ ঋণ দেয় রূপালী ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী, পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করার কথা। কিন্তু গ্রুপটি নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করেনি। তাই বাধ্য হয়ে ওই ঋণ দেশি মুদ্রায় ফোর্সড লোনে রূপান্তরিত করেছে রূপালী ব্যাংক। এখন দেশি মুদ্রার লোনও পরিশোধ করছে না গ্রুপটি। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করা সত্ত্বেও তা নিয়মিত দেখানো হয়েছে। তাই চলতি মাসের মধ্যে পরিশোধ না করলে ঋণগুলো শ্রেণিকরণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

তথ্যমতে, থার্মেক্স গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন লিমিটেড, থার্মেক্স টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সিস্টার ডেনিম কম্পোজিট লিমিটেড ও থার্মেক্স স্পিনিং লিমিটেডের অনুকূলে ইডিএফ থেকে দেয়া ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে রূপালী ব্যাংক। এ ছাড়া গ্রুপটির অনুকূলে আরও ৭১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার টার্ম লোন সৃষ্টি করা হয়েছে; যা ইডিএফ সুবিধার আওতায় স্থাপিত ঋণপত্রের অনুকূলে গ্রুপটিকে দেয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় পিএডি দায় হালনাগাদ সুদসহ টার্ম লোন সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিস্টার ডেনিম কম্পোজিট লিমিটেডের ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার ফোর্সড লোন রয়েছে। যা চলতি মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রুপটির অনুকূলে বর্তমানে মোট ফোর্সড লোন রয়েছে ৮৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আর মেয়াদোত্তীর্ণ পিএডি দায় রয়েছে ৭১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সর্বমোট ১৫৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত হবে।   

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামাল আমদানির জন্য রিজার্ভ থেকে ঋণ নিয়ে সে মোতাবেক রপ্তানি আয় করতে ব্যর্থ হওয়া কোনো ভালো লক্ষণ নয়। কারণ রপ্তানির অর্থ পাচার হয়েছে কি-না কিংবা কাঁচামাল আমদানি না করেই অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে কি-না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। একই সাথে দেশি মুদ্রায় সৃষ্ট ফোর্সড লোন আদায়ে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে জামানত বাজেয়াপ্ত ও পরবর্তিতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।  ইডিএফের লোন ফেরত না দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, ‘সব ধরনের ঋণ ফেরত না দেয়ার প্রবণতা ব্যাংক খাতের একটি বড় সমস্যা। এটি সুশাসনের সমস্যা। প্রয়োজনে জামানত বাজেয়াপ্তসহ আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ষিয়টি দ্রুত নিষ্পতি করতে হবে।’ 

বিষয়টি নিয়ে আমার সংবাদের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আমার সংবাদকে বলেন, ‘কোভিড পরবর্তী সময় এবং রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ফোর্সড লোন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার মোতাবেক প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির আলোকে হিসাবগুলো বর্তমানে নিয়মিত রয়েছে। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বর্ধিতকরণ প্রস্তাব পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিত করা হবে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রপ্তানিকারকদের সহায়তায় ১৯৮৯ সালে গঠন করা হয়েছিল ইডিএফ, যা থেকে কাঁচামাল আমদানির জন্য উদ্যোক্তাদের ডলারে ঋণ দেয়া হয়। এ ফান্ডের আকার বাড়তে বাড়তে আট বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারে পৌঁছালেও আইএমএফের চাপে তা কমিয়ে ৪ দশমিক ১০ বিলিয়নে (৪১০ কোটি) নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু যারা এ ফান্ড থেকে ঋণ নিয়েছে তাদের অনেকেই ফেরত দিতে পারছে না মার্কিনি মুদ্রায় নেয়া এসব ঋণ। এতে বিপাকে পড়েছে রূপালীসহ আরও কিছু ব্যাংক।

জানা যায়, গত বছরের এপ্রিলে ডলার সংকট শুরু হওয়ার পর ইডিএফ ঋণে সুদহার বাড়ানো হয়। এরপর চলতি বছরের মার্চে নানা নিয়মকানুন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ইডিএফের আকার ধীরে ধীরে কমছে। ইডিএফের ঋণ ৭০০ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ৪১০ কোটি ডলার। ইডিএফ-সুবিধা ধীরে ধীরে বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ, ইডিএফের ঋণকে আর রিজার্ভের হিসাবে দেখানো যাচ্ছে না। আবার রিজার্ভ বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত রয়েছে। গত রোববার আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন বা দুই হাজার ১৪৭ কোটি ডলার। সাধারণত পণ্য রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ইডিএফ থেকে ঋণ দেয়া হয়। এ ঋণ ফেরত দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন সময় নিতে পারেন উদ্যোক্তারা। 

জানা গেছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ও রূপালীসহ বেসরকারি খাতের একাধিক ব্যাংকের গ্রাহক ঋণ নিলেও তা ফেরত দিচ্ছেন না। গত জানুয়ারিতে ঋণের সুদহার সাড়ে ৪ শতাংশ করা হয়, আর অনাদায়ি অর্থের ওপর অতিরিক্ত ৪ শতাংশ দণ্ডসুদ আরোপ করা হয়। এখন পর্যন্ত ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
এদিকে ইডিএফের বিকল্প হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানিসহায়ক তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে জনতা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এ তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে টাকা নিয়ে রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারছেন রপ্তানিকারকরা। যদিও কাঁচামালের বড় অংশই ব্যয় হয় ডলারে। 

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্যরা ইডিএফ থেকে দুই কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। আগে একসময় এ ঋণের সীমা ছিল দুই কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ডাইড ইয়ার্ন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিওয়াইইএ) সদস্যরা ঋণ নিতে পারেন সর্বোচ্চ এক কোটি ডলার। আগে তাদের ঋণের সীমা ছিল এক কোটি ৫০ লাখ ডলার। 

ব্যবসায়ী আবদুল কাদির মোল্লা পোশাক ও বস্ত্র খাতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থার্মেক্স গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই বৃহৎ শিল্প গ্রুপে থার্মেক্স টেক্সটাইল মিলস, থার্মেক্স স্পিনিং, থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন, থার্মেক্স ইয়ার্ন ডাইং, থার্মেক্স ওভেন ডাইং, আদুরি অ্যাপারেলস, আদুরি নিট কম্পোজিটসহ আন্তর্জাতিক মানসম্মত ১৬টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান আছে। বর্তমানে তিনি বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের একজন পরিচালক। চেষ্টা করেও রূপালী ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, থার্মেক্স গ্রুপ রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী ও সোনালী ব্যাংকেও খেলাপি গ্রাহকের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। তাই গ্রুপটির ঋণ আদায়ে জোড় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি নতুন করে ঋণ বিতরণে সতর্ক হওয়া দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকগুলোর অনিয়ম প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘কোনো ব্যাংক যদি আইন লঙ্ঘন করে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চয় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর ইডিএফের ঋণ খেলাপি হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ নির্ধারিত সময় শেষে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই টাকা কেটে নেয়।’ 

রূপালী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকের মূলধন সরকারের দেয়া মূলধন পুনর্ভরণের অর্থ ও স্টক ডিভিডেন্ড দেয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৪৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল দুই হাজার ২২৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন (এমসিআর) চার হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতি দুই হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।