খালের ময়লা সরানো হয় তবে পানিকে স্বচ্ছ করার ব্যাপারে এখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি
—সাখাওয়াত হোসেন, নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-৫), ডিএসসিসি
কিছুদিন আগেও কুতুবখালী খাল দিয়ে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া এলাকার পানি শীতলক্ষ্যা ও বালু নদে পতিত হতো। কিন্তু বিভিন্ন মহলের বেদখলে খালের বুকে গড়ে উঠেছে দোকান ও ভবন। অবশিষ্ট প্রায় ৮ দশমিক ৮৫ মিটার দৈর্ঘ্যের খালটির যেটুকু আছে তাও যেন নর্দমা আর ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ময়লার দুর্গন্ধে খালটির পাশ দিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মাঝেমধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভিযান পরিচালনা করলেও কিছুদিন না যেতেই আবর্জনায় আগের মতো হয়ে যায় খালটি। পানি এতটাই কালো হয়েছে যে, দেখলে মনে হবে কোনো ময়লার নর্দমা।
খালটির প্রশস্ততা ৫০ ফুট থাকলেও দুই পাশে রাস্তা নির্মাণের ফলে এটি সংকুচিত হয়ে যায়। এতে করে হালকা বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া খালটির সৌন্দর্য বাড়াতে একপাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে ডিএসসিসি। তারা মনে করেন, ওয়াকওয়ে তৈরি হলে খালটির সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষ তাতে ময়লা ফেলার আগ্রহ হারাবে। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। কারণ সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণের অভাবে তাদের উদ্যোগ কোনো কাজে আসেনি। তবে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ সঠিক তদারকি করতে পারলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, কুতুবখালী খালে বিভিন্ন অংশে ময়লা জমাট বেঁধে আছে। দেখে বুঝার উপায় নেই এটি একটি ঐতিহ্যবাহী খাল। ময়লার কারণে পানি কালো হয়ে আছে। এতে করে খুবই দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে পরিবেশে। ধোলাইরপাড় বায়তুশ শরফ জামে মসজিদ থেকে যাত্রাবাড়ী মূল সড়ক পর্যন্ত খালটিতে বর্জ্য ফেলে নোংরা ও দূষিত করে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে খালের আশপাশের ব্যবসায়ী ও বাসাবাড়ির বর্জ?্য বেশি ফে?লছে। খালের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে এটি দেখার কেউ নেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুতুবখালী খালটি ২০০০ সালে ৮০-১০০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত ছিল। ২০০১ সাল থেকে দখলের মাধ্যমে খালটির প্রশস্ততা কমতে থাকে। ২০১০ সালে পুনরায় খনন করলেও খালটির প্রশস্ততা কমে ১০-৩০ ফুটের মধ্যে নেমে আসে। তার মধ্যে খালের পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের ফলে এটি আরও সঙ্কুচিত হয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মূলত এই খালটির প্রস্থ ছিল প্রায় ৫০ ফুট। বাকি অংশ বিভিন্ন ক্ষমতাসীন মহলের অবৈধ দখল হয়ে ৩০ ফুট প্রশস্ততায় নেমে এসে?ছিল। বেশ কয়েকবার খালের উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া এক কোটি ৪৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩০২ টাকা ব্যয়ে খালের পাড়ে ৮ দশমিক ৮৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ১ দশমিক ২ মিটার প্রস্থের ওয়াকওয়ে নির্মাণ করার পর খালের প্রশস্ততা আরও কমে যায়। বর্তমানে মাত্র ১৫ ফুটের কম খাল আবশিষ্ট রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি কর্পোরেশনের পরিকল্পনার কারণে বিলীন হয়েছে অনেক খাল। এবার কুতুবখালী খালের বাকিটুকুও বিলীন হওয়ার পথে। সমীক্ষা না করে হুট করে কোনো পদক্ষেপ নেয়া তো বোকামি। সিটি কর্পোরেশন যে কাজ করছে সেটা ভালো উদ্যোগ হতো, যদি এতে খালটির দখল ও দূষণ কমত। খালপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণের ফলে খোদ সিটি কর্পোরেশনই খালটি দখল করে ফেলছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক পর্যবেক্ষণ করতে না পারলে কখনো খাল দূষণমুক্ত করতে পারবে না। এতে করে এক মিটার বেষ্টনীও কোনো কাজে আসবে না। সিটি কর্পোরেশনকে অবশ্যই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে হবে। খালে যেন ময়লা না ফেলতে পারে তার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। এছাড়া খালে কেউ ময়লা-আবর্জনা ফেললে জেল-জ?রিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলেই খালের নান্দনিক রূপ অটুট থাকবে। কুতুবখালী খালের পাশের ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেন (ছদ্মনাম) আমার সংবাদকে বলেন, প্রায় সময় খালটি ময়লায় পরিপূর্ণ থাকে। এতে করে প্রচুর দুর্গন্ধ হয়। যার কারণে এর পাশ দিয়ে হাঁটার মতো অবস্থা থাকে না। বছরজুড়ে খালের পানি কালো হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা গভীর রাতে বাসাবাড়ির ময়লা খালে ফেলছেন। খালের পাশের বাসিন্দারা সচেতন ও সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগী না হলে এই খাল পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হবে না।
সাব্বির রহমান নামের এক বাসিন্দা বলেন, কুতুবখালী খালটির জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ডিএসসিসি। শুধু পরিষ্কার করলেই হবে না। পাশাপাশি অস্থায়ী ডাস্টবিন তৈরি করা হলে খালের মধ্যে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমে যাবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক-০৫ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সরকার আমার সংবাদকে বলেন, প্রতিনিয়ত কুতুবখালী খালটি পরিষ্কার করা হচ্ছে। যখনই ময়লা দেখি তখনই আমাদের অভিযান পরিচালিত হয়। আমাদের পক্ষ থেকে ময়লাগুলোকে সরানো হলেও পানি স্বচ্ছ করার বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তবে পানি স্বচ্ছ করার ব্যাপারে আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। এটি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া তাই চেষ্টা চলানো হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৬১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. জুম্মন মিয়া আমার সংবাদকে বলেন, দু-তিনদিন পরপরই খালটি পরিষ্কার করা হয়। পানি একটু কালো তবে পানিটা বিশ্বরোডের পাশের ড্রেনের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। যার ফলে ততটা দুর্গন্ধ থাকে না। আর খালের পাড়ের ফুটপাতে যেন দোকান না বসে তাও দেখা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায় সেজন্য পরিষ্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।