দ্বিতীয় কিস্তি না পেলে বড় বিপর্যয়

রেদওয়ানুল হক প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৩, ১১:৪৭ পিএম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ সংস্থাটির দেয়া শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি থেকে ছিটকে গেলে বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে দেশের অর্থনীতি। কারণ সংস্থাটির ওপর নির্ভর করছে অন্য দাতা গোষ্ঠীর অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ যেসব দাতাগোষ্ঠী ইতোমধ্যে ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও আটকে যেতে পারে। এসব সংস্থা আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিকে অনেকাংশে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বিবেচনা করে। 

আইএমএফের অন্যতম শর্ত ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পর্যাপ্ততা অর্জন। ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে রিজার্ভের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে সংস্থাটি। যা অর্জনে পরপর দুইবার ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শর্ত অনুযায়ী গত জুনে প্রকৃত (নিট) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকার কথা ছিল ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। সেই পরিমাণ রিজার্ভ রাখতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। সেপ্টেম্বরে থাকার কথা ছিল ২৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সে লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। আর ডিসেম্বরে রাখতে হবে ২৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এটি অর্জন অনেকটাই অসম্ভব। কারণ হাতে আছে মাত্র তিন মাস আর রিজার্ভের ঘাটতি রয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তিন পদ্ধতিতে রিজার্ভ গণনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকৃত ও অন্যের গচ্ছিত অংশ হিসাবে ধরে মোট রিজার্ভ, আইএমএফ স্বীকৃত বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ও প্রকৃত (নিট) রিজার্ভ। দুই ধরনের হিসাব (মোট রিজার্ভ ও বিপিএম-৬ ) বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করলেও প্রকৃত (নিট) রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করছে না। তবে প্রকৃত রিজার্ভের তথ্য নিয়মিত আইএমএফকে জানাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বলছে, গত ৭ জুন দেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ (ব্যাল্যান্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) অনুযায়ী এ অঙ্ক ২৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী (যা শুধু আইএমএফকেই দেয়া হয়) তখন নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ ছিল ১৯ বিলিয়নের ঘরে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট রিজার্ভ আছে ২৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। যা বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। আর প্রকৃত রিজার্ভ নেমেছে ১৮ বিলিয়নের নিচে। যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তথ্য কেবল আইএমএফকে জানানো হয়েছে। প্রকৃত এ রিজার্ভ দিয়ে এখন তিন মাসের আমদানি দায় পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কারণ গত জুলাই মাসে আমদানি খরচ ছিল ৬৪৬ কোটি ডলার। সে অনুযায়ী তিন মাসের আমদানি দায় পরিশোধে প্রয়োজন অন্তত সাড়ে ১৯ বিলিয়ন ডলার। 

আইএমএফের দেয়া লিখিত হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখা গেছে, বিপিএম-৬ অনুযায়ী থাকা রিজার্ভের তুলনায় তা প্রায় ৩৪১ কোটি ডলার কম। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাবে থাকা ১২৫ কোটি ডলার ও স্পেশাল ড্রয়িং রাইট (এসডিআর) হিসেবে থাকা ২০৪ কোটি ডলার। ফলে প্রকৃত রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে প্রকৃত রিজার্ভের এ তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে গতকাল এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার নিট মজুত ১৮ বিলিয়ন ডলারের নিচে অবস্থান করছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ মুখ্য অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশে যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ঢুকছে এবং যা বেরিয়ে যাচ্ছে, তার প্রকৃত হিসাব মিলছে না। তার মতে, ব্যালান্স অব পেমেন্টে বা লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রিজার্ভ হ্রাস পাচ্ছে। 

আইএমএফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পেতে রিজার্ভের পর্যাপ্ত মজুত নেই। গতকাল বুধবার এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক। এদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয় হয়। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শর্ত পূরণের অগ্রগতি, সফলতা ও ব্যর্থতা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে রিজার্ভের শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কথাও জানানো হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, আইএমএফ ঋণ অনুমোদনের সময় আমাদের কিছু শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে বেশকিছু শর্ত পূরণ করা হয়েছে। দু-একটি জায়গায় ব্যর্থতা আছে। রিজার্ভ কিছু কম আছে। রাজস্ব আহরণ কম হয়েছে। তবে অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশের কথা ছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশ করেছে। বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া মুদ্রাবাজার নির্ধারিত বিনিময় হার প্রবর্তন করা হয়েছে। সুদহারের নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। তাদের দেয়া যেসব শর্ত অর্জন হয়েছে তা জানিয়েছি আর যেগুলো অর্জন হয়নি, তা কেন হয়নি তাও জানানো হয়েছে।

শর্ত পূরণ ও ব্যর্থতা নিয়ে আইএমএফের পক্ষ থেকে কী বলা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ মুখপাত্র বলেন, আজকে বৈঠক শুরু হয়েছে। তারা (আইএমএফ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে বসে আলোচনা করবে। প্রথম তথ্য নিচ্ছে তারপর আবার বৈঠক করবে। আগামী ১৯ অক্টোবর শেষ মিটিং, সেখানে তাদের মতামত জানাবে। আমরাও আমাদের বিষয়গুলো জানাব। 

প্রসঙ্গত, আইএমএফ বেশকিছু বিষয়ে নির্দিষ্ট শর্ত দিয়ে বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। এই ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার গত ফেব্রুয়ারিতে পায় বাংলাদেশ। দেশে ডলার সংকট চলাকালে আইএমএফ ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা নভেম্বরে পাওয়ার কথা। তবে তা নির্ভর করছে ঋণের সঙ্গে জুড়ে দেয়া শর্ত পরিপালনের ওপর। তাই সরকারি বিভাগগুলো শর্ত পূরণে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করছে।

অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করবে আইএমএফ। আর্থিক খাতের স্থায়িত্ব, ব্যাংক খাতের সংস্কার, তারল্য ব্যবস্থাপনা, ডলারের বাজারভিত্তিক হারে লেনদেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ গণনা পদ্ধতি, সুদের হার ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এরই অংশ হিসেবে প্রথম দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বসে সংস্থাটির বিশেষ প্রতিনিধি দল।

বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আইএমএফের ঋণের যেসব শর্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পূরণ করার কথা, তার মধ্যে বেশির ভাগ শর্তই পূরণ হয়েছে। তবে যে পরিমাণ নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখার শর্ত দেয়া হয়েছিল, সেই পরিমাণ রিজার্ভ রাখতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। আজও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আসবেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। দফায় দফায় বৈঠক চলবে আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত।