বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্দোলন-সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর একসময় প্রবল দাপট ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে তাদের সেই দাপট ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এরপর এসব ছাত্রসংগঠনগুলোতে একের পর এক ভাঙন, কর্মী সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে রাজনৈতিক মহলে অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয় তারা। এমন দুর্বল একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে আদর্শের ফারাক করে একটি ছাত্রঐক্য গঠন হয়েছে। তাতে মূলত কোনো ছাত্রসংগঠন নয় এ দেশের ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের দূরে সরিয়ে ঐক্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশের ছাত্রসংগঠনের ইসলামপন্থিরা বলছেন, ধর্মীয় আদর্শকে ছোট করে ফ্যাসিবাদবিরোধী যে ঐক্য হয়েছে তাতে ইসলামপন্থিদের আগ্রহ থাকবে না।
এছাড়া বাম আদর্শের নেতারাও বলছেন, অতীতেও এমন রাজনৈতিক দুঃসময়ে ঐক্য হয়েছিল কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কেউ কথা রাখেনি। জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রগতিশীল ছাত্রজোট নামে বামপন্থি সংগঠনগুলোর একটি জোট ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই জোট ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রগতিশীল জোট থেকে ছাত্র ফেডারেশন (সাকি) বের হয়ে গিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে জোট করে। এরপর প্রগতিশীল ছাত্রজোট আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বাংলাদেশের বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। গত দুই কমিটিতে তারা বিদ্রোহ-পাল্টা বিদ্রোহ, আলাদা আলাদা কাউন্সিল করে দুই ভাগ হয়ে গেছে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও দুটি সংগঠন একটি মার্কসবাদী অন্য আরেকটি খালেকুজ্জামান হিসেবে পরিচিত। ছাত্র ফেডারেশনও দুটি সংগঠন একটি জোনায়েদ সাকি অপরটি বদরুদ্দীন উমর। এ রকম দ্বিধা বিভক্তির ফলে শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল ছাত্রজোট বিলীন হয়ে গেছে বলে জানা যায়। একই নাম, একই আদর্শ থাকা সত্ত্বেও তারা তিন সংগঠন ভেঙে ছয়টি, পাশাপাশি নানা জোটে বিভক্ত। এ সংকটে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের প্রগতিশীল ঘরানা থেকে একটু বেরিয়ে এসে গত বছর গঠন করে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট। কিন্তু সেখানেও তারা একই জোটে আসতে পারেনি। ছাত্র ইউনিয়ন একাংশ, ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী), ছাত্র ফেডারেশন (বদরুদ্দীন উমর) এই জোটে থাকলেও জোটের বাইরে রয়ে গেছে ছাত্র ইউনিয়নের অপর অংশ (দীপক শীল), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (খালেকুজ্জামান)। এছাড়া ছাত্র ফেডারেশন (সাকি) সবার আগেই গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত হয়।
বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রমের খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের (সাকি) ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে, যেখানে ১০ থেকে ১২ জনের বেশি নেতাকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায় না। এছাড়া ঢাকা মহানগর ও নারায়ণগঞ্জের কমিটি ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে অন্য কোথাও তাদের কোনো কমিটির কথা জানা যায়নি। নাগরিক ঐক্যের (মান্না) ছাত্রসংগঠন নাগরিক ছাত্রঐক্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি থাকলেও ঢাকার বাইরে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। এ ছাড়া মঞ্চভুক্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে ভাসানী পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ছাত্রসংগঠন ভাসানী ছাত্র পরিষদের ২১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি আছে, তবে ঢাকার বাইরে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। বিপ্লবী ছাত্র সংহতি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্রসংগঠন। ২০১৪ সালে ছাত্রসংগঠন ভেঙে দুই ভাগ হয়েছিল। ঢাকার বাইরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, পাবনার ঈশ্বরদী, বেড়া অঞ্চলে তাদের কিছু কার্যক্রম আছে। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান হাসনাত কাইয়ুম। ছাত্রদের মধ্যে খুব বেশি কাজ না থাকলেও দেশের সিভিল সোসাইটির কিছু ব্যক্তির সাথে তাদের ভালো জানাশোনা আছে বলে জানা যায়। জাসদ ছাত্রলীগের (জেএসডি-রব) সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত।
এছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত ছাত্র সংগঠনের বাইরে ছাত্র ইউনিয়ন দুই ভাগ হওয়ার ফলে তাদের কার্যক্রম কিছুটা সীমিত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কমিটি থাকলেও দুই ভাগ হওয়ায় কমিটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি আছে। সমপ্রতি ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি হয়েছে। আগের কমিটির কেন্দ্রীয় নেতারা দলের অভ্যন্তরে নারী নিপীড়নের কারণে দল থেকে পদত্যাগ করলে সারা দেশে দলত্যাগের হিড়িক পড়ে। এছাড়া ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় কমিটি থাকলেও ঢাকার বাইরে তাদের কমিটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্র ফেডারেশনের এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সাধারণ ছাত্রসমাজের কাছে আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শী ও সুবিধা ভোগী সিদ্ধান্তে আমাদের প্রচেষ্টা কিছুটা ভাটা পড়ছে। তবে আমরা আমাদের আদর্শ সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে নিরলস কাজ করছি।
বর্তমানে সারা দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। সরকারবিরোধী অবস্থানে থেকেও বামপন্থি-প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো তেমন আবেদন তৈরি করতে পারছে না। গণতন্ত্র মঞ্চ ও গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট আলাদা আলাদা কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের ছাত্ররাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা করলেও কর্মসূচিতে জনবল সংকট রয়েছে। জানা যায়, মিডিয়া পাড়ার ইমেজকে কাজে লাগিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার চেষ্টা করছে এসব ছাত্রসংগঠন।
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দীপক শীল আমার সংবাদকে বলেন, শিক্ষার অধিকার, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছাত্রইউনিয়ন কাজ করে যাচ্ছে। ছাত্রদের নিরাপত্তা, অধিকার নিশ্চিতে স্বাধীনতার পর থেকে যে ছাত্রসংগঠনটির নাম আসে সেটি ছাত্র ইউনিয়ন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের একতাবদ্ধ করতে আমাদের প্রচেষ্টা। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। সমপ্রতি যে ছাত্রঐক্য হয়েছে সেখানে তারা যুক্ত নেই দাবি করে তিনি বলেন, আওয়ামী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গেও আমাদের অতীতে জোট হয়েছিল কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা কোনো শর্ত রক্ষা করেনি। তাই আমরা মনে করছি, বিএনপিও যদি কখনো ক্ষমতায় আসে তখনো তারা কোনো শর্ত মানবে না। তবে যে কোনো ঐক্য প্রয়োজনে হতে পারে, আমরা সেই নীতিকে সাধুবাদ জানাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিলাল আহমদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, দেখুন আমাদের ছাত্র সংগঠনের অবস্থান কী তা সারা দেশের মানুষ জানে। দেশের এই বৃহৎ স্বার্থে ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যগঠন হয়েছে। এতে আমার মনে হয় না কোনো সুফল আসবে। আমরা দেখছি বামপন্থিদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে যাদের অনেকের কেন্দ্রীয় কমিটিও নেই। সারা দেশে অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেখানে দেশের মানুষ সোচ্চার সেখানে বামদের সঙ্গে নিয়ে ইসলামকে আড়াল করা হয়েছে। একটি বলয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে ভালো কোনো কার্যকারিতা আসবে মনে হচ্ছে না। আমরা এখনো বিশ্বাস করি সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যাওয়া হবে।