শিক্ষাক্রম নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি

মো. নাঈমুল হক প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৩, ১২:৪১ এএম
  • আগামী বছর দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে বাস্তবায়ন
  • বাতিলের সাত দফা দাবিতে প্রেস ক্লাবে অভিভাবকদের মানববন্ধন 
  • শিক্ষা খরচ ও মূল্যায়নে অভিভাবকদের একাংশের অসন্তোষ
  • শিক্ষাক্রম আয়ত্তে গ্রামের তুলনায় শহরের শিক্ষকরা এগিয়ে

এ মূল্যায়ন ব্যবস্থা অতি উন্নত দেশ অনুসরণ করে। আমাদের শিক্ষক, ছাত্র ও বোর্ডের পক্ষে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় 
—অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান, সাবেক পরিচালক, আইইআর, ঢাবি

শিক্ষার্থীর বিভিন্ন মাত্রার জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনা বিকাশে ভূমিকা রাখবে 
—ড. তারিক আহসান, আইইআর বিভাগের অধ্যাপক, ঢাবি

নতুন শিক্ষাক্রমে কেউ অবহেলিত হবে না। আমরা সব শিক্ষার্থীকে এক কাতারে দাঁড় করাব 
—প্রফেসর ড. মশিউজ্জামান, সদস্য, এনসিটিবি

চলতি বছর তিনটি শ্রেণিতে চলছে নতুন শিক্ষাক্রম। আগামী বছর চারটি ক্লাসে বাস্তবায়ন হবে। ইতোমধ্যে নতুন শিক্ষাক্রমের ভালো-মন্দ নিয়ে সর্বত্র জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতে বিভক্ত শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। অভিভাবকরা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রমে আমাদের সন্তানদের শিক্ষা খরচ বাড়বে। এ মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা না হওয়ারও শঙ্কা করছেন তারা। নতুন শিক্ষাক্রম বাতিলসহ সাত দফা দাবিতে গতকাল প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন করেছেন অভিভাবকরা। তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) বলছে, নতুন শিক্ষাক্রমে কেউ অবহেলিত হবে না। আমরা সব শিক্ষার্থীকে এক কাতারে দাঁড় করাব। 

জানা যায়, চলতি বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। আগামী বছর দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে এটি বাস্তবায়িত হবে। ইতোমধ্যে তিন ক্লাসের পাঠদান ও মূল্যায়ন নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। গতকাল প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন করেছেন। মানববন্ধন থেকে বৃহৎ আন্দোলনেরও পরিকল্পনা কথাও বলতে শোনা যায়। তবে অভিভাবকদের একাংশকে এ শিক্ষাক্রমের পক্ষে রয়েছেন। শিক্ষা আন্দোলন সম্মিলিত অভিভাবক ফোরামের ব্যানারে মানববন্ধন করেছে অভিভাবকরা। সংগঠনটির আহ্বায়ক তাহেরা আক্তার রুপা বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা দাবির প্রতি সবার সমর্থন যাচাইয়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি করেছেন। অসংখ্য অভিভাবক তাদের সঙ্গে একমত হয়ে এতে সাড়া দিয়েছেন। নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা না থাকলেও শিক্ষার্থী কাজের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত জেগে ওদের প্রজেক্টের কাজ করতে হচ্ছে। একেকটি প্রজেক্টের জন্য অনেক ধরনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র কিনতে হচ্ছে। এতে আমাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ শিক্ষাক্রমে মূল্যায়ন পদ্ধতিও আজগুবি। পরীক্ষাবিহীন এমন শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের সন্তানদের ধ্বংস হতে দিতে পারি না। সেখান থেকে আমাদের দাবি তুলে ধরব। আশা করি শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ শিক্ষাক্রম বাতিল অথবা সংস্কার করবেন।’

এদিকে, নির্দিষ্ট সাত দফা দাবি নিয়ে এগোচ্ছে সম্মিলিত অভিভাবক ফোরাম। তাদের দাবিগুলো হলো— ১. নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল; ২. ৫০-৬০ নম্বরের অন্তত দুটি সাময়িক লিখিত পরীক্ষা চালু রাখা; ৩. ত্রিভুজ-বৃত্ত-চতুর্ভুজসহ সব ধরনের চিহ্নভিত্তিক ফল পদ্ধতি বাতিল করে নম্বর ও গ্রেডিং ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে; ৪. শিখন ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক ক্লাসের সব খরচ স্কুলকে বহন করতে হবে ও স্কুল পিরিয়ডেই সব প্রজেক্টের কাজ সম্পন্ন করতে হবে; ৫. শিক্ষার্থীদের দলগত কাজে মোবাইলসহ ডিভাইসমুখী হতে নিরুৎসাহিত করে অধ্যয়নমুখী করতে হবে; ৬. প্রতি বছর সব ক্লাসে রেজিস্ট্রেশন ও সার্টিফিকেট প্রদানের সিদ্ধান্ত বাতিল ও ৭. সব শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই তা মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে হবে।

নতুন শিক্ষাক্রম গ্রামের তুলনায় শহরের শিক্ষকরা এগিয়ে রয়েছেন। এ ব্যাপারে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের নোয়াখালী, নরসিংদী, রাজবাড়ী, ময়মনসিংহের প্রতিবেদকদের মাধ্যমে কয়েকটি প্রশ্নের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদক জানতে পারেন, গ্রামের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা এখনো আগের মতো পরীক্ষা নিচ্ছেন।  আগের সেমিস্টার পদ্ধতির মতো মূল্যায়ন করছেন তারা। ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষকদের অধিকাংশের বক্তব্য হচ্ছে, এত স্বল্প সময়ে এত বেশি সংখ্যকের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
নতুন শিক্ষাক্রমের ব্যাপারে শিক্ষাবিদদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ শিক্ষাক্রম দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল রূপান্তর নিয়ে আসবে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য কমে আসবে। তবে এ শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের মতো অবস্থা আমাদের দেশের নেই বলে মনে করেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, এ ধরনের শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে যে ধরনের শিক্ষক ও অবকাঠামো প্রয়োজন। আমাদের সে ধরনের কোনো অবস্থা নেই। এটি বাস্তবায়নে আমাদের ধারাবাহিকভাবে আগানো প্রয়োজন ছিল। হুট করে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে যাওয়া সমাজের জন্য ভালো হবে না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এক লাফে নারিকেল গাছের মাথার ওপরে চড়া যাবে না। এ শিক্ষাক্রম নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাটাকে অনেকটা ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়া হচ্ছে। সব ভালো কি একদিনে অর্জন করা যায়? নাকি ধাপে ধাপে করতে হয়? ফলদ কোনো বৃক্ষ কি এক দিনে ফল দেয়? নাকি বড় হয়, ফুল ফোটে, তারপর ফল ধরে?’

অথচ শিক্ষকদের এখনো তৈরি করা হলো না। ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক এমনকি সোসাইটিকে উপযোগী করে গড়াও হলো না। অথচ তাদের ওপর অতি উন্নত দেশের শিক্ষাক্রম এনে চাপিয়ে দেয়া হলো। সেটি কতটা বাস্তবসম্মত সেই প্রশ্ন রাখতে চাইব আমি। অতএব যারা এটি করছেন, চালুও করে ফেলছেন, তাদের বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত ছিল। এখন যে কারিকুলামটা তারা করছেন, যেভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করছেন, সেটি বিদেশি। অত্যন্ত অতি উন্নত দেশ এটি ফলো করে। আমি মনে করি, আমাদের শিক্ষকদের পক্ষে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষে, শিক্ষা বোর্ডের পক্ষে নতুন এ শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’
এদিকে নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের কোর কমিটিতে বিশেষজ্ঞ সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম তারিক আহসান। 

তিনি বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হচ্ছে— ক্লাসরুমে শেখা ও শেখানো। মূল্যায়নে পরীক্ষার বদলে সারা বছর ধরে নিরীক্ষা ও তদারকি (মূল্যায়ন) এবং ব্যতিক্রমী পাঠ্যবই। শেখার জন্য শিশুকে শিক্ষকের কাছে বা নোট-গাইডের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এর পরিবর্তে তারা নিজের সহপাঠী, পরিবার ও সমাজ থেকে শিখবে। শিক্ষক শুধু এখানে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।’ এই পদ্ধতিতে কোনো কিছু না বুঝে পাশ করার জন্য শিক্ষার্থী তোতা পাখির মতো মুখস্থ করবে না। যা জানবে, তা মুখস্থ করবে না। সেটি বুঝে প্রয়োগ করবে। এর ফলে তার দক্ষতা বাড়বে। দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে। অর্থাৎ, কোনো কিছু বোঝার জন্য তা ইতিবাচকভাবে নেয়া দরকার। এই আবেগ তো সংযুক্তি, তা ঘটানো হবে। এতে তার সার্বিক বিকাশ ঘটবে। এক কথায়, নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি সামাজিক, মানসিক, একাডেমিক বিকাশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এটি কর্মক্ষম মানুষ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে, যাতে তারা আবিষ্কার বা সৃষ্টি করার মতো মানুষ হিসেবে বিকশিত হবে। এটি শিক্ষার্থীকে তার কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতেও ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর বিভিন্ন মাত্রার জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনা বিকাশে ভূমিকা রাখবে।’

নতুন শিক্ষাক্রমের ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য  (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মো. মশিউজ্জামান বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমে আমরা সব শিক্ষার্থীকে এক কাতারে দাঁড় করাব। আগামীর বাংলাদেশ গড়তে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেবো। কেউ অবহেলিত থাকবে না, কেউ অতি আদর পেয়েও ঝরে পড়ার মতো দুর্ঘটনার মুখে পতিত হবে না। নিজ নিজ যোগ্যতায় আপন মনে বেড়ে উঠবে সবাই। রক্তকরবীর জায়গায় রক্তকরবী শোভা পাবে, গোলাপের জায়গায় গোলাপ সুবাস ছড়াবে। প্রত্যেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবার, সমাজ ও দেশ গড়ায় সমান ভাগিদার হবে।’ কাউকে বলা হবে তুমি খেলাধুলায় ভালো। তুমি এ পথে হাঁটতে পারো, ক্যারিয়ার গড়তে পারো। যদি তুমি খেলাধুলায় নাও যেতে পারো, সে ক্ষেত্রে তোমার সঙ্গীত বা গণিতে ভালো ঝোঁক। তুমি সঙ্গীত বা গণিত পড়তে পারো। অর্থাৎ তাকে তার দক্ষতা বা আগ্রহের বিষয় বাতলে দেয়া হবে। নতুন শিক্ষাক্রমে এটি বলার কোনো সুযোগ নেই যে, তুমি ওর চেয়ে ভালো। ভালো ও খারাপ— এ বিশ্বাস ভেঙে দেয়ার কাজটিই করছি আমরা।’